সম্পাদকীয়

অনিয়ম ও অপরিকল্পিত গাছ নিধনের বিচার হোক

উষ্ণতার লাগাম টানতে পৃথিবীব্যাপী বনায়ন আন্দোলনের প্রচারণা ও সচেতনতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটা যখন বাংলাদেশ বেতার পালন করছে, তখন আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করেই গাছ নিধন করল সিলেট বেতার। একটি পূর্ণবয়স্ক বৃক্ষ ১০ জনের অক্সিজেন চাহিদা মেটায়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় এক লাখ ৮৮ হাজার মার্কিন ডলার। সেই গাছ কাটতে কর্তৃপক্ষ বনবিভাগ ও বেতারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার ব্যাপারে ছলচাতুরি করল। অধিকন্তু প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পের স্বার্থে গাছ কাটা জরুরি হলেও আইনকে উপেক্ষা করে এবং অপরিকল্পিতভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গাছ কাটার সুষ্ঠু বিচার আইন ও রাষ্ট্রের স্বার্থে বাঞ্ছনীয়।
বাংলাদেশে রয়েছে জনসংখ্যার ঊর্ধ্বমুখী চাপ, তেমনি কল-কারখানা ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের দূষণক্রিয়া, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে চলেছে আবহাওয়া ও জলবায়ু। অতিরিক্ত জনসংখ্যা এখানে অতিরিক্ত ভূমি ব্যবহার করলেই গাছ নিধন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। তবে গাছ না কাটা এবং লাগানোর ব্যাপারে বেতারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির পরে অনেকেই বসতবাড়ি কিংবা রাস্তার ধারে গাছ লাগিয়ে ঘাটতি কিছুটা কমিয়েছে, তবুও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। সে ক্ষেত্রে দেশে একটি গাছও কাটতে হলে ১০ জনের অক্সিজেনের ঘাটতি নিয়ে ভাবতে হবে। অথচ জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। অধিকন্তু, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, ধর্ম, বিশ্বাস, রীতি-আচার, বাণিজ্য, উৎসব, পার্বণ সবকিছুতেই গাছের সংশ্লেষ রয়েছে গায়ে গায়ে, মনস্তত্ত্বে। যাপিত জীবনের প্রশান্তিও রয়েছে এখানে। ভূমি, জল আর পরিবেশ বৈচিত্র্যের প্রধান অনুসঙ্গ গাছ নিয়েই আমাদের সমাজের সমৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক চলমানতা।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে বৃক্ষ-বাগান। গাছ কেবল নিজে নিহত হয় না, অগণিত প্রাণসত্তা ও বাস্তুসংস্থানও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সেই গাছকে বেতারের মতো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আঙিনা থেকে অপরিকল্পিত উপায়ে নিধন করার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ১৯৬১ সালে লাগানো পূর্ণবয়স্ক দেড়শ’ গাছ নিধন করে অন্তত দেড় হাজার মানুষের অক্সিজেনের ঘাটতি সৃষ্টি করেছে। উপরন্তু মাত্র চার লাখ টাকায় এত গাছ বিক্রি করে রাজস্ব ধ্বংস করার পেছনে কারা কী দুষ্টু চিন্তা নিয়ে কাজ করেছে তার অতলান্ত বিচার করা অপরিহার্য। গাছ বিক্রির বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ২২ দিন পর গাছ কাটার আবেদন জানিয়ে কোনো অনুমতি পাওয়ার আগেই গাছ কেটে উজাড় করার এই ধৃষ্টতা তারা কোথায় পেল, তার বিচারের ভেতরেই দেশের সুশাসন ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত হতে পারে।
এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যথাযথ তদন্ত ও বিচারকাজ সম্পন্ন করে দেশের বনায়ন ও সুশাসন সুরক্ষিত করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

সর্বশেষ..