মত-বিশ্লেষণ

অর্থনৈতিক বিকাশে নারী উদ্যোক্তা

জিনাত আরা আহমেদ: সাফল্য, গৌরব আর সমতার বিশ্ব গড়তে পুরুষের পাশাপাশি নারীও আজ অর্থনৈতিক স্বপ্ন পূরণে উদ্যোগীর ভূমিকায় রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য নারী ভাগ্যের পরিবর্তনে প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তুলেছে ছোট থেকে মাঝারি শিল্প এবং নানা ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এগুলো শুধু নারীকেই স্বাবলম্বী করেনি, বরং নিজস্ব পরিমণ্ডলে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনেক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তৃণমূল থেকে সবখানে যেসব নারী এমন উদ্যোগ নিয়ে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তাদের আজ আমরা উদ্যোক্তা হিসেবে চিনি।
একটা সময় ধারণা ছিল, নারীর প্রধান কাজ পরিবারের দেখাশোনা করা। ধীরে ধীরে সময় পরিবর্তিত হলে বাবা-মায়েরা ছেলের পাশাপাশি মেয়েকেও লেখাপড়া শিখিয়ে যোগ্য করে তুলেছেন। এখন বাবা-মায়েরা স্বপ্ন দেখেন মেয়ে চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং পুরোনো ধ্যান-ধারণা নিয়ে অলস সময় কাটাবে না। বর্তমানে শিক্ষার হার বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের হার বেড়েছে, সেইসঙ্গে বেড়েছে চাকরিক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা। অথচ শিক্ষিত নারীর জন্য সংসারে কোনো আর্থিক অবদান রাখতে না পারাটা বেশ মনোবেদনার কারণ। আবার চাকরিতে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যেমন সন্তান ছোট থাকা কিংবা মাতৃত্বজনিত কারণে সবার পক্ষে নিয়ম মেনে চাকরি করা সম্ভব হয় না। কখনও স্বামীর কর্মস্থল নির্দিষ্ট হলে এবং শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে মানিয়ে চলতে গিয়ে কর্মস্থল বিবেচনায় অনেক নারী চাকরি করতে অপারগ হন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিছু একটা করার মানসিকতায় অসংখ্য নারী আজ উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
নারীর উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভাবের পেছনে কিছু সামাজিক কারণও রয়েছে। অনেক সময় পারিবারিক নানা সংকটে অসহায় নারীকে সংসারের হাল ধরতে হয় এবং জীবিকার্জনে নারীকে হতে হয় উদ্যোগী। তখন বেঁচে থাকার সংগ্রামে এ রকম অসংখ্য নারী নিজেদের প্রচেষ্টায় গড়ে তোলে ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা কুটিরশিল্প। অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলায় এভাবে ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে সঙ্গী করে স্বল্প পুঁজিতে শিল্প কিংবা ব্যবসার মাধ্যমে নারীরা হয়ে ওঠে উদ্যোক্তা।
উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ক্ষমতায়নে নারীর নবদিগন্ত। যোগ্যতা দিয়ে নারী এই পরিচয়কে নিজের করে নিয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে পরিশ্রম আর মেধার সমন্বয়ে নারী গড়ে তুলছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কিংবা স্বাধীন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তাদের শৈল্পিক চেতনা ও নান্দনিক উপস্থাপনা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে করে তুলেছে আকর্ষণীয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া নারীও এখন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। গ্রামীণ নারী কাঁথা সেলাই, বিভিন্ন রকম পোশাক তৈরি, ঘর সাজানোর বিভিন্ন সামগ্রী প্রস্তুত, মুড়িভাজা, শীতলপাটি তৈরি, সংরক্ষণযোগ্য খাবার যেমন আচার, পাপড় ও পিঠা তৈরি, মোমবাতি, খেলনা, বেতের কাজ, পুঁতি, শোপিস ও ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করছে। সংসারে সচ্ছলতা আনতে নারীরা পুরুদের পাশাপাশি মুরগির খামার, গরু-ছাগল পালন ও মাছ চাষের মাধ্যমেও স্বাবলম্বী হচ্ছে।
শিল্প ও ব্যবসায়ে উদ্যোক্তা নারীর এ ধরনের নানামুখী সাফল্য অর্জন তাকে করে তোলে আত্মপ্রত্যয়ী, যা দেয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অর্থাৎ ক্ষমতায়ন। ক্ষমতায়নের জন্য নারীকে তার সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তা নারীকে কিছু সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। পরিবারের সঙ্গে পেশাগত ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে নারীকে প্রায়ই দ্বিগুণ কাজ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির বাইরে গিয়ে নারীর ব্যবসা পরিচালনা করার সুবিধা কম থাকে, ফলে তারা ব্যবসায়িক ক্রমোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। তবে আশার কথা যে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে ধীরে ধীরে কর্মক্ষেত্রে সমতা তৈরি হচ্ছে। এটা নারী উদ্যোক্তাদের একটি নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করছে। বর্তমানে ফেসবুকে ক্ষুদ্র ব্যবসার একটি বড় অংশের মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নারী।
স্বল্প পুঁজিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং নারীর ক্ষমতায়নে এরই মধ্যে সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। শিল্পায়নে নারী তথা ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের পণ্য বাজারজাতকরণে সহায়তা প্রদানের জন্য তাদের নানা ধরনের কার্যক্রম রয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশন জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মেলার আয়োজন করে থাকে। এর মাধ্যমে এসএমই পণ্যের ব্যাপক পরিচিতির পাশাপাশি উৎপাদক, ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ স্থাপিত হয়। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তা খুঁজে বের করে এসএমই ফাউন্ডেশন তাদের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারি নির্দেশনা দেওয়া আছে। এভাবে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনের সুবিধা নারী উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিকাশের নতুন দিক উšে§াচন করবে।
স্বীকৃতি আর লভ্যাংশ উদ্যোক্তার এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র। তাই অর্থনৈতিক বিকাশের এই নব উদ্যোগকে বেগবান করতে নারীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য ও উজ্জীবিত করা দরকার। সমাজ ও অর্থনীতিতে নারীর অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। নারীকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। যার যেটুকু সামর্থ্য আছে, তাকে তা কাজে লাগাতে হবে দেশের স্বার্থে। মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে প্রতিটি নারীর হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করাই হোক উদ্যোক্তা বিকাশে আমাদের অঙ্গীকার।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..