অতিমুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিকীকরণের ফল!

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘৭৯ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতালে সার্বক্ষণিক ডাক্তার নেই’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘বেসরকারি চিকিৎসাসেবা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর সময়ে ওই গবেষণা পরিচালনা করে সংস্থাটি। সে সময় তথ্য সংগ্রহ করা হয় ঢাকা মহানগরীর ২৬টি ও ঢাকার বাইরে আট বিভাগের ৯০ প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১১৬টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থেকে; যার মধ্যে রয়েছে ৬৬টি হাসপাতাল ও ৫০টি রোগ নির্ণয় কেন্দ্র। প্রতিবেদনে ঢাকা শহরের ২২টিসহ সারা দেশের মোট ৬৬টি হাসপাতালে চালানো হয় অনুসন্ধান। তাতে দেখা গেছে, ৫২টি হাসপাতালে তথা জরিপকৃত হাসপাতালগুলোর ৭৯ শতাংশেই নেই সার্বক্ষণিক চিকিৎসক; ৫৩টি হাসপাতালে সার্বক্ষণিক নার্স থাকেন না; পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই ২৯টিতে। প্রতিবেদনে বেসরকারি হাসপাতাল সেবার আরও নানা দিকে আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে আরও কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়Ñযার সঙ্গে ভুক্তভোগীরা তো ননই, অনেক পাঠকও দ্বিমত পোষণ করবেন না। আর আমরা এসব বিষয়ে উদ্বিগ্ন মূলত যে কারণে, এর সঙ্গে সার্বিক জনস্বাস্থ্য ইস্যুটি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত; যেহেতু দেশের মোট পরিবারগুলোর মধ্যে ৬৩ শতাংশই বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা নেয় এবং চিকিৎসকদের ৬০ শতাংশেরও বেশি বেসরকারি চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত।

একশ্রেণির হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেই বা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে অথবা নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক টয়লেট নেই কিংবা তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে নিয়মবহির্ভূতভাবে। আরেক শ্রেণির হাসপাতাল যে নবজাতক প্রসবে সিজারিয়ান পদ্ধতিকে উৎসাহিত করেÑসেটি বোঝা যাবে এ পরিসংখ্যান দেখেও যে, দেশে সিজারিয়ান নবজাতক প্রসবের হার ২০০৪ সালের চার শতাংশ থেকে ২৩ শতাংশে উপনীত হয় ২০১৪ সালে। এসবের বাইরেও নার্সদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, এসবই হচ্ছে টিআইবির প্রধান নির্বাহী যেমনটা বলেছেনÑএকশ্রেণির বেসরকারি হাসপাতালের অতিমুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা; যার শিকার শুধু নয়, জিম্মি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রশ্ন হলো, এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? স্পষ্টত এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কাছে দু’ধরনের হাতিয়ার বিদ্যমান। প্রথমত, বেসরকারি হাসপাতালগুলো নিয়ন্ত্রণের দিক। বেসরকারি হাসপাতালে ভুল বা বিনা চিকিৎসায় রোগী মারা গেছেÑএমন উদাহরণ রয়েছে প্রচুর। এতে রোগীর শারীরিক ক্ষতির ঘটনাও কম নয়। রাজধানীর নামকরা এক বেসরকারি হাসপাতালে অতিসম্প্রতি ভুল চিকিৎসায় এক পদস্থ কর্মকর্তার মারাত্মক ক্ষতি বোধকরি তার বড় প্রমাণ। সমস্যা হলো, এই হাসপাতালগুলোর পরিচালনা পর্ষদ এমনভাবে গঠিত, যেখানে অংশীদার থাকেন সাংবাদিক, রাজনীতিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের মতো সমাজের প্রভাবশালীরা। ফলে দেখা যায়, কোনো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক চিকিৎসাসেবায় মারাত্মক গাফিলতি বা ভুল করে ফেললেও তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না; প্রভাব খাটিয়ে তারা ঠিকই বেরিয়ে যাচ্ছে আইনের ফাঁকফোকর গলে। সমস্যা হলো, এসব প্রতিরোধে এ খাতের জন্য যে পৃথক আইন প্রয়োজন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা চূড়ান্ত হয়নি এক দশকেও। খাতটিকে সুশৃঙ্খল করতে তেমন একটি আইন দ্রুত প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিষয় হলো, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর অনুমোদন আর তার নবায়ন নিয়েও অভিযোগ বিস্তর। শোনা যায়, কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতালের নিবন্ধন পেতে পাঁচ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা এবং নবায়নের বেলায় ৫০০ থেকে ৫০ হাজার টাকার নিয়মবহির্ভূত লেনদেন হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন, প্রক্রিয়াটি চলতে থাকলে অতিমুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা দূরপূর্বক বেসরকারি হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়ন হবে কীভাবে?