অসময়ে অতিমূল্যায়িত ব্যাংক খাতের শেয়ার!

 

নিজস্ব প্রতিবেদক: জুনে হিসাববছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোয় স্বাভাবিক নিয়মে বছরের এ সময়ে বিনিয়োগের হিড়িক পড়ে। কিন্তু এবার ডিসেম্বরে হিসাববছর শেষ হওয়া ব্যাংক-বিমা ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ছে। এতে অসময়ে অতিমূল্যায়িত হচ্ছে ব্যাংক খাতের শেয়ার। বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক খাত থেকে কিছুটা মুনাফা করেছে। তবে মৌসুমি শেয়ারে আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক খাতের কিছু বিনিয়োগকারী ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি থাকে জুন ক্লোজিং কোম্পানির শেয়ারে। কারণ এ সময় কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম দেখা গেছে। ডিসেম্বরে ব্যাংকের হিসাববছর শেষ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ দিয়েছে। তবু এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ বাড়ছে।

বাজারের এ প্রবণতার বিষয়ে জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন,  ‘কী কারণে ব্যাংকের শেয়ারদর বাড়ছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সবার মধ্যে একধরনের সংশয় রয়েছে। গত তিন বছর ব্যাংকের শেয়ারদর এভাবে বাড়তে দেখা যায়নি। তবে জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলোর ভালো ডিক্লারেশন এলে বোঝা যাবে বাজার কোন দিকে যাচ্ছে।’ একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের বুঝেশুনে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

গতকাল রোববারের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট লেনদেনের মধ্যে ব্যাংক খাত শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। লেনদেনে এ খাতের অংশগ্রহণ ছিল ৩৬ শতাংশ। টাকার অঙ্কে ব্যাংক খাতের শেয়ারে লেনদেন হয়েছে ৩৭৯ কোটি টাকা। এরপরের অবস্থানেই রয়েছে জুন ক্লোজিং বস্ত্র খাত। লেনদেনে এ খাতের অংশগ্রহণ ছিল ১৫ শতাংশ। খাতটির লেনদেন দাঁড়িয়েছে ১৫৬ কোটি টাকা। আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান। লেনদেনে এ খাতের অংশগ্রহণ ১১ শতাংশ। অর্থাৎ খাতটির লেনদেন দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি টাকা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনে শীর্ষ বিশ কোম্পানির তালিকায় অধিকাংশই ছিল ব্যাংক। তাছাড়া তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ২৮টির দরই বেড়েছে। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার আগের দিনের চেয়ে ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ বা এক টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে লেনদেন শীর্ষ তালিকায় উঠে এসেছে। কোম্পানিটির মোট ৪৬ কোটি ২৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। কোম্পানিটির শেয়ার সর্বোচ্চ ১৮ টাকায় বেচাকেনা হয়েছে। তবে কোম্পানির শেয়ার সর্বশেষ ১৭ টাকা ৯০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে। আগের দিন কোম্পানির শেয়ার সর্বশেষ ১৬ টাকা ৪০ পয়সায় বেচাকেনা হয়েছে। গত এক মাসের অধিকাংশ সময় কোম্পানিটির শেয়ারদর বাড়ছে।

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার আগের দিনের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বা দুই টাকা ১০ পয়সা বেড়ে লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ৪৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এছাড়া সিটি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকের শেয়ারদর বেড়ে লেনদেনের শীর্ষ ২০ কোম্পানির তালিকায় উঠে এসেছে।

ঈদের পর বাজারে লেনদেনে শুরুর প্রথম দিনের লেনদেন চিত্রে দেখা গেছে, মোট লেনদেনের ২২ শতাংশ ছিল ব্যাংক খাতের দখলে। ওই দিন ব্যাংক খাতের লেনদেন ছিল ১৪২ কোটি টাকা। পরের অবস্থানেই ছিল নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। লেনদেনে এ খাতের অংশগ্রহণ ছিল ১৯ শতাংশ অর্থাৎ ১২১ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। আর তৃতীয় অবস্থানে ছিল বস্ত্র খাত। লেনদেনে এ খাতের অংশগ্রহণ ছিল ১৩ শতাংশ, এর লেনদেন হয়েছিল ৮১ কোটি টাকা। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে জুন ক্লোজিং বস্ত্র খাত দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। শুধু বস্ত্র খাতই নয়, জুন ক্লোজিং বিভিন্ন খাতের কোম্পানিগুলোর দর দিন দিন বাড়ছে। আর এসব খাতে কৌশলী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন ব্যাংকের শেয়ার অবহেলিত ছিল। এসব শেয়ার ফেসভ্যালুর আশপাশে লেনদেন হয়েছিল। তবে গত ডিসেম্বরের পর থেকে ব্যাংকের শেয়ারদর বাড়ছে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাই ব্যাংকে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। আর এ কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীও ব্যাংকের শেয়ারে ঝুঁকছে। এতে অনেকে মুনাফা করতে পারলেও অতিমূল্যায়িত হচ্ছে ব্যাংকের শেয়ার। তবে অনেকেই সময় বুঝে জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। তবে যখন এসব কোম্পানির দর বেড়ে যাবে তখন সব ধরনের বিনিয়োগকারীরা হুমড়ি খেয়ে পড়বে। এতে কেউ অতিমুনাফা করবে আবার কেউ কম। তাই বিনিয়োগের আগে বুঝেশুনে বিনিয়োগের পরামর্শ দেন তারা।

এদিকে জুনে হিসাববছর শেষ হওয়া প্রায় ২০০ কোম্পানি এখন লভ্যাংশ দেওয়া শুরু করেছে। এতে কেউ কেউ ব্যাংকের পাশাপাশি মৌসুমি শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এগুলো বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।