মত-বিশ্লেষণ

অসম অর্থনীতির চীন-রাশিয়া জোট দীর্ঘজীবী হচ্ছে

দিমিত্রি ফ্রলভস্কি: রাশিয়ার অর্থনীতি খুব সাধারণভাবেই তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে গাঁটবদ্ধ। এর প্রধান আকর্ষণ এখন পূর্বের সঙ্গে। আশা করা যায় এটা একাট্টা হয়েই থাকবে, বা থাকতে চাইবে। কিন্তু চীন যেহেতু এরই মধ্যে রাশিয়ার প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হয়ে গেছে, তাই এই সম্পর্কটিই পশ্চিমের সঙ্গে চীনের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবকে মিটমাট করতে সহায়ক হবে। ক্রেমলিনও তাই সুযোগে একটি দান মারতে গভীর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা খুব জোরালো দাবি জানানোর চেষ্টা করছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ চলাকালে নিশ্চয় তারাই হবে বেইজিংয়ের অপরিহার্য গন্তব্য।
গত বছর রাশিয়ার অর্থনীতি ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়া ছুঁতে পেরেছে। তা সত্ত্বেও কার্যকর কাঠামোগত সংস্কারের চাহিদা বেড়েছে, কমেনি; এমনকি দেশটির গৃহস্থালি আয়ের মন্দা দশা জোরালো হয়েছে। তাদের অর্থনীতির কাঠামোটি এখনও হাইড্রোকার্বন রফতানির ওপর নির্ভর করছে। এটা এখন একটি দু-ধারী তরবারির রূপ ধারণ করেছে।
রাশিয়া থমকে গেছে রংচঙা বিভিন্ন কায়দার ফটকাবাজির বাজার মনিহারিতে। তবে একই সঙ্গে তাদের বাহ্যিকভাবে দাগা খাওয়ার ঝুঁকি কমে এসেছে। চীন এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিম ছাড়াও বাণিজ্যের যে আরও অনেক বিকল্প স্থান বা পাত্র থাকতে পারে, তা নতুন করে বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগ হয়েছে। এটা রাশিয়ার জন্য একটি বাড়তি সুবিধা।
এই দুই জাতি এখন যৌক্তিকভাবে অনেক বেশি যূথবদ্ধ। এই একাট্টা দশাকে নিশ্চয় গত শতাব্দীর ষাটের দশকের সিনো-সোভিয়েত ভাঙনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে চলবে না। এখন তারা ঐক্যবদ্ধ। চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের চেয়ে মস্কো সফর বেশি করেছেন। গত জুনে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট  ভ্লাদিমির পুতিনকে অ্যাওয়ার্ড দিলেন। চীনের ইতিহাসের এটিই সর্বপ্রথম কোনো বন্ধুত্ব-বন্ধনের সম্মানজনক মেডেল। এই মেডেলে তাকে ‘মাই বেস্ট, মোস্ট ইন্টিমেট ফ্রেন্ড’ (আমার সেরা, সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু) বলে ভূষিত করা হয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখানে জেগে উঠেছে। চীনের সঙ্গে রাশিয়ার ২০১৬ সালের ৬৯ দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য থেকে শুরু করে গত বছরের ১০৭ দশমিক এক বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য দৃষ্টান্ত এখানে বেশ চাউর হতে পারে। এই বাণিজ্য পরিসংখ্যানই বলে দেয় চীনই হলো তাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার আমদানি ও রফতানি উভয় খাতে। চীনে অপরিশোধিত তেল সরবরাহেও রাশিয়া সর্বপ্রথম স্থানে উঠে এসেছে। তারা সাইবেরিয়ার পাইপলাইনের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে বার্ষিক হিসাবে ৩৮ ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা করছে। এটি আসলে ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি। রাশিয়ার সবচেয়ে বড় পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি সাইবুরের কথায় আসা যাক। তারা তাদের পলিমার পণ্যের সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধির বাজার হিসেবে চীনকেই নিশানা করেছে। কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় উৎপাদন ছাউনি হলো পশ্চিম সাইবেরিয়া। এখানকার পেট্রোকেমিক্যাল প্লান্টটি ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। প্লান্টটি পৃথিবীর পঞ্চম সর্বোচ্চ পেট্রোকেমিক্যাল উত্তোলকে উপনীত হতে চলেছে শিগগিরই। এ সময়ে অন্যান্য বৃহদায়তন গ্যাস কেমিক্যাল ছাউনিও দূর প্রাচ্য চীনের বোর্ডের কাছে দৃষ্টিগোচর হতে চলেছে।
এসব কারণেই রাশিয়ার আর্থিক ও অর্থনৈতিক স্থিরতার প্রয়োজনে চীনের গুরুত্বকে খাটো করে দেখার সুযোগ থাকে না। এমনকি ক্রিমিয়া-পরবর্তী জুুতসই বাণিজ্য অংশীদারিত্বে এটাই যথার্থ দৃষ্টান্ত। তবুও এই অংশীদারত্বকে গভীরভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা যায়।
এ ঐক্য জোরদার বলেই মনে হচ্ছে এবং নিয়ত বেড়েই চলেছে। তবুও রফতানিতে এবং চীনের আমদানি তালিকায় রাশিয়া ১০ম স্থান অধিকার করতে পারছে না; কেননা রাশিয়ার তিন ভাগের এক ভাগ রফতানি হলো কাঁচামাল, যেক্ষেত্রে চীন বিক্রি করে ইলেকট্রনিক্স ও বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্য। বিষয়টি ক্রেমলিনের কাছে বেশ শক্তভাবেই উদ্বিগ্নতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া যে কাঁচামাল রফতানি করে, তার গুরুত্ব কমে যাওয়ায় বেইজিংয়ের কাছে রাশিয়ার গুরুত্ব অন্যান্য ব্যবসা অংশীদারের তুলনায় কমে গেছে।
এসব উপাত্ত পরিস্থিতির সমর্থনে আরও জোরালো হয়ে ওঠে। চীন ইদানীং বিশ্বের এফডিআই বা বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ খাতের তৃতীয় বৃহত্তর উৎসে উপনীত হয়েছে। তারা ২০১৭ সালে ১২৪ দশমিক ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে। সেন্ট্রাল ব্যাংক অব রাশিয়া দেখিয়েছে, বেইজিংয়ের এফডিআই রাশিয়ার অর্থনীতিতে ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এমন নিকট রাজনৈতিক বন্ধন থাকার পরেও চীন প্রাথমিকভাবে রাশিয়ার অর্থনীতি এবং খনিজ ও শক্তি খাতের বিনিয়োগ নিয়ে চরম মাত্রায় সতর্ক অবস্থানে থাকে।
এটা সত্য, সাইবেরিয়া পাইপলাইন প্রতি বছরে ৩৮ বিলিয়ন ঘনমিটার সরবরাহ করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এদিকে চীন এরই মধ্যে ৯০ বিলিয়ন ঘনমিটার আমদানি করছে প্রতি বছরে। চীনের এই বিশাল পরিমাণের তরলিত প্রাকৃতিক গ্যাস আসছে অস্ট্রেলিয়া থেকে, বিভিন্ন এশিয়ান দেশ ও কাতার থেকে। ফলে চীনে শক্তি রফতানিতে রাশিয়ার একচেটিয়া ব্যবসায় উদ্দেশ্য চিন্তামুক্ত থাকবে না; কিন্তু বিস্তৃত ও বিচিত্র প্রচেষ্টায় তারা সব সময়ই একতাবদ্ধ থাকবে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এই অসমতা মস্কোর বিভিন্ন মতের কাছে বেশ অন্যায্য বলে মনে হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য দ্বন্দ্বের বিস্তারে রাশিয়ার এসব প্রশ্নের পর্দা উঠবে। তাই যুক্তরাষ্ট-চীন দ্বন্দ্ব যত বাড়বে রাশিয়ার জন্য ততই আশীর্বাদ বয়ে আসবে। রাশিয়া তখন আরও জোর দিয়ে দাবি করতে পারবে যে তারা চীনের জন্য অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য, এমনকি বিকল্পহীন অপরিহার্য একটি অংশীদার।
যদিও দ্রুত বিস্তারণ ও বিশ্ব বাণিজ্যে আরও বেশি জড়িয়ে পড়ার ফলে চীন শক্তিশালী লভ্যাংশ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও তারা ভূরাজনৈতিক হুমকির ক্ষেত্রে খাদের কিনারে আরও বেশি এগিয়ে গেছে।
নিশ্চয় এটি একটি বৈশ্বিক অস্থিরতা। এই অস্থিরতার পেছনের কারণ হলো বাণিজ্যযুদ্ধ ত্বরান্বিত হতে থাকা এবং নতুন শুল্কতালিকা আরোপিত হওয়া, কিংবা সমুদ্রে চীনা সেনাদের উপস্থিতি বেড়ে চলার কারণে সৃষ্ট উদ্বিগ্নতা। ফলে একটি মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি হানা দিতে পারে। বাণিজ্যযুদ্ধ কঠিন আঘাত হানতে পারে কৃষি ও পেট্রোকেমিক্যালের মতো স্পর্শকাতর বিভিন্ন ইস্যুতে। আর যদি তা-ই হতে থাকে, তবে রাশিয়া একটি প্রাকৃতিক বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কেননা যদি কখনও বেইজিং বাণিজ্য ও শক্তিকৌশলের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের কঠিন বাধার সম্মুখীন হয়, তখন তারা রাশিয়ার মতো একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীকে কাছে পাবে।
উদাহরণ, গাল্ফ অব এডেন ও স্ট্রেইট অব মালাক্কার কথায় আসা যায়। এ দুটি অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ চীনের নিরাপত্তার জন্য খুবই সংকটপূর্ণ। পথ দুটি চরম পর্যায়ের দুর্বল কৌশলগত চেক পয়েন্ট বলে মনে হচ্ছে। বিপরীতে রাশিয়ান রফতানি চীনে পৌঁছানোর জন্য কোনো সমুদ্রপথের প্রয়োজন হয় না। তাই যদি কখনও চীনের জন্য চরম দুর্দিন নেমে আসে, তখন রাশিয়ান রফতানি চীনের জন্য অন্ধের ষষ্টি বা বিপদের বন্ধু হয়ে দাঁড়াবে। তাই রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায় সম্পর্ক কিংবা রাশিয়ান পণ্যকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের রাশিয়ান রীতি-আচার বেইজিংয়ের কাছে খুবই পরিচিত। তাই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ দুটি দেশের ব্যবসা ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ বেশ সহজ ও বেশি নির্ভরযোগ্য। এক্ষেত্রে গ্যাজপ্রম বা বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সিবুরের নাম এখানে উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের ১০ শতাংশ মালিকানায় রয়েছে চীনের সিনোপেক এবং আরও ১০ শতাংশ মালিকানায় রয়েছে সিল্ক রোড ফান্ড।
বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্কতালিকা বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যের কাছে এক অভিনব বাস্তবতা। তাই যদি কখনও কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখন মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যকার যেসব অসামঞ্জস্য বর্তমানে চোখে পড়ছে, তা পারস্পরিক নির্ভরশীলতার কারণেই দূর হয়ে যাওয়ার ব্যাপক সুযোগ রয়ে গেছে।
এভাবেই দিনে দিনে চীন রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। নির্ভরশীলতার মাত্রা দিন যত যাচ্ছে, ততই বেড়ে চলেছে। রাজনৈতিক বন্ধনও তাই আরও গভীর থেকে গভীরে আরও জোরালো হচ্ছে। তবে সিনো-সোভিয়েত ভাঙনের মাত্রায় গভীর অস্থিরতাগুলো দিনে দিনে খাটো হওয়ার সুযোগ বাড়ছে। তাই মস্কো খুব যৌক্তিকভাবেই চীনের কাছে বেশ আশাবাদী হয়ে উঠছে। চীনের কাছে মস্কোর নির্ভরযোগ্যতা ও ভৌগোলিক নৈকট্যই হবে মস্কোর ভবিষ্যতের জন্য বড় সম্পদ। এমনকি দেশ দুটির মধ্যে একটি গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনীভূত করবে।

রাজনীতি বিশ্লেষক ও স্বাধীন সাংবাদিক; নীতি ও কৌশলগত পরামর্শক, রাশিয়া
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে

ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..