প্রচ্ছদ শেষ পাতা

অর্থনীতি সমিতির সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট

নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য বৈদেশিক ঋণমুক্ত বিকল্প বাজেট ঘোষণা করেছে অর্থনীতিবিদদের পেশাদার সংগঠন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি (বিইএ)। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে নিয়মিত এ প্রস্তাবনা দিয়ে আসছে উন্নয়নশীল বিশ্বে সরকারের বাইরে বিকল্প বাজেট ঘোষণাকারী একমাত্র এ সংগঠনটি। আগামী ১৩ জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার কথা রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। তার আগে গতকাল রাজধানীর সিরডাপ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স হলে এ বিকল্প বাজেটের প্রস্তাব দেয় অর্থনীতি সমিতি। ঢাকাসহ দেশের ২৬টি জেলা শহরে একই দিনে একই সময় এটি অনুষ্ঠিত হয়।
‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০১৯-২০’ শিরোনামে এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির পক্ষে এ প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করেন সমিতির সভাপতি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। সমিতির প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৯০ কোটি টাকা যা অর্থমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রায় পাঁচ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বাজেটের কমপক্ষে দ্বিগুণ। প্রস্তাবিত রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ দুই হাজার ৫১০ কোটি টাকা । যার মধ্যে ৬৯ শতাংশ হবে প্রত্যক্ষ কর ও ৩১ শতাংশ হবে পরোক্ষ কর। অর্থাৎ মোট বাজেট বরাদ্দের প্রায় ৮১ শতাংশের জোগান দেবে সরকারের রাজস্ব আয়।
আবুল বারকাত বলেন, আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে ২০টি নতুন উৎস নির্দিষ্ট করেছি যা আগে ছিল না। এর মধ্যে অর্থ পাচার রোধ, কালোটাকা উদ্ধার ও সম্পদ কর এ তিনটি নতুন উৎস থেকেই সরকার মোট ৯৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারেন। আর এ টাকা দিয়ে প্রতি বছর তিনটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব। তিনি বলেন, সমিতির প্রস্তাবিত বাজেট অর্থায়নে কোনো বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হবে না, প্রস্তাব অনুযায়ী বাজেটের আয় কাঠামোতে মৌলিক গুণগত রূপান্তর ঘটবে। আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি দুই লাখ ৩৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, কেউ হয়তো বলবেন অনেক বড় ঘাটতি। এক্ষেত্রে বলতে চাই জাপানে বাজেট ঘাটতি ২৫৬ শতাংশ। ঘাটতি বাজেটে অসুবিধা হলে এক পয়সাও ঘাটতি না রেখে আমাদের প্রস্তাবিত রাজস্ব আয় দিয়েও মোট বাজেট প্রস্তুতি করতে পারেন।
কৃষি ফসলের উৎপাদন অঞ্চল গঠন ও কৃষককে কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য দেওয়ার প্রস্তাব করে বারকাত বলেন, এ বছর বোরো ধানে কৃষকের প্রকৃত লোকসান হবে এক মণে কমপক্ষে ৫০০ টাকা। এ নিয়ে সরকারের চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আমরা মনে করি কৃষককে তার উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য জরুরিভাবে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারিভাবে সংগ্রহের ক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের তুলনায় কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়াতে হবে, সেক্ষেত্রে এ বছরের বোরো ধানের মণপ্রতি বিক্রয়মূল্য হতে হবে কমপক্ষে ১২০০ টাকা।
দেশে প্রতি বছর ৩০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে কিন্তু তার মধ্যে ২০ লাখ মানুষেরই কর্মসংস্থান হয় না উল্লেখ করে ক্রমবর্ধমান মানব বঞ্চনা-বৈষম্য-অসমতা দূরীকরণ, শিক্ষা ব্যবস্থার মূলধারার অধিকহারে বৈষম্য রোধ, কর্মসংস্থান বাড়ানো ও বেকারত্ব কমাতে অন্যান্য অনেক কিছুর পাশাপাশি জাতীয় কর্মসংস্থান পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কোষ গঠন, যুবকদের উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক হতে উৎসাহিত করতে স্টার্ট আপ পুঁজি সরবরাহ এবং শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব দেন আবুল বারকাত।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে আবুল বারকাত প্রস্তাব করেন, অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের মোকাবিলার জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে তাদের পূর্ণোদ্যমে চালু শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ঠিক হবে না। সমস্যাটি জটিল তবে সমাধান সম্ভব বলে মনে করি। আগামী তিন বছরের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ লাখ ভ্যাট লাইসেন্সধারীকে ভ্যাটের আওতায় আনার প্রস্তাব করে বলা হয়, এনবিআর ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে বাংলাদেশের ভ্যাট লাইসেন্সধারীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে বড়জোর এক লাখ লাইসেন্সধারীর কাছ থেকে (মোট ভ্যাট লাইসেন্সধারীর ১০%) বর্তমানে ভ্যাট আদায় হয়।
আবুল বারকাত বলেন, সরকার সিগারেট থেকে প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা, বিড়ি থেকে এক হাজার কোটি টাকা এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য থেকে এক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ করতে পারেন। এক্ষেত্রে আসন্ন বাজেটে বিবেচনার জন্য আমাদের সুপারিশ হলো সিগারেটের কয়েক স্তরবিশিষ্ট মূল্যস্তর বাতিল করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের ওপর কমপক্ষে ৬০ টাকা আবগারি শুল্ক, প্রতি ২৫ শলাকার বিড়ির ওপর ১৫ টাকা আবগারি শুল্ক, আর প্রতি ১০০ গ্রাম ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ওপর ১৫০ টাকা আবগারি শুল্কারোপ করা হোক।
সমিতির আরও কয়েকটি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে-ব্যক্তিপর্যায়ে করহার কমিয়ে তিন শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ রাখা, ৫০ শতাংশ নিন্মতর কর দেওয়ার যোগ্য কমপক্ষে ৫০ লাখ টিআইএনধারী মানুষের সংখ্যা বাড়ানো, বছরে কমপক্ষে এক কোটি টাকা বা তার বেশি ব্যক্তিগত আয়কর দেওয়ার যোগ্য মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজারে বাড়ানো, ৩০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ কালোটাকা উদ্ধার, অর্থ পাচার রোধ থেকে আগামী অর্থবছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকা আদায় প্রভৃতি।

ট্যাগ »

সর্বশেষ..