দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কৌশলপত্র নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক: কয়েক বছর ধরে দেশে উচ্চ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। তবে প্রবৃদ্ধির সুফল সমভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। আমাদের প্রবৃদ্ধি প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান তৈরি করছে না। এতে অসম উন্নয়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে এখনও কৌশলপত্র নির্ধারণ করা হয়নি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সেমিনারে এ ধরনের মন্তব্য করেন বক্তারা।
সেমিনারটি গতকাল রাজধানীর গুলশানের একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। ‘পারসুইং সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফর এচিভিং ইনক্লুসিভ গ্রোথ; ইস্যুজ অ্যান্ড প্রায়োরিটিজ’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, ন্যায্যতাভিত্তিক মানসম্পন্ন শিক্ষা, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রবৃদ্ধির সুফল সবার মাঝে সুষম বণ্টন এখনও আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন ব্যয় তুলনামূলক বৃদ্ধি হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি আমাদের যুবসমাজের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারছে না। প্রতি বছর ২১ লাখ ব্যক্তি চাকরির বাজারে ঢুকছে। তাদের মধ্যে ১৩ লাখ চাকরি পাচ্ছে, আর আট লাখ চাকরি পাচ্ছে না। এটা আমাদের দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। গত কয়েক বছরে ধনীদের আয় ১২১ গুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে দরিদ্র শ্রেণির আয় বেড়েছে মাত্র পাঁচ শতাংশ। এতে বৈষম্যের ব্যবধান অনেক বড় হচ্ছে। এছাড়া আগের তুলনায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা খারাপ।
শিক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির সুপারিশ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নয়ন নিশ্চিতে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে খাতভিত্তিক বিস্তারিত পরিকল্পনা নির্ধারণ না করতে পারলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, দুর্নীতি বন্ধ ও সামাজিক উন্নয়নে সরকারের মনোযোগ দিতে হবে। আলোচনায় অংশ নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সব সরকারের কাছেই সুশাসন গুরুত্বপূর্ণ। দেশে এখন সুশাসনের প্রধান প্রতিবন্ধক হচ্ছে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সরকারের কাছ থেকে এমপি পদে নমিনেশন না পেয়ে ক্ষুব্ধ। এজন্য এখন বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া গায়েবি ও আজগুবি মামলা জামিনযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি অ্যাপিলেট ডিভিশনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে মামলাজট হচ্ছে। ঢাকা শহরে একদিকে যানজট ও আদালতে বাড়ছে মামলাজট।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনাক জাহান স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়নে সামাজিক নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। যারা সরকারের সঙ্গে উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। শুধু এমপিরাই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। সামাজিক নেতৃত্বও জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ সুশাসনের জন্য প্রতিবন্ধক।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে পড়তে হয় তার গায়ের রঙ কালো হলে কোন জামা পরতে হবে। এটি বর্ণবাদের শিক্ষা দিচ্ছে। ড. মুক্তাদির বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য সরকারের কোনো কৌশলপত্র নেই। গ্রামের মানুষদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে।
এছাড়া বক্তারা বলেন, পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার্থীরা শিখছে না। বিভিন্ন পরীক্ষা ও শিক্ষার্থীর মেধার জরিপ বলছে তারা জ্ঞানার্জনে পিছিয়ে পড়ছে। সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিনামূল্যে বই দিচ্ছে। কিন্তু গাইডবইয়ের প্রতি অনেক বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এটি বৈপরীত্য প্রকাশ করে। ব্যবসা করা সরকারের কাজ নয়। প্রবৃদ্ধির মূল অনুঘটক বেসরকারি বিনিয়োগ। মাদরাসা শিক্ষাকে মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতার সুশাসন নিশ্চিতে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এজন্য কেন্দ্র ছাড়া জেলাভিত্তিক কর্তৃপক্ষ তৈরি করতে হবে, যাতে সেসব জেলার সামাজিক নেতৃত্বের প্রতিনিধি থাকেন।
আলোচকদের আলোচনা ও প্রশ্ন শেষে উত্তর দিয়ে বক্তব্য দেন পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, দারিদ্র্যের হার কমলেও এখনও তা দেশের জন্য বড় সমস্যা। ক্ষুধা আমাদের তাড়িত করে ফিরছে। এখান থেকে উত্তরণের পর জীবনমানের উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দেওয়া হবে। সরকার বিদ্যুৎক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া কর্মসূচিও যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে কাজ করছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মান ধীরে ধীরে বাড়বে। মানসম্পন্ন শিক্ষার কথা বললেই ইংরেজি শিক্ষার কথা বলা হয়। অথচ চীন, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশেই ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হয় না। তারা ইংরেজি বলেও না। তারা কি উন্নয়ন করছে না এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বাংলা ভাষায়ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। এজন্য ন্যায্য ও গুণগত শিক্ষা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে সংস্থাটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, উন্নয়নের পরিমাপক হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষা। কোচিং মানসম্পন্ন শিক্ষার অন্তরায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ব্যয় বাড়াতে হবে। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে অন্যদের মধ্যে শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ড. শরিফুল ইসলাম, তৌফিক জোয়ার্দার, আতিক রহমান, শারমিন মোর্শেদ, সমীর রঞ্জন নাথ প্রমুখ বক্তব্য দেন।

সর্বশেষ..



/* ]]> */