অপব্যবহারের ঝুঁকি বেশি

গতকালের শেয়ার বিজে ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিকভাবে ফোর্সড লোন বৃদ্ধি সংক্রান্ত খবরটি পাঠকদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। দুশ্চিন্তার মূল কারণ হলো, ব্যবসার জন্য ঋণ নিতে হলে প্রক্রিয়াগত কারণেই কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ঋণ গ্রহণে ইচ্ছুকদের দিতে হয় প্রয়োজনীয় জামানত ও অন্য কাগজপত্র। সময় কিছুটা বেশি লাগলেও এতে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স প্রক্রিয়া কার্যকর। অথচ ব্যবসার প্রয়োজনে ব্যাংকগুলো থেকে ছাড়কৃত স্বল্প সময়ের অগ্রিম অর্থ, যার অন্যতম পরিভাষা ফোর্সড লোনÑ তাতে অনুমোদন দিতে অপেক্ষাকৃত কম সময় লাগে এবং প্রক্রিয়াটিও তুলনামূলক সহজ। সাধারণ ঋণ নিয়েই তো অভিযোগ কম নেই। এর অপব্যবহার নিয়েও শঙ্কিত অনেকে। সেসব অভিযোগ অমূলক, এমনটা বলা যায় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য-উপাত্ত বলছে, অর্থনীতিতে বেড়ে চলেছে খেলাপি ও মন্দ ঋণ। এর পরিণতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা অবগত নন, তেমনটিও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবু খেলাপি ঋণ বাড়ছে শুধু নয়Ñসরকারের তরফ থেকে সতর্কতা জারির পরও বাড়ছে। এ অবস্থায় ব্যাংকের তারল্য সংকট মেটাতে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা জোগানোর পরও একশ্রেণির ব্যাংক তার ভবিষ্যৎ বিষয়ে মোটেও চিন্তিত নয় বলে প্রতীয়মান। অন্যান্য কারিগরি বিষয় বাদ দিলেওÑকারও কারও মতে, এটাই সবচেয়ে মারাত্মক। উড্ডীয়মান পর্যায়ে অর্থনীতিতে কিছু ভুল বিনিয়োগ হবে, কিছু দুর্বল বিনিয়োগ হবে; এটা নতুন কোনো প্রবণতা নয়। সেক্ষেত্রে ব্যাংক খাত বিনিয়োগে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে পারে, এও জানা কথা। ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়াক, এতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নামে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে আমানতের অর্থ নিয়ে দুঃসাহস দেখানোটা বাড়াবাড়ি এবং তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
আমাদের প্রতিবেদক জানিয়েছেন, আগ্রাসী ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) বাড়ে নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১৯ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ লাখ ৩০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা; যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এদিকে গত এপ্রিল পর্যন্ত ফোর্সড লোন তথা ব্যবসায়ীদের অগ্রিম দেওয়া হয়েছে ৮ লাখ ৫০ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা, যা মার্চে ছিল ৮ লাখ ৪০ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। বছর হিসাব করলে এক বছরের ব্যবধানে পরিমাণটি বেড়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা বা ১৭ শতাংশ। এক্ষেত্রে আমানতের সঙ্গে এক ফোর্সড লোনের ব্যবধান কেমন, সেটি আর ব্যাখ্যা করতে হবে না। বুঝে ওঠা কঠিন, ব্যাংকগুলোর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কারণগুলো আসলে কী। এক্ষেত্রে অগ্রিম ঋণের অর্থ অপব্যবহারের শঙ্কা অত্যন্ত বেশি। তা সত্ত্বেও এমন ধারণা পোষণ করা কঠিন যে, কেবল একশ্রেণির ব্যবসায়ীকে লুটপাটের সুযোগ করে দিতেই অসাধু চক্র বাড়িয়ে চলেছে ফোর্সড লোন। তা নয়। এক্ষেত্রে অধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হচ্ছে, একশ্রেণির ব্যাংক মনেই করে যেভাবে হোক, ঋণ বাড়লেই বাড়বে বিনিয়োগ তথা প্রবৃদ্ধি। সমস্যা হলো, বাজারে অর্থ উপার্জনের সুযোগ সহজ নয়। এটা ব্যক্তির বেলায় যেমন সত্য; ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান, এমনকি রাষ্ট্রের বেলায়ও সত্য। সেই সত্য উপেক্ষা করে অগ্রিম ঋণের মাধ্যমে জোগানো সুবিধা অপব্যবহারের সুযোগ যেন তৈরি না হয়, সেদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক নজরদারি কাম্য।