মত-বিশ্লেষণ

অটিজমে অবহেলা নয়, চাই সচেতনতা

 

মো. রুপাল মিয়া: রহিমার সুখের সংসার। অন্তঃসত্ত্বা হলে তার সংসারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। তাদের অনেক দিনের আশা পূরণ হতে যাচ্ছে। রহিমার স্বপ্ন তাদের একটা পুত্রসন্তান হবে। অবশেষে রহিমার স্বপ্ন পূরণ হলো। রহিমার কোল আলো করে জন্ম নেয় একটা পুত্রসন্তান। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখে রহিম। একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন আসে সে যখন স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। রহিমের ক্ষেত্রে শারীরিক পরিবর্তন এলেও বুদ্ধিগত পরিবর্তনটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে মা-বাবা বেশ চিন্তিত। রহিমের বয়স যখন তিন বছর, তার মা তাকে কোলে নিয়ে আঙিনায় অন্য শিশুদের দৌড়াদৌড়ি, হাসাহাসি দেখছিল। কিন্তু তার সন্তান অন্য শিশুদের মতো আচরণ করতে পারছে না। এ নিয়ে সবসময়ই মানসিক চাপে আছে রহিমা।
রহিম অটিজম সমস্যায় আক্রান্ত। বছর খানেক আগে ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান অটিজমের কথা। অটিজম কোনো মানসিক রোগ নয়, মস্তিষ্কের বিকাশগত সমস্যা। যেটা একটা শিশুর তিন বছরের মধ্যেই প্রকাশ পায়। অটিজম সমস্যায় আক্রান্তদের বলা হয় অটিস্টিক শিশু। অটিজম মস্তিষ্কের স্নায়ুবিক সমস্যার কারণে হয়ে থাকে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গবেষকরা অটিজমকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার বলে আখ্যায়িত করেছেন। অটিজম কেন হয় তার সুনির্দিষ্ট কারণ উদ্ঘাটন করা সম্ভব না হলেও মনে করা হয় মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, অস্বাভাবিক গঠন কিংবা বংশগতির অস্বাভাবিকতা থেকে এ সমস্যা হতে পারে।
ধারণা করা হয় গর্ভকালে মায়ের ভাইরাস জ্বর, জন্মের সময় শিশুর অক্সিজেনের অভাব, পরিবেশ দূষণ ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের ফলে এমন শিশু জন্মগ্রহণ করতে পারে। সাধারণত তিন বছর বয়সে অটিজমের বিভিন্ন লক্ষণ ধরা পড়ে। যেমন ১২ মাস বয়সে নাম ধরে ডাকলে কোনো প্রতিক্রিয়া না করা, ১৪ মাস বয়সে কোনো কিছু দেখে আগ্রহ প্রকাশ না করা, ১৮ মাস বয়সে কোনো খেলার বস্তু নিয়ে খেলা না করা, দৃষ্টি সংযোগ না করা, ভাষাগত ত্রুটি, একা একা থাকতে পছন্দ করা, একই শব্দ বারবার বলা, দৈনন্দিন কাজের প্রতি অনীহা, যে কোনো শব্দ, গন্ধ, স্বাদ ও অনুভূতির প্রতি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি।
অটিস্টিক শিশুকে অনেকে পাগল, আলগা-দোষ, মা-বাবার অভিশাপ ইত্যাদি কুসংস্কারে সংজ্ঞায়িত করে থাকেন, যা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। অটিস্টিক শিশু জন্ম নিলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অটিজমের লক্ষণ দেখা দিলে অভিভাবকদের প্রয়োজন অটিস্টিক শিশুকে একজন চিকিৎসকের কাছে নেওয়া। সঠিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা পেলে অটিস্টিক শিশু সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি সঠিক পরিচর্যায় অনেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা যায়, প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে একজন শিশু অটিজমে আক্রান্ত। ২০০৭ সাল থেকে অটিজম সচেতনতা দিবস বাংলাদেশেও সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে। বিগত পাঁচ-ছয় বছরে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা অটিস্টিক শিশুদের সার্বিক অগ্রগতির এক মাইলফলক। ২০১০ সালে অটিস্টিক শিশুদের ওপর গবেষণার লক্ষ্যে ঈবহঃৎব ভড়ৎ ঘবঁৎড়ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ধহফ অঁঃরংস রহ ঈযরষফৎবহ (ঈঘঅঈ) স্থাপিত হয়। এরপর ২০১১ সালের ২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য কন্যা ও যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত মনস্তত্ত্ববিদ অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পরামর্শক্রমে এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে অঁঃরংস ঝঢ়বপঃৎঁস উরংড়ৎফবৎং-এর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১১টি দেশের অংশগ্রহণে ‘ঢাকা ঘোষণা’ গৃহীত হয়। এরই সূত্র ধরে অটিজম বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়।
অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে জটিলবিষয়কে সহজসরলভাবে ধাপে ধাপে উপস্থাপন করে বোঝাতে হবে। শ্রেণিকক্ষে বিশেষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষাদান করা যেতে পারে। এছাড়া শিক্ষকদের হতে হবে অত্যন্ত মানবিক এবং শিক্ষা উপকরণও হতে হবে অত্যন্ত উপযোগী।
অটিস্টিক শিশু বোঝা নয়, তারাও সম্পদে পরিণত হতে পারে। বেশিরভাগ অটিস্টিক শিশুর স্বাস্থ্য স্বাভাবিক থাকে। রহিমার আদরের সন্তান রহিমও শারীরিকভাবে ঠিকই বেড়ে উঠছে। শুধু মানসিক বা বুদ্ধিগত দিকটার উন্নতি ঘটাতে পারলে সেও হতে পারে দেশের মূল্যবান সম্পদ। তাই রহিমের মতো শিশুরা যাতে ভবিষ্যতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়, এটা আমার, আপনার সবার। আমরা যদি সবাই সচেতন থাকি, তবেই অটিস্টিক শিশুরা ভবিষ্যতে উপভোগ করতে পারবে স্বাভাবিক জীবন, তাদের মা-বাবা ফিরে পাবে অনাবিল সুখ আর দেশ পাবে সম্ভাবনাময় সুস্থ নাগরিক।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..