অবশেষে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পে অর্থ ছাড় শুরু

আড়াই বছর পর অর্থ ছাড় করল চীনের এক্সিম ব্যাংক

ইসমাইল আলী: কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিসিসিসি) সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৫ সালের জুনে। এরপর প্রায় আড়াই বছর পেরিয়ে গেছে। গত বছর অক্টোবরে চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তিও সই করা হয়। তবে এরপরও আটকে ছিল ঋণের অর্থ ছাড়। অবশেষে গতকাল কর্ণফুলী টানেলের অর্থ ছাড় করেছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রকল্পটির আওতায় তিন দশমিক চার কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল ছাড়াও পূর্ব প্রান্তে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ও পশ্চিম প্রান্তে ৭৪০ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে আট হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৭০ কোটি ৫৯ ডলার বা পাঁচ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার কথা চীনের। বাকি অর্থ সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।

তথ্যমতে, প্রথম কিস্তিতে চীন দুই কোটি ডলার অর্থ ছাড় করেছে। পর্যায়ক্রমে বাকি অর্থ ছাড় করবে চীনের এক্সিম ব্যাংক।

এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন দেওয়া হয় কর্ণফুলী টানেল। পরের মাসেই এর নির্মাণকাজ উদ্বোধনের ঘোষণা দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পরে তা পিছিয়ে ২০১৬ সালের মার্চে কাজ শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে অর্থায়ন না পাওয়ায় এত দিন প্রকল্পের কাজ ঝুলে ছিল। আর চীনের অর্থায়ন না পাওয়ায় প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজও চলছিল ধীরগতিতে।

তথ্যমতে, টানেল নির্মাণে ২০১৩ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই করে চীনের সিসিসিসি ও হংকংয়ের ওভিই অরূপ অ্যান্ড পার্টনারস। আর টানেল বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালে চীন সফরকালে দেশটির সরকারকে অনুরোধ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় চীন সরকার টানেল নির্মানে সম্মত হয়। এজন্য চীনের সিসিসিসির সঙ্গে গত বছর জুনে ৭০ কোটি ৫৯ লাখ ডলার বা পাঁচ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার নির্মাণ চুক্তি সই করা হয়।

ইআরডি সূত্রমতে, প্রাথমিকভাবে ৭০ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের ৮৫ শতাংশ চায়না এক্সিম ব্যাংক প্রকল্পটিতে ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। এজন্য ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ঋণ প্রস্তাব পাঠানো হয় চীন সরকারের কাছে। পরে নির্মাণ ব্যয়ের শতভাগই দিতে সম্মত হয় এক্সিম ব্যাংক। এক্ষেত্রে ২০১৫ সালের মার্চে সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়া হয় দেশটির সরকারের কাছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশটির পক্ষ থেকে কোনো উত্তর আসেনি। অবশেষে গত অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরকালে ৭০ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের ঋণচুক্তি সই হয়।

চীনের ঋণে দুই শতাংশ সুদ হার ছাড়াও দশমিক ২০ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জ ও দশমিক ২০ শতাংশ ম্যানেজমেন্ট চার্জ দিতে হবে। ঋণ ছাড় করতে যত দেরি হবে কমিটমেন্ট ও ম্যানেজমেন্ট চার্জ তত বাড়তে থাকবে। আর পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরে পরিশোধ করতে হবে পুরো ঋণ। এ ঋণের গ্রান্ট এলিমেন্ট ২৫ দশমিক ৪১ শতাংশ।

জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, চীন অর্থ ছাড় করেছে। ইআরডির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এখন দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে। তবে ঋণ ছাড় না হলেও অন্যান্য কাজ চলছিল। টানেলের বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ করছিল সিসিসিসি। পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণেও চলছিল।

সূত্র জানায়, নির্মাণ ব্যয়ের বাইরে টানেলের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন বাবদ দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে মনে করছে সেতু কর্তৃপক্ষ। আর টানেল নির্মাণকালীন চার বছরে সুদ বাবদ ৪২৯ কোটি টাকা লাগবে। গাড়ি কেনা, পরামর্শক ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় তো আছেই। এছাড়া প্রকল্পটির জন্য ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কেনা, চট্টগ্রামে প্রকল্প অফিস নির্মাণ ইত্যাদি কাজ করবে সিসিসিসি।

জানতে চাইলে সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী ও কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. কবির আহমেদ বলেন, প্রকল্পের প্রাথমিক কার্যক্রম কিছুটা ধীরগতিতেই চলে, এটাই স্বাভাবিক। তবে ঋণের অর্থ ছাড় হওয়ায় দ্রুত প্রকল্প কাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে। আশা করা যায়, ২০২০ সালের মধ্যেই এটি নির্মাণ সম্পন্ন করা হবে।

প্রসঙ্গত, কর্ণফুলী নদীর মোহনায় কাফকো-পতেঙ্গা পয়েন্টে টানেলটি নির্মাণ করা হবে। এটি নদীর পশ্চিম পাশে সি বিচের নেভাল গেট পয়েন্ট থেকে নদীর ১৫০ ফুট নিচ দিয়ে অপর পাশে গিয়ে উঠবে। দক্ষিণ পাড় থেকে সংযোগ সড়ক দিয়ে টানেলটি বাঁশখালী সড়কে গিয়ে মিলবে।