অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা

সাভারে বিকাশ নম্বর হ্যাক করে প্রতারণা

ইমতিয়াজ উল ইসলাম, সাভার: প্রযুক্তির উৎকর্ষে মোবাইল ফোনে তাৎক্ষণিক অর্থ লেনদেনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সর্বসাধারণের জনপ্রিয়তা পেলেও এ নিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য বিকাশ সেবা ব্যবহারকারী। যে কারও বিকাশ নম্বর হ্যাক করে প্রতারক চক্র নিমিষেই হাতিয়ে নিচ্ছে গ্রাহকদের অর্থ। পাশাপাশি মোবাইলে নিরাপত্তার জন্য সঞ্চিত অর্থের পুরোটাই হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বিকাশ ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। আর বিকাশ সহায়তা না করায় প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি পুলিশের। আইনের আশ্রয় নিয়েও উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না প্রতারণার মাধ্যমে হাতছাড়া হওয়া অর্থ।
রাজধানীর নিকটবর্তী সাভারের আশুলিয়া একটি অত্যন্ত জনবহুল এলাকা। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় দশ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস এ এলাকায়। আর এখানেই যেন ফাঁদ পেতে বসেছে প্রতারক চক্র। প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের বিকাশের ব্যক্তিগত হিসাবে সঞ্চিত অর্থ প্রযুক্তির মাধ্যমে হ্যাক করে হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। গত দুই বছরে এসব প্রতারণার অর্ধশতাধিক অভিযোগ হলেও মামলা না হওয়ায় থানা পুলিশের কাছে নেই এর সঠিক হিসাব।
উত্তর গাজীরচট এলাকার ব্যবসায়ী মজিবর রহমান বলেন, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে একটি অজ্ঞাত রবি নম্বর থেকে বিকাশ অফিসের পরিচয় দিয়ে একজন ফোন করে। বিকাশে কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী অজ্ঞাত ব্যক্তি আমার ব্যক্তিগত বিকাশ অ্যাকাউন্টে ভুলবশত তাদের সাড়ে আট হাজার টাকা ক্যাশইন হয়েছে বলে জানান। তারপর আমার বিকাশের রেমিট্যান্স অপশনে গিয়ে একটি রবি নম্বর টাইপ করতে বলে। এরপর তার কথামতো কোড ৮৯৮৯ টাইপ করলে ওই রবি নম্বরে উল্লিখিত পরিমাণ টাকা চলে যায়। পরে ওই নম্বরে অনেকবার ফোন করা হলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় তিনি আশুলিয়া থানায় একটি অভিযোগ করলেও টাকার হদিস মেলেনি।
তিনি আরও জানান, অভিযোগ করার পর পুলিশ সেই কপি বিকাশের রাজধানীর হেড অফিসে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এরপর বিকাশ কর্তৃপক্ষ তখন তার অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট দিলে সেটা তাদের এনে জমা দিতে হবে বলেও জানান তারা, যা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য অত্যন্ত হয়রানির বিষয় বলে অভিযোগ তার।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান শাসমুদ্দিন হায়দার ডালিম শেয়ার বিজকে বলেন, বিকাশের প্রতিটি অ্যাকাউন্ট বা ওয়ালেট হোল্ডার বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ারভুক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের দেখভাল করার দায়িত্বে। তাই অ্যাকাউন্ট খোলা কিংবা বন্ধ করা থেকে শুরু করে অভিযোগ দায়ের করা পর্যন্ত যাবতীয় কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা করে। সেজন্য বিকাশসংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন নিতে পারি না। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটে জানালে পরে তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন।
কেবল গ্রাহকই নন, এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন বিকাশের অনেক এজেন্টও। তেমনই একজন জামগড়া বটতলা এলাকার বিকাশ এজেন্ট ব্যবসায়ী কবির হোসেন। তিনি বলেন, প্রতারক অজ্ঞাত এক ব্যক্তি কৌশলে দশটি নম্বরে এক লাখ ৩৩ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করে নেয়। এ ব্যাপারে বিকাশ কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা আমাকে কেবল ক্যাশ আউটের তালিকা প্রদান করে থানায় জিডি করার পরামর্শ দেন। কিন্তু যেসব এজেন্ট নম্বরে ক্যাশ আউট হয়েছে সেগুলোর বিস্তারিত তথ্য তাকে বিকাশ কর্তৃপক্ষ জানায়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এসব ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক নাহিদ হাসান জানান, তিনি বিকাশে প্রতারণাসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি অভিযোগ এর আগে পেয়েছেন। এসব অভিযোগের তদন্ত করতে গেলে বিকাশ কর্তৃপক্ষ তাদের সরাসরি কোনো তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করে না। আদালতের মাধ্যমে তাদের আবেদন করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। তত দিনে চতুর প্রতারক চক্র গা-ঢাকা দিয়ে থাকে।
আর বিকাশ প্রতারণার তদন্তের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলোÑযেসব নম্বর থেকে প্রতারক চক্র ফোন করে কিংবা যেসব বিকাশ নম্বরে তারা টাকা ট্রান্সফার করে নেয় সেসব সিমও জাল।
এ বিষয়ে শাসমুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, বিকাশের কোনো কর্মকর্তাই ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের পিন নম্বর চাইবেন না। সেক্ষেত্রে প্রতারকদের নিজে থেকে পিন নম্বর জানার কোনো প্রশ্নই আসে না। কারণ বিকাশ বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তির ভিসা প্লাস সফটওয়্যার সিস্টেম ব্যবহার করে।
আর অজ্ঞাত সিমে বিকাশ অ্যাকাউন্ট কীভাবে সচল রয়েছে সে ব্যাপারে এ কর্মকর্তা বলেন, বিকাশের প্রথম দিকের অবস্থায় একজন ব্যক্তি পৃথক সিমে একাধিক বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলতে পারতেন। কিন্তু গত বছরের দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক একজন কেবল একটি অ্যাকাউন্ট করতে পারবেন।
আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাবেদ মাসুদ জানান, অধিকাংশ সময় বিকাশে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা মামলা জটিলতার কারণে শুধু অভিযোগ করেই ক্ষান্ত থাকেন। পরে তাদের আর এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখা যায় না। সেক্ষেত্রে মামলা নথিভুক্ত হলে এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি এ ধরণের প্রতারণা রোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা।
বিকাশে প্রতারণার ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কেএম আককাছ আলী বলেন, আমরা যতটুকু বুঝি তাতে দেখা যায়, বিকাশের এজেন্টের মাধ্যমেই অধিকাংশ প্রতারণা হয়ে থাকে। এজেন্টের আশেপাশে অনেক অচেনা লোকজন ঘোরাঘুরি করে। কেউ যখন টাকা পাঠায় তখন অপর পাশের সিন্ডেকেটের লোকজনকে অগেই জানিয়ে দেওয়া হয় কত টাকা কোন নম্বর থেকে দেওয়া হয়েছে। এখানে এসএমএসের মাধ্যমে একটি কোড নম্বরের সিস্টেম করতে পারে বিকাশ। তাহলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নম্বরে এসএমএস চলে যাবে। তাহলে অন্য কেউ টাকা তুলতে পারবে না।