অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধে সর্বদা তৎপর বিএফআইইউ

দেশে সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কাজ করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বিশ্বব্যাপী ১৫৯টি আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার জোট এগমন্ট গ্রুপের এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপের কো-চেয়ার হিসেবেও দায়িত্বে রয়েছে এটি। গত অক্টোবর থেকে নবগঠিত এ বিএফআইইউ’র ‘প্রধান কর্মকর্তা’ পদে নিয়োগ পেয়েছেন আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। পরপর দুই মেয়াদে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিএফআইইউ’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিএফআইইউ নিয়ে সম্প্রতি শেয়ার বিজকে জানান তার পরিকল্পনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ শাফায়াত হোসেন

শেয়ার বিজ: এক মাসের বেশি হলো বিএফআইইউ’র প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। আগেও এই সংস্থার প্রধানই ছিলেন ডেপুটি গভর্নর থাকাকালে। এখন অবশ্য নবগঠিত একটি পদে আছেন। সংস্থাটির গঠনের শুরু থেকেই এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কোন প্রেক্ষাপটে বিএফআইইউ গঠিত হয়েছিল?

রাজী হাসান: প্রথমেই বলতে হবে বিএফআইইউ গঠনের পেছনে অনেক প্রচেষ্টা কাজ করেছে। এরও একটা প্রেক্ষাপট আছে। আশির দশকে উন্নত দেশগুলোয় মাদক নিয়ে ব্যাপক অরাজকতা চলছিল। বিশেষ করে আমেরিকার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয়। ওই সময় থেকেই মাদক চোরাচালানের অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করেছিল। এরপর অন্য দেশগুলোও একই উদ্যোগ নিতে শুরু করে। পরে জি-৭-ভুক্ত দেশগুলো ১৯৮৯ সালে সিদ্ধান্ত নিল এ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করার। তখন তারা একটি টাস্কফোর্স গঠন করে ৪০টি সুপারিশ তুলে ধরল। এর মূল বক্তব্য ছিল মাদক ঠেকাতে না পারলেও এর অবৈধ অর্থ অর্থনীতিতে ঢুকতে না দেওয়া। এভাবেই ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স দাঁড়িয়ে যায়। ওই টাস্কফোর্স গোটা বিশ্বকে আটটি ভাগে ভাগ করে ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে থাকে। বাস্তবায়নের কাজগুলোও তারা তদারকি করে। আমরা যে ভাগে আছি সেটা হলো এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ।
পরে অবশ্য মাদকের সঙ্গে সব অবৈধ লেনদেন ঠেকানোর জন্যও তারা কাজ করতে থাকে চোরাচালান, মানবপাচার, অস্ত্রপাচার সবকিছুই। ওই ৪০টি সুপারিশের মধ্যে একটি ছিল অবৈধ অর্থের লেনদেনের তথ্য আন্তঃদেশীয়ভাবে আদান-প্রদানের জন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থা গঠন করতে হবে। এটাই হলো ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (এফআইইউ)।

শেয়ার বিজ: দেশে বিএফআইইউ গঠন করা হয় কত সালে?

রাজী হাসান: প্রথমে আমাদের মানি লন্ডারিং আইন করতে হয়েছে। তারপরে তারা বলল যে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধের জন্য একটি বিভাগ থাকতে হবে। পরে তারা বলল শুধু বিভাগ দিয়ে হবে না, একটি স্বতন্ত্র ইউনিট করতে হবে, যারা বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দিয়ে সহযোগিতা করবে। ২০০৭ সালে এটি গঠন করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে। এখন জাতিসংঘের সদস্য সব দেশেরই এফআইইউ থাকতে হয়। কোনো কোনো দেশের এফআইইউ তথ্য আদান-প্রদানের পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেও জড়িত। তবে আমরা কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মধ্যে সীমিত রাখছি। এক্ষেত্রে আমরা মালয়েশিয়াকে অনুসরণ করছি।

শেয়ার বিজ: বিএফআইইউ’র পরিধি বাড়ানো নিয়ে কি কোনো চিন্তা করছেন?

রাজী হাসান: এখন এই সংস্থার কার্যক্রম অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এটার জনবল সরবরাহ ও অন্যান্য খরচ বহন করছে। কিন্তু পরিচালনগত কাজ স্বতন্ত্রভাবেই চলছে। আমাদের কোনো কাজ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পর্যন্ত যায় না। কেবল কোনো কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণ করতে চাইলে বা প্রশিক্ষণে যেতে চাইলে সেই অনুমোদন দেন গভর্নর। এছাড়া আমি অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কো-অরডিনেশন কমিটির দায়রক্ষকও বটে। অর্থাৎ বিএফআইইউ’র বাহ্যিক কার্যকলাপগুলোও সংস্থাটি নিজেই করছে।

শেয়ার বিজ: নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন?

রাজী হাসান: আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি কোনো প্রার্থীর সন্দেহজনক কোনো লেনদেন খতিয়ে দেখতে বলে, তবে আইন অনুযায়ী আমরা সেগুলো অবশ্যই তাদের সরবরাহ করব। আমাদের একটি তথ্যভাণ্ডার আছে। এছাড়া প্রয়োজন মনে করলে আমরা বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জসহ সব রিপোর্টিং এজেন্সি থেকে তথ্য নিতে পারি। যেখানেই অর্থনৈতিক লেনদেন আছে, সেখানেই বিএফআইইউ সর্বদা তৎপর অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধ করতে।

শেয়ার বিজ: দুই মেয়াদে ডেপুটি গভর্নরের দায়িত্ব পালন শেষে এখন বিএফআইইউ’র প্রধান কর্মকতা। নতুন এই দায়িত্ব কেমন লাগছে?

রাজী হাসান: ডেপুটি গভর্নর থাকাকালে আমাকে অনেক কাজ করতে হতো। তখন বিএফআইইউ’র পেছনে খুব বেশি সময় দিতে পারতাম না। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিএফআইইউ এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানিলন্ডারিংয়ের কো-চেয়ার হিসেবে কাজ করবে। এই সময় অনেক কাজ করতে হবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার আমাকে এ পদে নিয়োগ দিয়েছে।

শেয়ার বিজ: রিজার্ভ চুরির অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে কোনো আপডেট আছে কি?

রাজী হাসান: এটা মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়। তবে এটা যেহেতু আন্তঃদেশীয় একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, সেহেতু বিএফআইইউ বিষয়টি দেখভাল করছে। ফিলিপাইনের ওই পক্ষেও তাদের দেশের একটি এফআইইউ কাজ করছে।

শেয়ার বিজ: বিএফআইইউ’র সাফল্যের দিকগুলো কী?

রাজী হাসান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক শেষেই আমি বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি পাই। তখনও আমার স্নাতকোত্তর শেষ হয়নি। এটা ১৯৮১ সালের কথা। এর পর আমি একে একে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব নির্বাহী পদে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। মাঝখানে বড় একটি সময় আমি অসুস্থ থাকলেও কখনও মনোবল ভেঙে পড়েনি। আমি নিজ হাতে দক্ষিণ আফ্রিকার সান সিটিতে গিয়ে এগমন্ট গ্রুপের বার্ষিক সাধারণ সভায় বিএফআইইউর সদস্যপদ প্রাপ্তির সনদ নিয়ে আসি। এছাড়া ২০১৫-১৬ সালের দিকে এপিজির মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন রিপোর্টে ধূসর তালিকায় পড়েছিল দেশ। ওই সময় বিএফআইইউ নিরলস পরিশ্রম করায় ধূসর তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এছাড়া অনেক দেশের এফআইইউ অন্য দেশের তথ্য নিয়ে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় এগমন্ট গ্রুপের সদস্য পদ হারাতে হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।