অর্জন কঠিন নয়

কেবল উন্নয়নশীল নয়, যেকোনো দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে রফতানির বড় ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরাও পিছিয়ে নেই। প্রতিবছরই বাড়ছে আমাদের রফতানি। এ লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে রফতানি খাতে আরও ৯ পণ্যে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। সে হিসেবে এ খাতে নগদ সহায়তা পাওয়া পণ্যসংখ্যা দাঁড়াবে ৩৬টি।
বুধবার চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ সংক্রান্ত বৈঠকে নতুন অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪ বিলিয়ন বা চার হাজার ৪০০ কোটি ডলার। গতকাল ‘রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪৪ বিলিয়ন ডলার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে শেয়ার বিজ পাঠকরা আরও জেনেছেন, এবারের লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের চেয়ে ছয় দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪১ বিলিয়ন ডলার। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পণ্য খাতে ৩৯ বিলিয়ন এবং সেবা রফতানি খাতে পাঁচ বিলিয়ন ডলার। রফতানির বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখা গেলে ২০২১ সালে দেশের রফতানির পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
রফতানি খাতে টানা প্রবৃদ্ধির জন্য আমরাও আশাবাদী। গত অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে রফতানিতে সার্বিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ। গত বছর কেবল চামড়া খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এর কারণও আমাদের জানা। বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা হচ্ছে চীন। দেশটির চামড়াপণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র। এ দেশ দুটির মধ্যে শুল্কযুদ্ধ চলছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে চীনের চামড়াপণ্য রফতানি। ফলে বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার রফতানিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তবে নতুন সুযোগ কাজে লাগিয়ে, বাজার সম্প্রসারণ করে চামড়া খাতেও রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব।
আমাদের রফতানি পণ্যের সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। এ ধারা ধরে রাখতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবসায়িক জটিলতা নিরসন করতে হবে; স্থল ও সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রমে আধুনিকায়ন করতে হবে। রফতানির সুফল যাতে সব পক্ষ ভোগ করে, তাও নিশ্চিত করতে হবে। ভাবতে হবে এসব খাতে নিয়োজিত শ্রেমিকদের কথা। তাদের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মপরিবেশ, যৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রফতানিতে ব্র্যান্ড একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বসেরা ১০টি পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার ৭টিই এখন বাংলাদেশে। এমন স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে দুই শতাধিক। বিশ্বে পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয়, কিন্তু আমাদের নিজস্ব কোনো ব্র্যান্ড নেই। ফলে পোশাকের মূল্য নির্ধারণে আমাদের তেমন ভূমিকা থাকে না। এ সমস্যা দূর করা গেলে পোশাক খাতে রফতানি আয় অনেক বাড়ানো সম্ভব। একই পণ্যের বেশি দাম পেতে পারি আমরা।
উৎপাদনের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত জনশক্তি থাকলেও মিড লেভেল ম্যানেজমেন্টে মানবসম্পদের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আমরা রফতানি করি ৪০ বিলিয়ন ডলার। এর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় মিড লেভেল ম্যানেজমেন্টে। এ ক্ষেত্রে অন্য দেশের জনশক্তি ব্যবহার করতে হয়। আমাদের নীতি প্রণয়নে এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
কোনো কোনো দেশে রফতানির বড় অসুবিধা হলো, সেগুলোর ল্যাবে পণ্য পরীক্ষা করতে সময় লাগে তিন মাসের বেশি। কিন্তু ওই দেশগুলোর পণ্য কোনো পরীক্ষা ছাড়াই বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যেন বিএসটিআই সার্টিফিকেট গ্রহণ করে, সে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সুযোগের সমতা আদায়েও উদ্যোগী হতে হবে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, কর্মপরিবেশ ও মানসংক্রান্ত বিষয় প্রতিপালন, পণ্যের মান উন্নয়ন, পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ, রফতানিকারকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিলে এবং বিদেশের বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোকে অধিকতর বাণিজ্যবান্ধব করে তোলা গেলে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন নয় বলেই আমরা মনে করি।