মত-বিশ্লেষণ

অর্থ পাচার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি

আবুল কাসেম হায়দার: বিশ্বব্যাপী অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ থেকে নিরাপদ দেশে অর্থ পাচার যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু যে বাংলাদেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বিদেশে অর্থ পাচার করছেন, তা নয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ প্রায় সব উন্নয়নগামী দেশ থেকে বিদেশে বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ পাচার হচ্ছে। নিজ দেশে নিজের সম্পদ নিরাপদ নয় বলে অর্থ পাচার দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দেশ থেকে অর্থ পাচার অর্থনীতিতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি এবং বেপরোয়া দুর্নীতি এ চার কারণে মূলত এই পাচারের ঘটনা ঘটছে। এটি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের আরও অভিমত, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থ পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেই। শুধু ঘোষণা নয়, পাচার ঠেকাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তারা।
প্রতি বছর দেশে যে হারে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, তার কয়েকগুণ বেশি অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে বিষয়টি বড় করে আসছে। সম্প্রতি সুইস ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সঞ্চয় পাঁচ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশে কমলেও বাংলাদেশিদের জমা বেড়েছে।
এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্টে বলা হয়েছে, এক বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার কোটি অর্থ পাচার হয়েছে। আর ১০ বছরে পাচার হয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজের তৈরি করা পানামা ও প্যারাডাইজ পেপারসেও অর্থ পাচারের তথ্য আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্র্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, অর্থ পাচার হচ্ছে বলেই সুইস ব্যাংকে জমা হচ্ছে। এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই। তিনি বলেন, কোনো একটি হিসাবে দেখা গেছে, দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ শতাংশই কালোটাকা। এ কালোটাকাই বিদেশে পাচার হয়।
তার মতে, পাচার রোধে সরকার কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে এর সঙ্গে জড়িতরা উৎসাহিত হয়। তিনি আরও বলেন, অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা বিদেশিদের জমাকৃত অর্থের তথ্য প্রকাশ করে সুইস ব্যাংক।
ওই রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে সুইস ব্যাংকে আনুপাতিক হারে যেসব দেশের সঞ্চয় বেড়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আলোচ্য সময়ে দেশটিতে সারা বিশ্বের আমানত কমেছে। এ সময় বিভিন্ন ব্যাংকে আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি ফ্রাঙ্ক।
আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে যা ছিল এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি ফ্রাঙ্ক। এ হিসাবে আমানত কমেছে আট হাজার কোটি ফ্রাঙ্ক। এছাড়া প্রথম অবস্থানে যুক্তরাজ্যের আমানত ৩৯ হাজার থেকে কমে ৩৬ হাজার ফ্রাঙ্কে নেমে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমানত ১৬ হাজার থেকে কমে ১৪ হাজার কোটি, চীন এক হাজার পাঁচ থেকে কমে এক হাজার ৩০০ কোটি ফ্রাঙ্কে নেমে এসেছে।
পাশের দেশ ভারতে আমানত সাত কোটি ফ্রাঙ্ক কমে ৯৩ কোটি, পাকিস্তান ৩৮ কোটি কমে ৭২ কোটি এবং নেপালে আট কোটি কমে ৩২ কোটি ফ্রাঙ্কে নেমে এসেছে। আরও যেসব দেশের আমানত কমেছে এর মধ্যে রয়েছেÑসিঙ্গাপুর, কানাডা, সৌদি আবর, কাতার, নরওয়ে, ওমান, মালয়েশিয়া, আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোর। এমনকি সম্মিলিতভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আমানত আগের বছরের চেয়ে ৫২৬ কোটি কমে ১৬ হাজার ৪৬০ কোটিতে নেমে এসেছে। কিন্তু সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২৯ শতাংশ বেড়েছে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ৪৩ কোটি ১৩ লাখ ফ্রাঙ্ক। ২০১৮ সালে তা বেড়ে ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঙ্কে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ বা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময় কাজ করছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যেসব আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন রয়েছে, আমরা তা পুরোপুরি মেনে চলছি।
তবে তিনি বলেন, সুইস ব্যাংকের আমানতের বিভিন্ন ক্যাটেগরি রয়েছে। ঢালাওভাবে পাচারের তথ্য যেভাবে বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। কারণ সুইস ব্যাংকের টাকার মধ্যে বিদেশে অবস্থান করা বাংলাদেশি নাগরিকদের আমানতের তথ্যও এর মধ্যে রয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে রাজি হাসান বলেন, কোনো বাংলাদেশিকে অর্থ রাখার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে কয়েকটি মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়। এর মধ্যে ঋণের টাকা সরাসরি ডলার নিয়ে যায় প্রভাবশালী মহল। এছাড়া আমদানির নামে এলসি খুলে বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। এছাড়া রয়েছে আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানি মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি। সম্প্রতি অর্থ পাচারের আরও একটি বড় মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে রেমিট্যান্স। বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স একটি চক্র সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়। আর এ দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে এর দায় শোধ করা হয়।
একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। ওইগুলোও পাচার হয়ে বিদেশের কোনো ব্যাংকে রাখা হচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতার কারণে নির্বাচনকালীন অর্থ পাচার বাড়ে। আর পাচার বন্ধের ব্যাপারে সরকারের কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত থাকলে পানামা পেপারস এবং প্যারাডাইজ পেপারসে যাদের নাম আছে, তাদের ধরে এনে শাস্তি দেওয়া হতো। তার মতে, সরকারের আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) অন্যান্য সংস্থা যতই বাহ্যিক তৎপরতার কথা বলুক, তাতে কোনো লাভ হবে না।
অন্যদিকে চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে; যা আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। একক বছর হিসেবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে চার প্রক্রিয়ায় ৫৯০ কোটি ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।
সূত্র বলছে, দুর্নীতি ও চোরাচালানের মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। ওইসব টাকায় দুর্নীতিবাজরা বিদেশে সম্পদ গড়ে তুলছেন, জমা রাখছেন বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। এর বাইরে আরও অনেক ব্যাংকে বাংলাদেশের পাচারকারীদের টাকা রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে মালয়েশিয়ার সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিদেশির জন্য মালয়েশিয়ান সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী। দেশ থেকে বিদেশে কোনো অর্থ পাঠাতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে। কিন্তু এ পর্যন্ত কাউকে ব্যাংক থেকে এই ধরনের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্নÑঅনুমোদন না দেওয়ার পরও মালয়েশিয়ায় কীভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হলো বাংলাদেশ। এছাড়া কানাডায় রয়েছে বাংলাদেশি অধ্যুষিত একটি অঞ্চল ‘বেগমপাড়া’। পাশাপাশি ব্রিটেন, হংকং, সিঙ্গাপুরেও বাংলাদেশিদের টাকা রয়েছে বলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সূত্র জানায়, দেশ-বিদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বন্ধ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে সহায়তায় তথ্যের আদান-প্রদান করতে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে ১৪৭টি দেশ গ্রুপের সদস্য। বাংলাদেশ এই গ্রুপের সদস্য হওয়ায় এখন সবগুলো দেশ থেকে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বা অর্থ পাচারবিষয়ক যে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।
অর্থ পাচার রোধে পদক্ষেপ
দেশের অর্থ বিদেশে পাচার রোধ করার জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অনেক পদক্ষেপ বেশ কার্যকরী রূপে দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে এই উদ্যোগ আরও তীব্র থেকে তীব্রতর করতে হবে।
এক. ‘বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব দেশে আছে’ বলে গবেষকরা মনে করেন, দেশের অর্থ সহজে বিদেশে পাচার হচ্ছে। বিনিয়োগের পরিবেশের অর্থ হচ্ছে, দেশে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগকারী নিরাপদে বিনিয়োগ করতে সাহস পাবে। নিজের অর্থ বিনিয়োগে নিরাপদ থাকবে এবং লভ্যাংশসহ ফেরত আসবে। বিনিয়োগের পরিবেশ বলতে আমরা বুঝি সব অবকাঠামোগত সুবিধা বিরাজমান থাকা। বিগত বছরগুলোতে সরকার দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ জ্বালানি শক্তিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ জোগান দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু শতভাগ অবকাঠামোগত উদ্যোগ এখনও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
ব্যাংকের সুদের হার এখনও ১৬ শতাংশের বেশি। ব্যাংক খাত আজ বড় রকমের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই বিনিয়োগকারীরা দেশে বিনিয়োগ নিরাপদ নয় বলে মনে করে। শেয়ারবাজার আজ অনিশ্চয়তার পথে চলেছে। হাজার হাজার মানুষ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। পুঁজিবাজার এখন আস্থাহীনতার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এই অবস্থার উন্নতি হওয়া খুবই জরুরি।
দুই. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে বিরাজমান। ২০০৪ সাল থেকে অদ্যাবধি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি আসেনি। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচন জনমনে আস্থার সৃষ্টি করতে পারেনি। নানা বিতর্কের শিকার হয়েছে আমাদের সব জাতীয় নির্বাচন। প্রতিটি নির্বাচনের পরবর্তী আশঙ্কার বিরাজ করার কারণে দেশের বিনিয়োগকারীরা নিজের অর্থ দেশ বিনিয়োগ করার সাহস হারিয়ে ফেলেছে। তাই ধনী ব্যক্তিরা নিজের অর্থের নিরাপত্তার জন্য অর্থ অন্য দেশে নিয়মিত পাচার করছে। যে কোনো সময় নিজের ও নিজের অর্থের বিপদ হতে পারে বলে অর্থ বিদেশে নিরাপদ দেশে নিয়মিত পাচার হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তাই জাতীয় নির্বাচনকে অবশ্যই সবার গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার মধ্যে করতে হবে। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন ছাড়া উপার্জিত অর্থ দেশে নিরাপদ নয়।
তিন. রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি অর্থ পাচার বেশ উৎসাহিত হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক, অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানিগুলো দেশের অর্থ নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকাশক্তি। বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার মতো অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারি ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। অর্থনৈতিক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক বিভাগ দ্বৈত ভূমিকা পালন করে আসছে। অন্যায়, অবিচার, অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ ও দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে নিতে অনেকটা ব্যর্থ হয়েছে। খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি রিজার্ভ থেকে অর্থ লুটের বিচার ও অর্থ উদ্ধার এখনও করতে পারেনি।
চার. বাজেটে নতুন উৎসাহ: বর্তমান বাজেটে (২০১৯-২০) সরকার ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে অবৈধ অর্থকে বৈধ করার সুযোগ রেখেছেন। বিশেষ করে অ্যাপার্টমেন্ট কেনা ও শিল্পে বিনিয়োগ ক্ষেত্রে এই সুযোগ থাকছে। এটি কি একটি ভালো উদ্যোগ। এই ক্ষেত্রে আরও খাত বৃদ্ধি করা দরকার। যেমন শেয়ারবাজার, রফতানিমুখী শিল্পে, জনকল্যাণমূলক কাজে। সেবা খাতে বিনিয়োগ প্রভৃতি খাতে ‘কালো’ টাকাকে বিনিয়োগে কর মুক্ত করে দিলে অর্থনীতিতে বেশ গতি আসবে। এটি অর্থনীতির গতিশীলতা আনতে এবং ব্যাংক খাতের স্থবিরতা দূর করবে বলেই বিশ্বাস। সরকারের এই উদ্যোগ বিদেশে অর্থ পাচার রোধে বড় ভূমিকা রাখবে আশা করা যায়।
পাঁচ. বেপরোয়া দুর্নীতি সমাজের উচ্চ স্তর থেকে শুরু করে নি¤œ স্তর পর্যন্ত ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। সরকার দুর্নীতিকে নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছে। দুর্নীতি ‘জিরো’ টলারেন্সে রাখার ঘোষণা দিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন কাজ করছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নানাভাবে মামলা হচ্ছে। বিচার চলেছে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার। দুর্নীতিবাজদের তিনি কখনও ক্ষমা করেননি। কিন্তু দুর্নীতি তাতেও থামছে না। সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার বাংলাদেশিদের সংখ্যাও পরিমাণ বৃদ্ধি বেশ আলোচনার বিষয়। রাজনৈতিকভাবে বিষয়টির উড়িয়ে না দিয়ে গভীরভাবে তদন্ত করে অর্থ পাচার রোধে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কেন অর্থ পাচার হয়, তার কারণ বের করে তা সমাধানের চেষ্টা করা হোক মূল কাজ।

সাবেক সহসভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ বিজিএমইএ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি
ও ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট

সর্বশেষ..