অনুমোদন ছাড়াই পিপলস ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু!

নিয়াজ মাহমুদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো ধরনের অনুমোদন বা লাইসেন্স ছাড়াই কার্যালয় খুলে, সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বসে পড়েছে ‘পিপলস ব্যাংক লিমিটেড’। রাজধানীর বনানীতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় দেখে যে কারোরই মনে হবে, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ তফসিলি ব্যাংক! ব্যাংকটির সাইনবোর্ডে ‘প্রস্তাবিত’ শব্দটিও ব্যবহার করা হয়নি।

জানা গেছে, পিপলস ব্যাংকের উদ্যোক্তা চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের এমএ কাশেম, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্বেও আছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে একটি হোটেল রয়েছে এ প্রবাসী উদ্যোক্তার। ব্যাংক দেওয়ার জন্য তার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের। নতুন ব্যাংকের জন্য ৪০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন সংগ্রহ করতে তিনি ঘুরছেন ব্যবসায়ীদের কাছে। চট্টগ্রামের মাঝারি পর্যায়ের কয়েকজন ব্যবসায়ী ব্যাংকের মালিক হতে তার সঙ্গী হয়েছেন বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন ব্যাংকের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো আবেদনপত্র আহ্বান করেনি। ব্যাংক অনুমোদনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। কিন্তু সরকার চলতি বছরই আরও তিনটি ব্যাংক অনুমোদন দিতে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগ্রহ না থাকলেও ব্যাংক খাতে শিগগিরই যোগ হচ্ছে আরও তিনটি নতুন ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলোÑপিপলস ব্যাংক, বাংলা ব্যাংক ও পুলিশ ব্যাংক।

এদের মধ্যে উদ্যোক্তাদের দেওয়া একটি ব্যাংকের নাম পরিবর্তন হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। উদ্যোক্তারা পিপলস ইসলামী ব্যাংক নামে আবেদন করলেও পরে তারা ব্যাংকটির নাম থেকে ইসলামী শব্দটি বাদ দিয়েছে। ফলে এ ব্যাংকটি পিপলস ব্যাংক হিসেবে লাইসেন্স পেতে যাচ্ছে। তিনটি ব্যাংকের মধ্যে একটি ব্যাংক পেশাজীবীদের জন্য হলেও বাকি দুটির একটি হচ্ছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান মোরশেদ আলমের আবেদন করা ‘বাংলা ব্যাংক’। অপরটি

সন্দ্বীপের ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এমএ কাশেমের ‘পিপলস ব্যাংক’। জানা গেছে, এ ব্যাংক দুটিকে লাইসেন্স দিতে অর্থমন্ত্রী নিজেই গভর্নরের কাছে পৃথক চিঠি দিয়েছেন। এছাড়া পেশাজীবীদের ব্যাংকটি হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য পুলিশ ব্যাংক। নতুন তিনটি ব্যাংকের বিষয়টিও সরাসরি নাকচ করে তা অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ দেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক ব্যাংক আছে। তারপরও অনেক এলাকা ব্যাংকিং সেবার বাইরে আছে। এ কারণেই নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।’

সরেজমিন দেখা গেছে, বনানী ডিওএইচএসের ২ নং সড়কের ২৩/এ মোবারক প্লাজার ৫ম তলা ভাড়া নিয়ে অফিস খুলেছে পিপলস ব্যাংক। প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটের গেটে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। ভেতরে রয়েছে অভ্যর্থনা কেন্দ্র, সেখানেও বড় সাইনবোর্ড ঝুলছে। ভেতরে চেয়ারম্যানসহ অন্য কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক কক্ষ। এমএ কাশেম ওই অফিসে নিয়মিত আসেন বলে জানান ভবনটির প্রহরীরা।

জানা গেছে, একইভাবে অনুমোদন পাওয়ার আগেই অফিস খুলে কার্যক্রম শুরু করেছিল দি ফারমার্স ব্যাংক, যা বতর্মানে পুরো আর্থিক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। নিয়ম ভেঙে অফিস খুলে বসায় অনুমোদন পেলে ‘পিপলস ব্যাংক’ নতুন করে আর্থিক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সর্বশেষ অনুমোদন পাওয়া ৯ ব্যাংকের অধিকাংশই লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। অর্থনীতির আকার অনুযায়ী নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। এ মুহূর্তে যদি কোনো উদ্যোক্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম শুরু করে তা হবে অবৈধ। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি কঠোর করা উচিত বলে মনে করছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ শেয়ার বিজকে বলেন, এ মুহূর্তে নতুন ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় বিদ্যমান ব্যাংকগুলো যথেষ্ট। সবশেষে অনুমোদন দেওয়া ৯টি ব্যাংকের অধিকাংশের অবস্থায়ই শোচনীয়। এমন পরিস্থিতিতে অনুমোদন ছাড়াই যদি কেউ কার্যক্রম শুরু করে তা হবে অবৈধ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি বাড়ানো উচিত।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক দেবাশিস্ চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে। সম্প্রতি নতুন কোনো ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে শেয়ার বিজকে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কার্যক্রম শুরুর কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি এমনটা শুরু করে তাহলে আমাদের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ বিষয়টি দেখবে।’

আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে ২০১২ সালে ৯টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া নিয়ে দ্বিমত ছিল। অর্থনীতিবিদরাও এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সে সময় অনুমোদন পাওয়া সব ব্যাংকই পান সরকার-সমর্থিত ব্যক্তিরা। ব্যাংকগুলো হলো আয়কর উপদেষ্টা এসএম মনিরুজ্জামান খন্দকারের মিডল্যান্ড ব্যাংক, সাংসদ এইচএন আশিকুর রহমানের মেঘনা ব্যাংক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ফারমার্স ব্যাংক, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ইউনিয়ন ব্যাংক, সরকারদলীয় সাংসদ ফজলে নূর তাপসের মধুমতি ব্যাংক এবং এসএম আমজাদ হোসেনের সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা ফরাসত আলীর এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, ইকবাল আহমেদের এনআরবি ব্যাংক ও নিজাম চৌধুরীর এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক অনুমোদন পায়।