ফিচার

অনুগল্প ভালোবাসার সদাই…

মো. ইমরান হোসেন: মানুষের বয়স যেন ঠিক নদীর স্রোতের মতো। জোয়ারের পানির মতোই বাড়তে থাকে। হাজার চেষ্টায়ও ধরে রাখা যায় না। তবে মানুষের স্মৃতিগুলো যেন স্রোতের বিপরীত। স্মৃতিরা মানুষের হৃদয়ে আঁকড়ে থাকে। অবসরে মানুষকে হাসায়, আনন্দ দেয়।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে মানুষের অনুভূতির বদল হয়। ছেলেবেলার অনুভূতি আর তরুণ বয়সের অনুভূতির মধ্যে অনেক অমিল। ছেলেবেলার অনুভূতিগুলোর যেন অনেক রঙ। ঠিক যেন রঙধনুর মতো। একা একা যখন কল্পনা করি, তখন অনেক হাসি। কেমন যেন সব চোখের সামনে ভাসতে থাকে।
এইতো কবছর আগের কথা। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমার ঠিক মনে আছে, সেবারের কোরবানির ঈদের কথা। প্রতিবছর বাবা আর আমার ছোট চাচ্চু কোরবানির গরু কিনতে বাজারে যেতেন। অনেকবারই আবদার করেছি; কিন্তু আমাকে তাদের সঙ্গে কখনও নেননি। বারবার অজুহাত দেখাতেন, আমি ছোট। তাই গরুর হাটে আমাকে তারা নেবেন না। আমি সেদিন চাচ্চুর স্যান্ডেল লুকিয়ে রেখেছিলাম। আমাকে না নিলে স্যান্ডেল দেব না! বাধ্য হয়ে সেদিন আমাকে তারা সঙ্গে নিয়েছিলেন।
খুলনার ফুলতলা উপজেলার ফুলতলা বাজার আমাদের গন্তব্য। এখানের গরুর হাটে অনেক বড় গরু বিক্রির জন্য আনা হয়। আমাদের আশেপাশের হাটগুলোর চেয়ে বড় হাট এটি। সেদিন এ হাটেই গিয়েছিলাম আমরা।
আমার গরুর হাট দেখার প্রথম অভিজ্ঞতা শুরু। যেদিকে তাকাই, সেদিকেই গরু আর গরু। ছোট, বড়, মাঝারি সব ধরনের গরু উঠেছে হাটে। দেশি-বিদেশি নানা রকম গরু দেখেছি সেদিন। এত গরু একসঙ্গে আগে কখনও দেখিনি। হাটের সব থেকে বড় গরুটির প্রতিই যেন সবার দৃষ্টি। স্পষ্ট মনে পড়ে, আমি সেদিন হা করে তাকিয়ে ছিলাম সেই বড় গরুটার দিকে। বিদেশি কোনো এক জাতের কালো গরু। এত বড় গরু আগে কখনও দেখিনি। সবাই অন্তত এক পলক হলেও গরুর আশেপাশে ভিড় জমাচ্ছিলেন। আমিও শামিল হই সেই দলে।
বাবা আর চাচ্চু অনেক গরু দেখে ফেলেছেন। গরুর মালিক একটা দাম বলেন, বাবা আর চাচ্চু আরেক দাম বলেন। এভাবে চলতে চলতে প্রায় তিন ঘণ্টা পর একটি মাঝারি সাইজের গরু কিনলাম। আমি তো মহা খুশি। হাট থেকে গরু কিনেছি। বাড়ির চাচাতো ভাইদের আগে গরু দেখেছি। এবার ফেরার পালা।
ফুলতলা হাট থেকে আমাদের বাড়ি প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে। গরুর মালিক আমাদের সঙ্গে যাবেন। বাবা আমাকে তার সঙ্গে গাড়িতে যেতে বললেন। আমি নাছোড়বান্দা! গরুর সঙ্গে হেঁটেই বাড়ি ফিরব। অনেক বলার পর বাবা রাজি হলেন। আমি, ছোট চাচ্চু ও গরুর সাবেক মালিক গরু নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। গরুটিও অনেক শান্ত। আমাদের সঙ্গে হাঁটছে, দৌড়াদৌড়ি করছে না। ওদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে আমার কষ্ট হচ্ছিল। আমি একপ্রকার দৌড়েই যাচ্ছিলাম। সেদিন আমার শরীরে কোনো ক্লান্তির ছাপ ছিল না। দুরন্তপনাই যেন বেশি কাজ করছিল। বাসায় পৌঁছাতে রাত ১০টা বেজে গেল। চাচাতো ভাইবোনরা গরু দেখে খুশিতে চিৎকার করতে থাকে। আমিও ওদের সঙ্গে আনন্দে তাল মিলিয়ে চিৎকার করতে থাকি। এ আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা আজও সম্ভব নয়।
সময় বদলে গেছে। সময়ের সঙ্গে বয়সও বেড়েছে। সেই দুরন্ত কিশোর থেকে তরুণে পরিণত হয়েছি। বাবা আর ছোট চাচ্চু এখনও কোরবানির গরু কিনতে যান। বাড়িতে গরু আসে; কিন্তু সেদিনের সেই অনুভূতি আর নিজের মধ্যে কাজ করে না। খুশিতে জোরে চিৎকার আসে না। অনুভূতিতে যেন মরিচা ধরেছে।
সেদিন হাজারো চিৎকারের ভিড়ে একটি দৃশ্য চোখ এড়াতে পারেনি। গরুর সাবেক মালিক যখন গরু রেখে যাচ্ছিলেন, তখন তার চোখে অশ্রু দেখেছি। তিনি বারবার গামছা দিয়ে চোখ মুছছিলেন। গরুটিও তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছিল, ওই গরুর সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্ক রয়েছে! শুনেছি লোকটি তার ছেলের মতো করেই গরুটি লালন-পালন করেছেন।
মানুষের চরিত্র বড়ই অদ্ভুত। জীবনের চাহিদা মেটানোর জন্য, অর্থের জন্য ভালোবাসার পশুটিকে বিক্রি করে দিতে হয়। সেদিন সেই লোকটিকে দেখে মনে হয়েছিল, তিনি গরু নয়, যেন আমাদের কাছে তার ভালোবাসা বিক্রি করেছিলেন।

সর্বশেষ..