মত-বিশ্লেষণ

অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান নয়

ডা. রোকসানা হোসেন জেবা: সিজারিয়ান সেকশন (ইংরেজিতে Cesarean section) যা সি-সেকশন (C-section) নামেও পরিচিত। এটি একটি শল্যচিকিৎসা (অপারেশন), যা শিশু জন্মদানের জন্য মায়ের পেট ও জরায়ুতে করা হয়। এটি সাধারণত করা হয় তখন, যখন প্রাকৃতিক নিয়মে জন্মনালির মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হয় না অথবা স্বাভাবিক প্রসব করতে গেলে মা ও শিশুর জীবন হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। ইদানীং প্রাকৃতিক পন্থায় স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হলেও অনেক মা সিজারিয়ানের মাধ্যমে শিশু জন্মদানের জন্য মত দেন।
সি-সেকশন একটি জীবন রক্ষাকারী আধুনিক পদ্ধতি এতে কোনো সন্দেহ নেই। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে সময়মতো সিজার করতেই হবে। তা না হলে মা, নবজাতক অথবা উভয়ের ক্ষেত্রে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে। সাধারণত গর্ভবতী মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা বা জরুরি প্রসূতিসেবা কতখানি সহজলভ্য, তার ওপর একটি দেশের সিজারিয়ানের হার নির্ধারিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি দেশে সিজারের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়।
একজন নারীর জীবনে সন্তান জন্মদান অতি কাক্সিক্ষত বিষয়। নারীর জীবনে কোনো ঘটনার সঙ্গেই এর তুলনা হয় না। একজন নারী দুটি উপায়ে সন্তান প্রসব করতে পারেন। স্বাভাবিক পদ্ধতিতে এবং সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচার পদ্ধতিতে। স্বাভাবিক পদ্ধতি বলতে বোঝায় জরায়ু থেকে প্রসব পথ দিয়ে শিশুর জন্ম লাভ করা। স্বাভাবিক পদ্ধতিতে প্রসব হতে হলে কয়েকটি বিষয়ে লক্ষ রাখতে হয়: মায়ের শক্তি ও শারীরিক সুস্থতা, জরায়ুর গঠন, প্রসব পথের গঠন, জরায়ুর ভেতরে শিশুর অবস্থান প্রভৃতি বিষয়। এদের কোনো একটি বা একাধিক বিষয়ে অস্বাভাবিকতা থাকলে তা স্বাভাবিক ডেলিভারিতে মা ও শিশু উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সেজন্য মা ও শিশুর সুস্থতার স্বার্থে ক্ষেত্রবিশেষে সিজারিয়ান পদ্ধতিতে প্রসব আবশ্যক হয়ে পড়ে। যেসব কারণে সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন হয়, সেগুলো হলো প্রসব পথ যদি গর্ভস্থ শিশুর মাথার আয়তনের তুলনায় ছোট হয়, মায়ের একলাম্পসিয়া এবং প্রি-একলাম্পসিয়া দেখা দেয়, গর্ভাবস্থায় কোনো কারণে শিশুর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়, গর্ভফুলের অবস্থান জরায়ুর গ্রিবার ওপরে থাকলে প্রসব পথ আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকে। ফলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে মা ও শিশুর জীবন বিপন্ন হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সিজারিয়ানের প্রয়োজন হয়। গর্ভাবস্থায় জরায়ুর ভেতর রক্তপাত হলে, জরায়ুর মুখে বা প্রসব পথে টিউমার হলে, নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও যদি প্রসব বেদনা শুরু না হয়, প্রসব ব্যথা আট থেকে ১২ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও যদি প্রসবের উন্নতি না হয়, তবে সিজারিয়ানের প্রয়োজন হয়। প্রথম এক বা দুটি শিশুর জন্ম যদি সিজারিয়ানের মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী প্রসব অবশ্যই সিজারিয়ান পদ্ধতিতে হতে হবে। আগের শিশুটি গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের সময় মারা গেলে, সন্তানহীনতার ইতিহাস থাকলে, মায়ের অপুষ্টি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ থাকলে, গর্ভবতীর বেশি বয়সে প্রথম সন্তান ধারণ করলে সিজারিয়ানের মাধ্যমে প্রসব করাতে হয়।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) ২০১৭ সালের জরিপে দেখা যায়, দেশে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার ৩৫ দশমিক পাঁচ শতাংশ। ২০০৪ সালে এ হার ছিল চার শতাংশ; ২০০৭ সালে ৯ শতাংশ এবং ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে। গত ছয় বছরে সিজারিয়ানের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে। দেশে মা ও শিশু স্বাস্থ্যের অনেক উন্নতি হলেও অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যা, যা মাতৃস্বাস্থ্যের বিষয়ে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করেছে। বর্তমানে গর্ভাবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার হার প্রায় ৫১ শতাংশ এবং প্রায় ৪১ শতাংশ মা সন্তান প্রসব করেন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এখন হাসপাতালে জন্ম নেওয়া ১০ নবজাতকের মধ্যে ছয়টিই জন্ম নিচ্ছে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে। আর বেসরকারি হাসপাতালে এ হার প্রায় ৮০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমা দেশগুলোয় অস্ত্রোপচারের সংখ্যা কম। অথচ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ হার বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা কমে যাওয়ায় কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপও বাড়ছে। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড ঠিক রেখে সার্বিকভাবে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সিজারিয়ান অপারেশনের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সুইডেন, নরওয়ে এবং জার্মানির সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে প্রায় একই রকম তথ্য। সিজারিয়ান শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক জন্ম নেওয়া শিশুর মতো সক্রিয় থাকে না। অপারেশনের সময় নবজাতকের জিনে কমপক্ষে ৩৫০টি ইমিউন জিনের পরিবর্তন হয়। ফলে শিশুর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে। শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, শিশু দুর্বল হয়। অন্যদিকে, স্বাভাবিক প্রসব ব্যথার সময় মায়ের স্ট্রেস হরমোন তার গর্ভের শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে তোলে। স্বাভাবিক জন্মের পরিবর্তে যেসব শিশু সিজারিয়ানের মাধ্যমে জন্ম নেয়, তাদের ডায়াবেটিস, ক্যানসার, অ্যাজমা ও বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জি হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে। উন্নত দেশগুলোয় একজন নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মায়ের বুকে শুইয়ে দেওয়া হয়, যাতে মা ও শিশুর মধ্যে একটি বন্ধন তৈরি হয়। আর সিজারিয়ানের সময় মায়ের জ্ঞান না থাকায় তা সম্ভব হয় না। যা পরবর্তীকালে শিশু ও মায়ের নিবিড় বন্ধন তৈরিতে প্রভাব ফেলে। সিজারের মাধ্যমে শিশু প্রসব করার সময় বার্থ ক্যানেল সরু থাকায় শিশুর ফুসফুসে চাপ পড়ে। অনেক সময় সিজারিয়ান শিশুর জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্ট ও হৃৎপিণ্ডের সমস্যা দেখা দেয়। স্কটিশ বিজ্ঞানীদের সমীক্ষা থেকে জানা যায়, সিজারিয়ান পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া শিশুর স্কুলের পারফরম্যান্স স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেওয়া শিশুর চেয়ে খারাপ হতে পারে। কারণ, সিজার করা হয় মায়ের প্রসব ব্যথা হওয়ার আগে, অর্থাৎ শিশুর মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ হওয়ার আগেই।
সিজারিয়ান অপারেশনে মায়ের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হয়ে থাকে। কয়েকদিন তাকে হাসপাতালে থাকতে হয়। শিশুর জন্মের পরও ব্লিডিং বেশি হলে অনেক ক্ষেত্রে গর্ভ অপসারণ করে ফেলতে হয়। মায়ের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়, জরায়ু ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে, অপারেশনের পর ব্যথা হয়, যা কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়; অনেককে বেল্ট পরতে হয় অনেক দিন। পরবর্তীকালে সন্তান ধারণের সময় টিউবাল প্রেগনেন্সি, প্লাসেন্টা প্রিভিয়া ও অ্যাবরশন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই অপারেশনের সময় পেটের ভেতরের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনেক সময় সংক্রমণ বা প্রদাহের জন্য প্রসূতিকে সুস্থ হতে বিলম্ব হতে পারে। অচেতন অবস্থা সৃষ্টি করতে যেসব ড্রাগ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো অনেক সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অপারেশনের পর প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। স্বাভাবিক ডেলিভারিতে অক্ষম হওয়ায় মানসিক অবসাদ হতে পারে। সর্বোপরি সিজারিয়ান অপারেশনের ফলে পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সরকারি হাসপাতালের তুলনায় প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার অনেক বেশি। উচ্চবিত্ত প্রসূতিদের মধ্যে সিজারিয়ানের প্রবণতা বেশি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সিজারিয়ানের উচ্চহার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে গাইনোকলজিস্টদের অতিরিক্ত অর্থলিপ্সা এই সি-সেকশনের প্রবণতার জন্য দায়ী বলেও অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তবে গাইনোকলজিস্ট চিকিৎসকদের মতে, গর্ভকালীন মায়ের যে পরিমাণ যত্ন নেওয়া দরকার, তা নেওয়া হয় না। এর ফলে প্রসবের জন্য ডাক্তারের কাছে আসে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়, তখন সিজার ছাড়া উপায় থাকে না। আমাদের দেশে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও কর্মজীবী মায়েরা ডেলিভারির পেইন সহ্য করতে চান না। ব্যথাবিহীন নরমাল ডেলিভারির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনও পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ পরিবার তাই ঝুঁকি নিতে রাজি থাকে না। স্বাভাবিক ডেলিভারিতে নবজাতক ও মায়ের ঝুঁকি একটু বেশি। এ ব্যাপারে ক্লিনিক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য ও দালালচক্র অনেকাংশে দায়ী। ডাক্তারদের একটি অংশ স্বাভাবিক ডেলিভারিতে নিরুৎসাহিত করে বা ভয়ভীতি দেখায়; ফলে শিশু জš§ দিতে গর্ভবতী মা অসহায় হয়ে সিজার করতে রাজি হন।
ঢাকাসহ সারা দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের বিভিন্ন রেট রয়েছে। হাসপাতালভেদে এর খরচ ২০ হাজার টাকা থেকে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত; তবে সরকারি ও এনজিও পরিচালিত হাসপাতালে পাঁচ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায় সিজার করা হয়।
একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে ডাক্তারদের উচিত, প্রসূতি মাকে স্বাভাবিক ডেলিভারির ভালো দিকগুলো বোঝানো। গর্ভবতী মাকে উৎসাহ ও সাহস দেওয়া, ধৈর্য ধরে প্রসববেদনা সহ্য করার পাশাপাশি কোনো জটিলতা দেখা দিচ্ছে কি না, তা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা। এ ক্ষেত্রে প্রসূতিবিদদের সংগঠন অবসটেট্রিক অ্যান্ড গাইনোকলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রসব নরমাল হবে, না কি সিজার হবে  প্রসূতিবিদকে সততার সঙ্গে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে পরিস্থিতি বুঝে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সাফল্য অনেক, বিশেষ করে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতিসংঘ পুরস্কার পেয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক এখন মানুষের হাতের নাগালে। গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য এখন আর মা’দের অনেক দূরে যেতে হয় না। দেশের এ সফলতা ও বাস্তব অগ্রগতির এ ধারাবাহিকতায় অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং দেশও তা হতে দিতে চায় না।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..



/* ]]> */