অঘটনে ঠাসা এবারের বিশ্বকাপ

জাহিদুল ইসলাম: বিশ্বকাপ ফুটবলের এবারের আসর শুরু হয়েছিল গত ১৪ জুন। এদিন স্বাগতিক রাশিয়ার প্রতিপক্ষ ছিল সৌদি আরব। কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ ম্যাচেও খেলল রাশিয়া। এবার তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ক্রোয়েশিয়া। বাঘের মতো লড়াই করে মাঠ কাঁপিয়েও শেষ পর্যন্ত হেরেছে স্বাগতিক দল। আর তাতেই নিশ্চিত হয়েছে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছে ক্রোয়েশিয়া। প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম।
শুরু থেকে যারা এবারের বিশ্বকাপ নিয়মিত দেখেননি, তারা অবাক হতেই পারেন। কারণ বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই যাদের গায়ে লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল ফেবারিটের তকমা, তারা কোথায়? ফেবারিটের তালিকায় থাকা দলগুলোর মধ্যে ব্রাজিল, স্পেন, জার্মানি, আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল বিদায় নিয়েছে! ফেবারিট দলগুলোর মধ্যে গতবারের চ্যাম্পিয়নরা গ্রুপ পর্বই অতিক্রম করতে পারেনি। স্পেন, আর্জেন্টিনা ও পর্তুগালের বিদায় ঘণ্টা বেজেছে নক আউট পর্বের প্রথম ম্যাচেই। কে ভাবতে পেরেছে কোয়ার্টারের আগেই ঝরে পড়বে দল তিনটি। বাকি থাকল ব্রাজিল, তারাও হেরে গেছে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে।
এ বিশ্বকাপে ‘ফেবারিট তত্ত্ব’ মোটেও কাজ করছে না। বিশ্বকাপে আসা ৩২টি দলের প্রত্যেকেই এসেছে শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে। যে কোনো বিশ্বকাপ আসরের তুলনায় এবারের বিশ্বকাপ সত্যিকার অর্থেই ভিন্ন আমেজ তৈরি করেছে। স্পেনকে বিদায় জানাল র‌্যাংকিংয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা রাশিয়া এবং শেষে সেমিতে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় তৈরি করেছিল। ইরান ও মরক্কো গ্রুপ পর্বেই দুই ফেবারিটের (স্পেন, পর্তুগাল) জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষও করেছিল সমানে সমানে, অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিল ফেবারিটেরা। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বেও শেষ ম্যাচ বহু কষ্টে জিতে পরের পর্বে ওঠে আর্জেন্টিনা। নিজের গ্রুপে প্রথমে মেক্সিকোও পরে কোরিয়ার বিরুদ্ধে হেরে বিদায় নেয় জার্মানি। লড়াই করেছে জাপান, সেনেগালের মতো দলগুলো। খেলার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বলার উপায় ছিল নাÑকে জিতবে? যা অন্যসব আসর থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
সেমিফাইনাল নিশ্চিত করা দলগুলো মধ্যে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দলটির নাম বেলজিয়াম। বর্তমানে দলটির অবস্থান তিন। বেলজিয়ামের বর্তমান দলটিকে বলা হচ্ছে দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সোনালি প্রজš§। এ দলে থিকো কর্তোয়ো, রোমেলো লুকাকু, মারুয়ান ফেলাইনি, ভিনসেন্ট কম্পানি, কেভিন ডি ব্রুইন, এডেন হ্যাজার্ডের মতো এক ঝাঁক তারকা রয়েছে। কোচ রবার্তো মার্টিনেজের অধীনে বেলজিয়ামের বর্তমান স্কোয়াডের ২৩ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১৮ জনই খেলেছেন ২০১৪ বিশ্বকাপে অথবা ২০১৬ ইউরোতে। তার মধ্যে ১২ জন খেলোয়াড়ের দুটি টুর্নামেন্ট খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। অথচ শুরুতে ফেবারিটের সারিতে রাখা হয়নি দলটিকে। বিশ্বকাপে সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর মধ্যে বেলজিয়াম অন্যতম। এখন পর্যন্ত ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থান অধিকার করাই সর্বোচ্ছ অর্জন।
সেমিফাইনালে নাম লেখানো আরেক দল ফ্রান্স। ফিফা ঘোষিত সর্বশেষ র‌্যাংকিংয়ে দলটি আছে সাত নম্বর পজিশনে। ১৯৯৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বর্তমান স্কোয়াড অত্যন্ত শক্তিশালী। অনেকেই বর্তমান দলটিকে ফ্রান্সের ইতিহাসে সেরা দল বলে বিবেচনা করছেন। রাশিয়া বিশ্বকাপে যেখানে ‘ফেবারিট তত্ত্ব’ কাজ করছে না, সেখানে ফ্রান্স অনন্য। ফেবারিটের তকমা লাগানো একমাত্র দল হিসেবে সেমিফাইনালে উঠেছে দলটি। এ দলে হুগো লরিস, জিরবিল সিদিবে, রাফায়েল ভারানে, স্যামুয়েল উমতিতি, লুকা হার্নান্ডেজ, পল পগবা, কিলিয়ান এমবাপ্পে, অলিভিয়ের জিরুড, আতোয়ান গ্রিজম্যান, উসমান ড্যাম্বেলের মতো প্রতিভাবান তারকারা রয়েছেন। এ পর্যন্ত ১৫ বার বিশ্বকাপ খেলা ফ্রান্সের সর্বোচ্চ অর্জন ১৯৯৮ সালের শিরোপা জয়। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অপরাজিত থেকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার কোচ দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স।
শেষ চার নিশ্চিত করা আরেক দল ইংল্যান্ড। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ১২তম অবস্থানে আছে দলটি। মানসম্মত দল হলেও বিশ্বকাপের শুরুতে কারও মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠেনি তারা। রাশিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে একটি হার ছাড়া সব ম্যাচে দাপুটে জয় পেয়েছে দলটি। এ দলে জর্ডান পিকফোর্ড, হ্যারি ম্যাগুউরে, জর্ডান হেনডারসন, রাহিম স্ট্যারলিং, অ্যাশলে ইয়ং, মার্কাস রাসফোর্ড, ডেলে আলির মতো খেলোয়াড়ের উপস্থিতি তাদের সাহস জোগাচ্ছে। এছাড়া বিশ্বকাপে ৬ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন। কোচ গ্যারি সাউথগেটের অধীনে দলটি নিজস্ব ছন্দে খেলে যাচ্ছে। বিশ্বকাপ আসরে এর আগে ১৪ বার খেলা দলটির বড় অর্জন ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ শিরোপা। ইংলিশ সাবেক তারকারা এবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। ১৯৯০ সালের পর এবারই প্রথম ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে।
বিশ্বকাপের শেষ চারে ওঠা চতুর্থ ও শেষ দল ক্রোয়েশিয়া। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে দলটি আছে ২০ নম্বর পজিশনে। এ দল কতটুকু উঠতে পারে? প্রশ্নটা ছিল এ রকম। তবে সবকিছু উল্টে গেছে তাদের খেলায়। গ্রুপ পর্বেই আর্জেন্টিনাকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে তারা। এ দলে দানিজেল সুবাসিচ, ভেদরান করলুকা, দোমাগোজ ভিদা, লুকা মডরিচ, ইভান রাকিতিচ, মারিও মানজুকিচ ও আন্তে রেবিচ মূল ভরসা। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত রয়েছে অপরাজিত। রাশিয়া বিশ্বকাপের আগে দলটি মাত্র চারবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। তিনবারই দলটি প্রথম পর্ব থেকে বিদায় নেয়। ক্রোয়েশিয়ার এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে সেরা অর্জন ১৯৯৮ আসরে তৃতীয় স্থান। তবে তারকাখচিত দলটির সামর্থ্য আছে সব পরিসংখ্যান পাল্টে দেয়ার। দলের কোচ জলাতকো দালিচের প্রত্যাশা খুব ভালোভাবেই পূরণ করছেন দলের খেলোয়াড়রা।
প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের মধ্যকার খেলাটি হবে চরম উত্তেজনাপূর্ণ। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট আর্জেন্টিনাকে হারানোর পর উরুগুয়ের বিরুদ্ধেও জয় তুলে নেয় দলটি। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলে জাপানের সঙ্গে খাবি খাওয়া বেলজিয়াম পরের ম্যাচে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে হারিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে বেলজিয়ামের তুলনায় ঢের এগিয়ে রয়েছে ১৯৯৮ সালের চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু দু’দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে এগিয়ে বেলজিয়াম। এখন পর্যন্ত দু’দলের ৭৩ বারের দেখায় ফ্রান্স জিতেছে ২৪ বার, সেখানে বেলজিয়াম জিতেছে ৩০ বার। বাদবাকি ১৯টি ম্যাচ মীমাংসা হয়েছে ড্রতে। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের বিচারে দুই দলই সমানে সমান। দু’দলই কাউন্টার অ্যাটাকে বেশ পারদর্শী। কিন্তু বেলজিয়ামের তুলনায় এ আসরে ফ্রান্সের গতি কিছুটা বেশি দেখা গেছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের ম্যাচে তা ফুটে উঠেছে। দলটি সবসময় খেলে পজিটিভ ফুটবল। এগিয়ে থাকা অবস্থায়ও প্রতিপক্ষকে সুযোগ দিতে নারাজ ফ্রান্স। এগিয়ে থাকলে আরও এগিয়ে যাওয়ার স্পৃহা আছে তাদের। অন্যদিকে জিতলেও বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ড ব্রাজিলের বিপক্ষে ছিল নিষ্প্রাণ। এগিয়ে যাওয়ার পর রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নিয়েছিল তারা। মনোবলের দিক দিয়ে তাই এগিয়ে থাকবে ফ্রান্স। এবারের আসরে ফ্রান্স ৯টি গোল করার বিপরীতে হজম করেছে ৪টি গোল। বেলজিয়াম ১৪টি গোল করেছে, খেয়েছে ৫টি গোল। বেলজিয়ামের হয়ে লুকাকু করেছেন ৪ গোল। ফ্রান্সের হয়ে গ্রিজম্যান ও এমবাপ্পে করেছেন তিনটি করে গোল। বিশ্বের জনপ্রিয় বেটিং সাইটগুলোতে বাজির ঘোড়া ফ্রান্সের পক্ষে। রক্ষণভাগ, মধ্যমাঠ ও আক্রমণভাগে কোনো দলকে পৃথকভাবে এগিয়ে রাখার সুযোগ নেই। তবে কৌশলগত দিকটি বিবেচনায় এগিয়ে যাবে চ্যাম্পিয়নরা।
দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ক্রোয়েশিয়া। হাড্ডাহাড্ডি একটা লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে বিশ্ববাসী। এবারের আসরে এখন পর্যন্ত কোনো বড় নামধারী দলের সঙ্গে খেলা হয়নি ইংল্যান্ডের। গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামের সঙ্গে লড়াই করে খেলেও হেরে যায় দলটি। সুইডেনকে হারিয়ে নিশ্চিত করে শেষ চার। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া গ্রুপ পর্বেই আর্জেন্টিনাকে নাকানি চুবানি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, এবার তারাও শিরোপা জেতার দাবিদার। স্বাগতিক রাশিয়াকে হারিয়ে সেমিতে নাম লেখায় দলটি। ইউরোপের দুটি দলেরই আছে আত্মবিশ্বাসী খেলোয়াড়ের বেঞ্চ। তবে মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ ক্রোয়েশিয়ার পক্ষেই যায়। লুকা মডরিচ ও ইভান রাকিতিচ এ দলের মধ্যমাঠের প্রাণভোমরা। অন্যদিকে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগের জন্য আতঙ্ক। এ পর্যন্ত সাতবারের দেখায় ইংল্যান্ডের জয় ৪টি, ক্রোয়েশিয়া ২টি এবং ১টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। ফুটবলবোদ্ধারাও এগিয়ে রাখছেন সাবেক চ্যাম্পিয়নদের।
এখন বিশ্ববাসীর নজর থাকবে রাশিয়ার মাঠে। ফাইনালে কোন দল দু’টি উঠবে? এমন তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকবে। বিশ্বমঞ্চে যে দলগুলো এত দূর এসেছে, তাদের প্রতিটিই যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই এসেছে। তবে জনপ্রিয় বেটিং সাইটগুলো বিশ্বকাপ জয়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে রেখেছে ফ্রান্সকে, তারপর ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়া। ‘ফেবারিট তত্ত্ব’ অনুযায়ী ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ফাইনাল খেলার কথা। তবে এবার যেহেতু এই তত্ত্ব বিপরীতমুখী আচরণ করছে, সেক্ষেত্রে বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়া হতে পারে সম্ভাব্য ফাইনালিস্ট। তবে ফাইনালের আগে জল্পনা-কল্পনার কোনো শেষ হবে না। এটাই বাস্তবতা।

গণমাধ্যমকর্মী