অনিয়মের ঋণে ডুবেছে ওটিসির গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচার

পলাশ শরিফ: আশির দশকের শেষদিকে পথচলা শুরু করে গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচার ফার্ম লিমিটেড। তখনও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ ও গরু পালন বা কৃষিভিত্তিক শিল্প ততটা জনপ্রিয় ছিল না। চ্যালেঞ্জিং হলেও শুরুটা ভালো ছিল। কিন্তু ব্যবসায় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা ও অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে নেওয়া খেলাপি ঋণের কারণে বিপাকে পড়েছেন কোম্পানিটির উদ্যোক্তা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।

ঋণখেলাপির তকমা আর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে প্রায় ১৮ বছর ধরে ধুঁকছে গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচার। উৎপাদন বন্ধ ও টানা লোকসানের কারণে বর্তমানে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে অবস্থান করছে কোম্পানিটি।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৮৮ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদীতে গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানিটির মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল। এরপর পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়ে ১৯৯৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ২০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে অগ্রণী ব্যাংকের ঢাকাস্থ বিএএফ শাখার মাধ্যমে ১৯৯৪ সালে প্রায় আট কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় কোম্পানিটি। এরপর ২০০১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনটি সিসি (হাইপো) ঋণের মাধ্যমে আরও প্রায় ৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। কিন্তু তারপরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। ২০০৪ সালে গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচারকে ‘রুগ্ন শিল্প’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কিস্তি পরিশোধ ও সুদ মওকুফের পরও অগ্রণী ব্যাংকের কাছে কোম্পানিটির দায় ৬৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বর্তমানে  কোম্পানিটির উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে।

গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচারের উদ্যোক্তা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচার কোনো ভুঁইফোঁড় কোম্পানি নয়। ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করার জন্য এ কোম্পানির জš§ হয়নি। এর মালিকও এখন জনগণ। মূলত কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের পথ তৈরির জন্যই এ ব্যবসায় নেমেছিলাম। কিন্তু ব্যবসায়িক মন্দার কারণে পিছিয়ে পড়েছে। এরপর রাজনৈতিক কারণেই জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারণ আমার গায়ে একটি দলের লেবেল আছে। আমার সম্পদ আছে, কিন্তু পুঁজির অভাবে কিছু করতে পারছি না। উল্টো এখন ঋণখেলাপি বলে গালাগালি করা হচ্ছে। রাষ্ট্র তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণেই এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। আমাদের দেশের আইন ব্যবসায়ীদের জন্য, যারা ঋণ নিয়ে আত্মসাত করে তাদের জন্য নয়। যে কারণে রুগ্ন ঘোষিত হওয়ার পরও ব্যাংকগুলোর সহযোগিতা পাচ্ছি না। নতুন করে মূলধন জোগানো নিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে।’

এদিকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া কোম্পানিকে ঋণ প্রদান ও সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতর। অধিফতরের প্রতিবেদনে, পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতার পরও নতুন করে সিসি ঋণ দেওয়া, খেলাপি হওয়ার পরও পারফরম্যান্স গ্যারান্টি ও বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি করে পাওনা আদায় না করা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে বারবার সুদ মওকুফ করায় ২০১৩ সাল পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ৩৪ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সে সঙ্গে গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচারের বকেয়া আদায়কে ‘অনিশ্চিত’ বলে উল্লেখ করে সুদ মওকুফ আদেশ বাতিল ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে অডিট দফতর। তবে অদ্যাবধি সে নির্দেশনা আমলে নেয়নি অগ্রণী ব্যাংক। খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তার সঙ্গে পাল্টাপাল্টি মামলা চলছে।

আলাপকালে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গচিহাটা অ্যাকুয়াকালচারের যখন শুরু সে সময়ে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। এখনকার মতো বাজার ও ব্যবসায়িক পরিবেশ ছিল না। তারা বিদেশ থেকে গরু এনে খামার করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কোম্পানিটি ব্যবসায় পিছিয়ে পড়েছে। বকেয়া ঋণ আলোচনা হচ্ছে। কিছুদিন আগেও কোম্পানির উদ্যোক্তা একটি চিঠি দিয়েছেন। ঋণ টেকওভার নিয়ে অন্য ব্যাংকের সঙ্গেও কথা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। পুরোনো জটিলতা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

উল্লেখ্য, ২০০০ সালের পর থেকে লোকসানের মুখে থাকা কোম্পানিটির বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০০৪ সালে বন্ধ হয়ে গেছে। লোকসানের কারণে ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর কোম্পানিটিকে তালিকাচ্যুত করেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ। একই কারণে ২০১০ সালে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে পাঠিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটির  পুঞ্জীভূত লোকসান ২০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কোম্পানিটির ২০ লাখ ৭০ হাজার ‘কাগুজে’ শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতেই সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ) শেয়ার রয়েছে। এর বাইরে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে প্রায় ২৬ দশমিক ৪০ লাখ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে প্রায় ১৯ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ শেয়ার রয়েছে। সর্বশেষ কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ার ৩৪ টাকা ২৫ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।