অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশন এড়াতে চাই নিশ্চিত তথ্যাধিকার

শামসুন নাহার: নারী জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতার নাম মাতৃত্ব। এ অভিজ্ঞতা আনন্দের, পূর্ণতার। আবার মাতৃত্বের আনন্দের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে নানারকম আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা। এত প্রতীক্ষার পর ছোট্ট সোনামণি সুস্থ, সাবলীলভাবে মায়ের কোল আলো করে আসবে তো! কিংবা সন্তান জš§দানের পর মা ও শিশু দুজনেই ঝুঁকিমুক্ত থাকবে তো! এমনিই হাজারো চিন্তা শুধু গর্ভবতী মায়ের নয়, ঘিরে থাকে পরিবারের সবার মনে। এটা মা ও শিশু জীবন-মরণের প্রশ্ন। তাই নিরাপদ মাতৃত্বের গুরুত্ব সীমাহীন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতটা নিরাপদ আমাদের দেশের গর্ভবতী মায়েরা? আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানের সুফল কি যথাযথই পাচ্ছি আমরা?
গত ২৬ মে ছিল নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। প্রতিবছরই এদিন পালিত হয় বিভিন্ন প্রতিপাদ্য ও সেøাগান সামনে নিয়ে। সরকারের সচেতন প্রচেষ্টার ফলে মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসে বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় ভালো অবস্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তা সত্ত্বেও চিকিৎসা খাতের কিছু অনিয়মের কারণে মাতৃসেবার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে যে ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছেÑতা ভবিষ্যতে কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না। নিরাপদ মাতৃসেবা নামে চালু হয়েছে এক বিপজ্জনক প্রবণতা। তা হলো অপ্রয়োজনীয়ভাবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জš§দান বা সিজারিয়ান অপারেশন।
মায়ের যোনিপথে সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময় মা বা শিশুর স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে স্বাভাবিক বা নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তলপেট থেকে জরায়ুর একটি অংশ কেটে বের করে আনা হয় নবজাতককে। রোমের অধিনায়ক সিজারের জন্ম এ পদ্ধতিতে হয়েছিল বলে একে সিজারিয়ান ডেলিভারি বলা হয়। অভিজ্ঞ ও দক্ষ ডাক্তারের মাধ্যমে যদি সঠিক সময়ে সিজারিয়ান সেকশন বা সি-সেকশন করানো না যায় তাহলে তা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই দেশের সব জায়গায় সিজারিয়ান ডেলিভারির ব্যবস্থা বা জীবনরক্ষাকারী ‘জরুরি প্রসূতি সেবা’র সহজলভ্যতাকে স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় ইতিবাচক নির্ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠের মতোই এর অপব্যবহারের রয়েছে ভয়াবহ ক্ষতিকর দিক। ঠিক কোন কোন পরিস্থিতিতে সি-সেকশন করানো যাবে, চিকিৎসা শাস্ত্রে তা সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। কিন্তু দেশে প্রতি বছর সিজারিয়ান ডেলিভারির হার যেভাবে বাড়ছে তাতে মাতৃসেবা ও মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। মায়েদেরও অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান ডেলিভারির দিকে ঝোঁক বাড়ছে বলে জানা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্যমতে, কোনো দেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত। অথচ সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৪ অনুসারে, ২০১৪ সালে সিজারিয়ান পদ্ধতিতে জš§দানের হার ছিল ২৩ শতাংশ, যা ২০০৪ সালে ৪ শতাংশ; ২০০৭ সালে ৯ শতাংশ ও ২০১১ সালে ছিল ১৫ শতাংশ। গত প্রায় চার বছরে এ হার যে আরও বেড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমানে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় অন্তত ৩৮ শতাংশ ডেলিভারি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হচ্ছে। আর বেসরকারি হাসপাতালে এ হার ৮০ শতাংশেরও বেশি।
এটা স্পষ্ট যে, দেশে সি-সেকশনের হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কিন্তু এর পেছনে কারণ কী? অনেকে মনে করেন, আমাদের দেশে মায়েদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। শারীরিক দুর্বলতার কারণে তারা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জš§ দিতে পারছেন না। এ সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পুষ্টিহীনতা, খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি, পরিবেশ দূষণ, শরীরচর্চায় অনীহা প্রভৃতি নানা কারণে বাংলাদেশের নারীরা এখন হয়তো আগের চেয়ে শারীরিকভাবে অশক্ত। এজন্য হয়তো প্রসব বেদনা সহ্য করার মতো শক্তি ও মনোবল তাদের নেই। আবার অনেক চিকিৎসকরাও এমন বলেছেন যে, আজকাল অনেক মা চিকিৎসা বিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে এ কষ্টকর অভিজ্ঞতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগটি ব্যবহার করতে চান। আবার দেখা গেছে, ধনীদের মধ্যে এবং ব্যয়বহুল প্রাইভেট হাসপাতালে সি-সেকশনের হার বেশি। সামগ্রিকভাবে দেশের নারীরা যদি দুর্বল হন তাহলে শ্রেণিভেদে সি-সেকশনের হার ভিন্ন হবে কেন এটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে।
এখানে আপত্তির বিষয়টি হলো, স্বাস্থ্যসেবা তো বাজারের অন্যসব সাধারণ পণ্য বা সেবার মতো নয়। এখানে সেবাগ্রহীতা চাইলেই সন্তান ডেলিভারির যে কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন না। আবশ্যকতা না থাকলেও প্রসূতি মায়ের ইচ্ছায় বা অন্য কোনো কারণে সিজারিয়ান সেকশন করানো চিকিৎসা শাস্ত্রের নৈতিকতা পরিপন্থী। এক্ষেত্রে কর্তব্যরত ডাক্তার কোনোভাবেই প্রসূতির ভুল সিদ্ধান্তের দায়মুক্ত হতে পারেন না। তাকে ভালোভাবে অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশনের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। স্বাভাবিক ডেলিভারির ইতিবাচক দিক সম্পর্কেও নিঃস্বার্থভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। এসব তথ্য জানা তার অধিকার। এমনকি প্রসূতিকে উৎসাহ ও সাহস সঞ্চার করাও ডাক্তারের দায়িত্ব। সেখানে আমরা দেখছি একেবারে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরাই বরং সি-সেকশনের জন্য প্রসূতিকে উৎসাহিত এমনকি চাপ প্রয়োগ করেন। কারণ সি-সেকশনের মাধ্যমে সন্তান জš§দান যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ। এ কাজের জন্য বাড়তি অর্থ পান চিকিৎসকরা। তাই কোনো প্রকার জটিলতা না থাকলেও সি-সেকশনের সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে মায়েদের। এভাবে আংশিক বা ভুল তথ্য দিয়ে বা বিশেষ উদ্দেশ্যে রোগীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সি-সেকশনের বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। যেমনÑএক. স্বাভাবিক জš§দানের মাধ্যমে মা ও সন্তানের স্বাভাবিক সংযোগ ব্যাহত হয়; দুই. অপারেশনের স্থানে ব্যথা হতে পারে; তিন. জীবনব্যাপী সতর্কভাবে চলাফেরা করা প্রয়োজন হয়, যাতে অপারেশনের স্থানে বেশি চাপ না পড়ে; চার. ডেলিভারির পর দীর্ঘদিন ব্যথা থাকে; পাঁচ. সিজারের সময় অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগের প্রভাবে দীর্ঘকাল ভুগতে হতে পারে; ছয়. একবার সিজারিয়ান ডেলিভারির পর পরবর্তী সন্তান জন্মদানের সময় জরায়ুমুখে গর্ভফুল চলে আসা বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মতো জটিলতা ও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে; সাত. সন্তান জন্মদান ক্ষমতা কমে যেতে পারে প্রভৃতি।
এছাড়া বাচ্চার ওপরও সিজারিয়ান ডেলিভারির কিছু ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। যেমন এক. সি-সেকশনে জন্ম নেওয়া বাচ্চার শরীরে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি কম থাকায় রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে; দুই. স্বাভাবিক পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া বাচ্চার চেয়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অন্তত ২০ শতাংশ বেশি থাকে; তিন. পরবর্তী জীবনে অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
যে কোনো সেবার ক্ষেত্রে তথ্য প্রদানের কাজটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর চিকিৎসা খাতে এর কোনো বিকল্প নেই। তাহলে এই যে বিপুলসংখ্যক মায়েরা স্বপ্রণোদিত হয়ে সি-সেকশনকে বেছে নিচ্ছেন এবং তাতে যে চিকিৎসকের দায় রয়েছেÑতা অস্বীকার করা যায় না। পরিণতিতে দেশে গড়ে উঠছে কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন প্রজš§। তাই এ গুরুতর সমস্যা প্রতিকারে প্রসূতি মায়েদের তথ্যাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খতিয়ে দেখতে হবে কী কী কারণে সি-সেকশনের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে একালের মায়েদের। এছাড়া অর্থলিপ্সু ডাক্তারদের দৌরাত্ম্যে সি-সেকশনের হার বৃদ্ধি ঠেকানোর উপায় নিয়েও ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে বাড়াতে হবে সরকারি নজরদারি। শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত ধাত্রী নিয়োগ করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সেবার মান নিয়ন্ত্রণ করতে কঠোর হতে হবে এবং প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রসূতিবিদদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সার্বক্ষণিক নিরিক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এছাড়া প্রসূতি মায়েদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কাউন্সেলিং বা উদ্ধুদ্ধকরণ প্রোগ্রাম ও শরীরচর্চার ব্যবস্থাও সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয়। সিজারিয়ান ও নরমাল ডেলিভারির খরচ ও ভাতা সমান হারে নির্ধারণ করতে হবে। তাহলে ডাক্তাররা আর অর্থের লোভে সি-সেকশনের জন্য প্রসূতিকে চাপ প্রয়োগ করায় আগ্রহী হবেন না।
এমন আরও অনেক উপায়ে অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশনের হার কমানো সম্ভব। তবে এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা ও সবার সচেতনতা। আমাদের দেশে ডাক্তার নয়, এমন অনেক অসাধু ব্যক্তিও যেখানে ক্লিনিক খুলে হরদম চিকিৎসা ব্যবসা করছে, সেখানে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের এ চক্র ভাঙা খুব সহজ কাজ হবে না হয়তো। তবু এ পরিস্থিতিতে আমাদের সচেতনতাই পারে এদের দৌরাত্ম্য কমাতে। প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা সম্পর্কে সম্যক অবহিত করা চিকিৎসকের দায়িত্ব এবং এ সেবা পাওয়া প্রসূতির অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করতে সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে চিকিৎসককেও হতে হবে মহান এ পেশার প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল, আরও মানবিক।

গণমাধ্যমকর্মী