অগ্রণী ব্যাংকের ফ্লোর স্পেস কেনায় তিন এমডির কারসাজি

মেহেদী হাসান: অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও দুই উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)। যদিও ডিএমডি দুজন বর্তমানে সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জে পাঁচ হাজার বর্গফুটের ফ্লোর স্পেস কিনতে অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি সত্ত্বেও একটি খেলাপি প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্লোর স্পেস কেনার সব বন্দোবস্ত করা হয়। অনুমোদন না পেয়ে অবশেষে ফ্লোরের টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়, যা এখন খেলাপি।

সূত্র জানায়, অগ্রণী ব্যাংকের এ ঘটনার সময় ব্যাংকটির এমডি ছিলেন সৈয়দ আবদুল হামিদ। এছাড়া ফ্লোর স্পেস ক্রয় যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ছিলেন ব্যাংকটির তখনকার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক-১ মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ ও সহসভাপতি ছিলেন সেসময়ের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক-২ মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম।

এদের মধ্যে মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের এমডি এবং মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর সাবেক এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদ পলাতক। তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অগ্রণী ব্যাংকের আগের খেলাপি প্রতিষ্ঠান তানাকা গ্রুপের কাছ থেকে ২০১৪ সালে কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগরে পাঁচ হাজার বর্গফুটের ফ্লোর স্পেস কেনার জন্য বোর্ডে প্রস্তাব উপস্থাপন করেন ব্যাংকের এমডি। তবে বোর্ড বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের শর্ত দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদ ব্যাংকের এখতিয়ার-বহির্ভূতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তানাকা গ্রুপকে ফ্লোর স্পেসের অর্ধেক মূল্য অগ্রিম হিসেবে পরিশোধ করেন। এক্ষেত্রে তিনি বিষয়টি বোর্ডকে অবহিত করারও প্রয়োজন মনে করেননি, যা ব্যাংকের নিয়মের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ফ্লোর স্পেস ক্রয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি থাকায় অগ্রণী ব্যাংক তানাকা গ্রুপকে দেওয়া অগ্রিম টাকার সুদসহ ফেরত দেওয়ার নোটিস পাঠায়। কিন্তু গ্রাহক প্রতিষ্ঠান এই টাকা ফেরতে অপারগতা প্রকাশ করে। অবশেষে গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই টাকা ঋণ হিসেবে ছয় মাসের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। এই সময়েও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় তানাকা গ্রুপ। পরে বোর্ড গ্রাহককে ২৪ মাস মেয়াদে পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়। এই সময়ও শেষ হয়েছে গত ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। তবে এ টাকা এখনও আদায় হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে ব্যাংকটির ওই সময়ের এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এর আগে বেশকিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

ব্যাংকটির তখনকার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক-১ ও বর্তমান সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, তানাকা গ্রুপের কাছ থেকে ফ্লোর স্পেস ক্রয়ের কথা ছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তির কারণে সেটি কেনা হয়নি। একটি খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় ঋণ দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তখন তানাকা গ্রুপের লেনদেন ভালো ছিল। তারা খেলাপি ছিল না।’

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তানাকা গ্রুপ তখন  খেলাপি প্রতিষ্ঠান ছিল।

এ বিষয়ে ব্যাংকটির সে সময়ের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক-২ এবং অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান এমডি মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘তখন কিছু সমস্যা ছিল; তবে বর্তমানে আমাদের ব্যাংক অনেক ভালো চলছে। ঋণ আদায়ে আমরা নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি। বারবার রিট করে তানাকা গ্রুপ এড়িয়ে যাচ্ছে।’

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অগ্রণী ব্যাংকের চৌধুরীবাজার শাখা এবং ঢাকা দক্ষিণ আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের জন্য এই ফ্লোর ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ৫ হাজার বর্গফুটের ফ্লোর স্পেসের মূল্য ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ২২ হাজার ৫০০ টাকা, যার মোট মূল্য দাঁড়ায় ১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। তবে সরেজমিন দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগরে প্রতি বর্গফুট ফ্লোরের দাম সর্বোচ্চ তিন থেকে চার হাজার টাকা।

এদিকে রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির এম্পায়ার স্টেট প্লাজায় প্রতি বর্গফুট ১৫ হাজার ৫০০ টাকা হিসাবে ৪৫ হাজার বর্গফুটের তিনটি ফ্লোর কিনেছে অগ্রণী ব্যাংক। স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন উঠে যে, অভিজাত এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্লোরের দাম ১৫ হাজার ৫০০ টাকা হলে কেরানীগঞ্জের মফস্বল এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্লোরের দাম কীভাবে ২২ হাজার ৫০০ টাকা হয়! এখানে আর্থিক লেনদেনেও অনিয়ম করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, যেখানে এমন ছোট ঘটনায় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে; সেখানে বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে তাদের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।

উল্লেখ্য, তানাকা গ্রুপের স্বত্বাধিকারী মহিউদ্দিন মাহিন একসময় কেরানীগঞ্জের সামান্য এক ভিডিও ক্যাসেট ব্যবসায়ী ছিলেন। তানাকা সুমিকো নামে জাপানের এক ব্যবসায়ীর অর্থ আত্মসাৎ করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান শাক্তা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামেরকান্দা গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে মাহিন।