অচিন বৃক্ষ!

বৃক্ষটির নাম এলাকাবাসীর কাছে অজানা। কত বছর ধরে এটি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, তা কারও সঠিক জানা নেই। বৃক্ষটিকে সবাই ‘অচিন বৃক্ষ’ বলেই চেনে। জায়গাটিকে চেনে অচিন দ্বীপ হিসেবে। উদ্ভিদ বিভাগের কাছেও গাছটি অচেনা। কথিত আছে, এ বৃক্ষের ডাল-পালা কেউ ভয়ে ছিঁড়ত না। ছিঁড়লে পেটব্যথা করত। তবে রোগবালাইয়ের জন্য এর পাতা খুবই উপকারী। কথিত আছে, মানত করলে উপকার হয়। সুনিবিড় ছায়ায় বিশ্রাম নিলে ক্লান্ত পথিক আরাম বোধ করে। তাই গাছটি ‘ছায়াবৃক্ষ’ হিসেবেও পরিচিত।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গীর গ্রামে অচিন গাছটির অবস্থান। দৈত্যাকৃতির গাছটি কবে, কীভাবে, কে রোপণ করেছিলেন তা কারো ধারণায় নেই। তবে গাছটি নিয়ে এলাকায় রয়েছে অনেক কিংবদন্তি। সেসব কাহিনি রটে আছে এলাকার মানুষের মুখে মুখে।

বন বিভাগ ও গাছপালা নিয়ে গবেষণা করেন যারা, তাদের কেউ কেউ মাঝেমধ্যে গাছটি দেখতে আসেন। দেখে চলে যান; কিন্তু আজ পর্যন্ত গাছটির প্রকৃত নাম শনাক্ত করতে পারেননি কেউ। বৃদ্ধরাও বলেন, তারা বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে গাছটি দেখেছেন একইভাবে। এলাকাবাসী গাছটির বয়স কেউ আড়াইশ, কেউবা ৩০০ বছর বলে দাবি করেন।

গাছটি নিয়ে কিংবদন্তির শেষ নেই। এ গাছের ডাল কেটে রক্তবমি করে মারা গিয়েছিলেন একজন। তারপর থেকে কেউ ডাল কাটেন না। এমন কাহিনি বলতে ও বিশ্বাস করতে এলাকার লোকজন অভ্যস্ত।

স্থানীয় বয়োবৃদ্ধদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাছটির অজানা কাহিনি গা শিউরে ওঠার মতো। স্থানীয়রা বলেন, গাছটির বয়স হবে প্রায় ৩০০ বছর। ব্রিটিশ আমলে এখানে গভীর জঙ্গল ছিল। সেখানে ভয়ে মানুষ উঁকিও দিত না। পাকিস্তান আমলে ৬২ সালের দিকে অজানা এক সাধু আচমকা গাছটির নিচে আশ্রয় নেন। তার কানে ছিল দুল। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। পায়ে ঘুঙুর। পড়নে থাকত পাটের চট। বাকপ্রতিবন্ধী এ সাধু ক্ষুধা পেলে অচিন গাছের পাতা চিবিয়ে খেত। তার পাশে সব সময় জ্বলন্ত আগুনের কুণ্ডলী থাকত। আর বাঁশের তৈরি হুক্কা খেতেন। ধীরে ধীরে মানুষের যাতায়াত শুরু হয়। একসময় মানুষ সাধুর কাছে বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্য পানিপড়া আনত। উপকার পেয়ে অনেকে নানা কিছু মানত করত। তার সঙ্গে সব সময় বালতি থাকত। তাই ওই সময় তাকে সবাই ‘বালতি সাধু’ বলে চিনত।

বৃদ্ধরা আরও জানান, অচিন গাছের নিচে বিশাল আকৃতির সাপের বসবাস ছিল। একদিন গর্ত থেকে সাপ বের হয়ে এলে মানত করা মুরগি ধরে গর্তে ঢোকানোর চেষ্টা করলে সাধু পাগলা সাপের লেজ ধরে টানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। একবার মহররম মাসে আগুনের কুণ্ডলী থেকে তার পরনের চটে আগুন ধরে শরীরের বিভিন্ন স্থান ঝলসে যায়। ক্ষত অবস্থায় তার দেখভাল করতেন স্থানীয় আমেনার মা। প্রায় আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার জানাজা পড়ান স্থানীয় প্রয়াত কমুরউদ্দিন কাজী।

জাঙ্গীর সুন্নি মাদরাসার মাওলানা ফাইজুদ্দিন বলেন, বালতি সাধু ইরাকের বাগদাদের এক পীরের শিষ্য। তাই তাকে নুরা বাগদাদি বলে ডাকতেন অনেকে।

৭০ বছর বয়সী হুমায়ুন মাস্টার। এলাকার লোকের কাছে সম্মানীয়। তিনি বলেন, এ জায়গাটা ওয়াক্ফ সম্পত্তি। অচিন গাছের বিষয়ে তিনি বলেন, আমার দাদা ডেঙ্গুরি ভূঁইয়া প্রায় ১৩০ বছর বেঁচে ছেলেন। বাবা সোলায়মান ভূঁইয়া বেঁচে ছিলেন ৯০ বছর। তাদের মুখে ছোটকালে শুনেছি এ অচিন গাছের রূপকথার গল্প। তিনি বলেন, গাছটি অনেক পুরোনো। নুরা বাগদাদির আগমন না হলে অচিন গাছ ও অচিন দ্বীপের সৃষ্টি হতো না। উদ্ভিদ বিভাগের লোকজনও গাছটির পরিচয় চিহ্নিত করতে পারেনি। ফলে এলাকাবাসী গাছটিকে ‘অচিন গাছ’ বলেই চেনে। আর জায়গাটিকে চেনে অচিনতলা হিসেবে। তিনি বলেন, গাছটি দেখতে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসে। মানত করে। আগে কয়েকবার নুরা বাগদাদির নামে মেলা বসত। ঝামেলার কারণে এখন আর সেটা হয় না। মৃত মোতালিব মাস্টারের বরাত দিয়ে হুমায়ুন মাস্টার আরও বলেন, নুরা বাগদাদি মারা যাওয়ার ঠিক দেড় বছর পর তিনি পার্শ্ববর্তী একটি মেলায় যান। সেখানে গিয়ে তিনি কথা বলতে এগিয়ে গিয়ে দেখেন তৎক্ষণাৎ নুরা বাগদাদি হাওয়া। বহু খোঁজাখুঁজির পরও তার আর দেখা মেলেনি।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, অচিন দ্বীপের ওয়াক্ফ সম্পত্তি দখলে নিতে একটি চক্র মরিয়া। দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি নানাভাবে পাঁয়তারা চালিয়ে আসছে। পাশাপাশি অযতœ-অবহেলায় রয়েছে অচিন গাছ ও নুরা বাগদাদির মাজারটি। কথিত আছে, অচিন বৃক্ষটির ঝরেপড়া পাতাও কেউ কুড়িয়ে নেয় না। বছরে দু’তিনবার পাতা ঝরে। আবার ঝরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন পাতায় পল্লবিত হয়ে ওঠে শাখা-প্রশাখা। গাছের ডাল কিংবা পাতা অকারণে ছিঁড়লে পেটব্যথা হয়। তবে মনোবাসনা কিংবা রোগবালাইয়ের জন্য কেউ যদি পাতা ছিঁড়ে চিবিয়ে খায়, সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় না। উল্টো রোগ ভালো হয়ে যায়। বৃক্ষটির পাতা দেখতে অনেকটা তেজপাতার মতো। ফুল হয় না, তবে ছোট আকারের ফল হয়। দেখতে কিশমিশের মতো।

কথা হয় মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. নুরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, গাছটি সম্পর্কে আমার জানা নেই। যদি সরকারিভাবে কোনো নির্দেশনা আসে, তাহলে উদ্ঘাটনের চেষ্টা করব। যদি এ গাছটি কোনো ঔষধি গাছ হয়, তাহলে আমাদের অনেক কাজে আসবে। উপজেলা বন কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান শফি বলেন, শুনেছি এমন গাছের কথা। তবে এখনও পর্যন্ত দেখা হয়নি। খোঁজ নিয়ে গাছটির পরিচয় জানার চেষ্টা করব। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমি এখানে কিছুদিন হয় যোগ দিয়েছি। এটা ওয়াক্ফ সম্পত্তি কিনা আমার জানা নেই। যেহেতু জেনেছি, বিষয়টি আমি দেখব।

 

রাসেল আহমেদ, রূপগঞ্জ