অপ্রতিরোধ্য মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি

মাসুম বিল্লাহ ও শেখ আবু তালেব: দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে গতি নেই। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নতুন কোনো শিল্পায়ন নেই বললেই চলে। তারপরও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি। ফলে বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি। আর এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দুর্বল নজরদারিকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, আমদানি পণ্য তালিকার শীর্ষ পর্যায়ে উঠেছে মূলধনি যন্ত্রপাতি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সময়ে গত অর্থবছরের চেয়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। অথচ এ সময়ে সার্বিক আমদানি প্রবৃদ্ধি ২৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। শুধু মার্চ মাসেই আমদানি বেড়েছে ৪৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের। মূলধনি যন্ত্রপাতি অস্বাভাবিক আমদানি অর্থ পাচারের উৎস হচ্ছে কিনা, তা ভাবিয়ে তুলছে অর্থনীতিবিদদের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) পর্যন্ত মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে ৪১৬ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের। গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত আট মাসে মূলধনি যন্ত্র আমদানি হয়েছে ৩৬৭ কোটি ১৯ লাখ ডলার। এ হিসাবে ফেব্রুয়ারির চেয়ে শুধু মার্চ মাসেই আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ৪২১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ একপ্রকার স্থবির। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে মূলধনি যন্ত্রাংশ আমদানির বিপরীতে এলসি সেটেলমেন্ট প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে তেমন প্রভাব দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে যেহেতু কোনো শুল্ককর দিতে হয় না, সুতরাং এখানে ওভার ইনভয়েসিং করলে জরিমানার সুযোগ নেই। এ সুযোগে অর্থ পাচার হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আবার রফতানির ক্ষেত্রেও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার হতে পারে। এটা রোধ করতে হলে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
গত অর্থবছরের ৯ মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে ২৮৮ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। এবার মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে ১২৭ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা ১০ হাজার ৮৬৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। অথচ গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে ৩৬১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের। গত ৯ মাসেই ছাড়িয়ে গেছে গত অর্থবছরের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ।
বিশাল আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রের চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়ছে দ্রুত। গত ৯ মাসে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭০৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। আর গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তা পাঁচগুণ বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ১৩৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়ে এক হাজার ৩২০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এর প্রভাব পড়েছে ডলারের ওপর। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল তিন হাজার ৩৩৬ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। মার্চে ৯৬ কোটি ৭২ লাখ ডলার কমে হয়েছে তিন হাজার ২৪০ কোটি ১৮ লাখ ডলার। এতে ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে হুহু করে। গত এক বছরে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় পাঁচ শতাংশ। দাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার ছাড়তে শুরু করেছে।
অস্বাভাবিক আমদানি পণ্যর তালিকায় চালের পরই রয়েছে মূলধনি যন্ত্রপাতি। দুই দফায় বন্যায় ধানের ক্ষতি হওয়ায় মজুদ করতে সরকারের চাল আমদানি পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও হঠাৎ করেই মূলধনি যন্ত্রপাতির অস্বাভাবিক আমদানি বৃদ্ধির কোনো ব্যাখ্যা দিতে পরছে না বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের কোনো মহল।
অথচ গত আট মাসে ব্যাংকিং খাত থেকে বিনিয়োগ কমেছে সাত হাজার কোটি টাকা। নগদ টাকার সংকটে অধিকাংশ ব্যাংকই ঋণ দেওয়ার পরিমাণ কমিয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক সক্ষমতার অর্ধেকে নামিয়েছে ঋণ বিতরণ। বড় ঋণ দেওয়া থেকে সরে এসেছে সবাই। বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বিনিয়োগ কমার পরেও এত মূলধনি যন্ত্রপাতি অমদানি অর্থের জোগান দাতাদের ভূমিকা নিয়ে। তারা আশঙ্কা করছেন, ব্যাংকগুলোর যথাযথ নিয়ম-কানুন মেনে ঋণপত্র খোলা নিয়ে।
সূত্র জানিয়েছে, অতীতের ধারাবাহিকতায় এখনও কয়েকটি ব্যাংক এ অর্থের জোগান দিচ্ছে। এই এলসিগুলো এক পর্যায়ে ফোর্সড ঋণে পরিণত হবে। তা এক পর্যায়ে খেলাপি হবে। এই প্রক্রিয়া চলতে সময় লাগবে এক থেকে কয়েক বছর। এভাবেই আইনের বিভিন্ন ফাঁক গলিয়ে সুবিধাবাদী ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঋণগুলো খেলাপিতে পরিণত হবে। দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ব্যাংকের বার্ষিক রিপোর্টেও তা প্রকাশ পায় কয়েক বছর পরে। এভাবেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণ কেলেঙ্কারির জš§ হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে।
আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা এমন বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম শেয়ার বিজকে বলেন, গত কয়েক মাসে যে হারে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, তাতে এর আড়ালে অর্থ পাচারের সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। চলতি হিসাবে ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে টাকার বিনিময় হার ঠিক রাখা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।