অনুমোদন জটিলতায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে দাতা সংস্থা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ত্রাণ প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ প্রকল্পগুলোর অনুমোদনে বাড়তি জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গত ১৫ নভেম্বরের পর থেকে কোনো বিদেশি সহায়তার প্রকল্প ছাড় করাতে পারেনি দেশীয় বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও)। বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে প্রাথমিকভাবে বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোও জটিলতার কারণে বাতিল করছে অনেকে। কক্সবাজারে কর্মরত কয়েকটি এনজিওর প্রতিনিধিরা গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান।
স্থানীয় এনজিও এবং নাগরিক সমাজের ফোরামের (সিসিএনএফ) ও কোস্ট বিডির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দফতরের অধীনস্থ এনজিও ব্যুরো দেশি এনজিওগুলোর বিদেশ থেকে প্রাপ্ত অর্থের অনুমোদন দিয়ে থাকে। ২০১৬ সালের ৪৩ নম্বর আইন অনুযায়ী জরুরি ও দুর্যোগকালীন সময়ের প্রকল্পগুলোর জন্য ব্যুরো কর্তৃক ২৪ ঘণ্টায় অনুমোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিদেশি সহায়তা অনুমোদনের ক্ষেত্রে দেশি সংস্থাগুলোর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশি সংস্থার প্রকল্পের জন্য স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন করা হচ্ছে না। এই জটিলতার কারণে মূলত এনজিও ব্যুরোর কর্তৃত্ব খর্ব করার পাশাপাশি এনজিওদের উন্নয়ন কর্মসূচি বিলম্বিত হচ্ছে।
এনজিও প্রতিনিধিরা জানান, দুই মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্রের জন্য মাসব্যাপী ফাইলের পেছনে ছোটাছুটি করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এ অবস্থায় এরই মধ্যে কোস্টবিডির প্রস্তাবিত দুই কোটি টাকার বিদেশি অনুদান বাতিল করেছে বিদেশি সংস্থা। কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক এবং সিসিএনএফের কো-চেয়ার রেজাউল করিম চৌধুরীর সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ফোরামের কো-চেয়ার এবং পালস্-এর নির্বাহী পরিচালক আবু মোর্শেদ চৌধুরী। অন্যদের মধ্যে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত সংগঠনের (এডাব) পরিচালক একেএম জসিম উদ্দিন ও আইএসডিইর নির্বাহী পরিচালক নাজের আহমেদ বক্তব্য রাখেন।
আবু মোর্শেদ চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, এনজিও ব্যুরোর অনুমোদন প্রক্রিয়ার এ জটিলতা অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। এরই মধ্যে ডিপথেরিয়া এবং ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে সেখানে। বক্তারা বলেন, আগস্টের শেষ দিক থেকে এনজিও তৎপরতা শুরু হলেও নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে নতুন প্রকল্পের পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেওয়া (এফডি-৭) শ্লথ হতে শুরু হয়। সরকার নিরাপত্তার অজুহাতে এমন উদ্যোগ নিলেও বস্তুত এ উদ্যোগের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সহায়তা পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে।
এনজিও প্রতিনিধিরা বলেন, অনেক বিদেশি সংস্থা এরই মধ্যে প্রাথমিক সম্মতির ভিত্তিতে অন্য প্রকল্পের টাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খরচ করা শুরু করেছে। এখন সরকারি ব্যবস্থার জটিলতার কারণে বিদেশি সহায়তা না এলে ওই প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া এনজিওকর্মীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না।
এনজিও কর্মীরা আরও দাবি করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সহায়তার জন্য সরকার বিদেশি এনজিওগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে। তাতে আইএসসিজির পাঠানো তালিকাভুক্ত এনজিওর প্রস্তাবগুলোই ছাড় করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু দেশের অনেক এনজিও আইওএমের অধীন ওই সংস্থার তালিকাভুক্ত নয়। ওই বিদেশি সংস্থা মূলত বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত এবং তাদের বাজেটের বড় অংশই চলে যায় বিদেশি কর্মীদের বেতন ও আবাসন সুবিধার পেছনে। ফলে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী এর সুবিধা পায় না। এজন্য বিদেশি তালিকার বিপরীতে জেলা প্রশাসন বা রিলিফ কমিশনারের তালিকাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা। এ বিষয়ে এনজিওকর্মীরা ছয়টি দাবি জানান। এগুলো হলো আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এনজিও ব্যুরোতে জমা দেওয়া প্রতিটি রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রম-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর অনুমোদন, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুসরণ, এরই মধ্যে যে সময় পেরিয়ে গেছে সে অনুযায়ী প্রকল্প মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দান, জরুরি এই ত্রাণ কার্যক্রমগুলোর সময়সীমা তিন মাস থেকে বাড়িয়ে ১২ মাসে উন্নীত করা, সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম, শিক্ষা এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনী কার্যক্রম-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর প্রতি অগ্রাধিকার এবং ব্যুরোতে একজন পূর্ণাঙ্গ মহাপরিচালক নিয়োগ দান, যা গত দুই মাস ধরে খালি রয়েছে।
এডাব পরিচালক একেএম জসিম উদ্দিন বলেন, এনজিও ব্যুরো কর্তৃক নিবন্ধিত এনজিওগুলোর জন্য ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থানে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই। বরং এনজিওগুলো যদি তাদের কার্যক্রম উঠিয়ে নিয়ে যায় তাহলে তারা দ্রুত জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়তে পারে। আইএসডিইর পরিচালক নাজের আহমেদ বলেন, সেনাবাহিনী ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় এনজিওগুলো যেভাবে রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। যদি এনজিওগুলো তাদের কার্যক্রম উঠিয়ে নেয় তাহলে ইউএন সংস্থা একচেটিয়াভাবে আধিপত্য বিস্তার করবে এবং যা কি না ব্যয়বহুলও বটে। বর্তমানে কক্সবাজারে এক হাজার বিদেশি কাজ করছে, যাদের প্রতিজনের পেছনে প্রতিদিন ৩০০ ডলার ব্যয় হচ্ছে। তার অর্থ হলো, তাদের জন্য প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা। রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, আমাদের কাছে প্রমাণ আছে, সময়ক্ষেপণের কারণ দেখিয়ে দাতাসংস্থাগুলো তাদের জরুরি তহবিল (লেটার অব ইন্টেন্ট) বাতিল করছে এবং প্রকল্প অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত অর্থ ছাড় করতে চাচ্ছে না।