এসএমই

অস্ট্রেলিয়ায়ও মামুনের মধু

 

যে কোনো উদ্যোগের শুরুতে আসে অনেক বাধা-বিপত্তি। এসব গায়ে না মেখে লেগে থাকলে সফল হওয়া যায়। যারা সফল হন, তাদের অনুসরণ করলে আরও নতুন উদ্যোগ শুরু হয়। নানা খাতের সেসব সফল উদ্যোক্তাকে নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজন

অনেকটা শখের বশে বছর বিশেক আগে মৌ চাষ শুরু করেছিলেন। কারিগরি প্রশিক্ষণ ছিল না, তবে বইপত্র ঘেঁটে মৌ চাষ ও খাঁটি মধু সংগ্রহের কলাকৌশল জেনেছিলেন তিনি। এরপর জমানো দুই হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে কাঠের তৈরি চারটি মৌ-বাক্স কিনে আনেন এবং পুরোদমে আত্মনিয়োগ করেন মৌচাষে। নিরলস পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের ফলে আজ তিনি স্বাবলম্বী। বর্তমানে বছরে মধু সংগ্রহ ও বিক্রি করে প্রায় লাখ তিনেক টাকা আয় করেন। মৌ চাষ ও মধু সংগ্রহ করে সংসারের অভাব দূরকারী এই ব্যক্তি হলেন মামুনুর রশিদ মামুন।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের গেটপাড়া গ্রামে মামুনের বাড়ি। তার মতে, মৌমাছি পালনে একদিকে পরিবারে সচ্ছলতা আসে, অন্যদিকে মৌমাছির বিচরণে পরাগায়নের ফলে ফসলের উৎপাদনও বাড়ে। মামুন কেবল মৌ চাষ করেন না, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মধু সংগ্রহও করেন। এরপর প্রক্রিয়াজাত করে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান। শুধু দেশেই নয়, তার মধু অস্ট্রেলিয়ায়ও যায়। সরেজমিনে কুষ্টিয়ার

মিরপুর উপজেলার ধুবইলে গিয়ে দেখা যায়, সরিষা ক্ষেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে

মৌ-বাক্স। মৌমাছি সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে এসব বাক্সে জমা করছে। সব বাক্সের উপরিভাগ কালো পলিথিন দিয়ে মোড়ানো। কালো পলিথিনের মোড়ক খুলে মৌ-বাক্স থেকে কাঠের ফ্রেমে ধরে থাকা মৌচাক বের করা হচ্ছে। এরপর মধু আহরণ যন্ত্র দিয়ে চাক থেকে মধু বের করে নেওয়া হচ্ছে।

খামারের কর্মচারীরা জানান, সাত থেকে আট দিন পরপর মধু সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি মৌ-বাক্সে আছে একটি করে ‘এপিস মেলি ফেরা’ জাতের রানি মৌমাছি। রানির আকর্ষণে ২৫০ থেকে ৩০০টি পুরুষ মৌমাছি মুখে মধু নিয়ে বাক্সে প্রবেশ করে মধু জমা রেখে চলে যায়। রানিদের শরীরের ঘ্রাণ আলাদা রকমের। এক বাক্সের মৌমাছিরা কখনও অন্য বাক্সে যায় না। ভুল করে গেলেও ওই বাক্সের মৌমাছিরা তাকে মেরে ফেলে। আর রানিদের ঘ্রাণ যাতে বাইরে না ছড়ায় সে কারণে সব বাক্স মোটা কালো পলিথিন দিয়ে মোড়ানো হয়। রানি প্রতিদিন একটি করে পুরুষ মৌমাছির সঙ্গে মিলন ঘটায়। মিলনের পর পুরুষ মৌমাছিটি মারা যায়।

খামারের কর্মচারীরা আরও জানান, দুই ধরনের মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করা যায়। একটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বন্য মধু, অপরটি দেশীয় জাতের মৌ চাষ। সাধারণত বন্য মৌমাছিরা গাছের ডাল ও বনজঙ্গলের চাকে মধু ছাড়ে। অন্যদিকে দেশীয় মৌ চাষ হয় কাঠের তৈরি বাক্সের মধ্যে। মামুন দ্বিতীয় পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহ করেন। তার খামারে বর্তমানে দুই শতাধিক মৌ-বাক্স রয়েছে। প্রতিটি বাক্সের মূল্য সাত থেকে আট হাজার টাকা। এই খামার থেকে বছরে প্রায় ১০ টন মধু উৎপাদন করা হয়। মামুন জানান, ১৯৯৭ সালে মাত্র চারটি মৌ-বাক্স কিনে সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ শুরু করেন তিনি। এরপর ১৯৯৮ সালে মাস্টার্স পাস করেন, কিন্তু চাকরির চেষ্টা না করে মৌচাষে মনোনিবেশ করেন। বর্তমানে তার খামারে আট কর্মচারী রয়েছেন, যারা সারা বছরই মধু সংগ্রহ করেন। মামুন আরও জানান, ২০১৫-১৬ সালে ৯ টন ও ২০১৬-১৭ সালে ১০ টন মধু সংগ্রহ করেছেন তিনি। এ বছরও একই পরিমাণ মধু পাওয়ার আশা করছেন। তিনি জানান, বিত্তিপাড়া ও ধুবইল ছাড়া নাটোরের গুরুদাসপুর ও চলনবিল, শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে মধু সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে সরিষা ফুলের মধু ছাড়া লিচু ফুলের মধু ও কালজিরা ফুলের মধু সংগ্রহ করেন।

মামুন বলেন, গত বছর ৩০০ টাকা কেজি দরে মধু বিক্রি করেছি। খামার থেকে প্রতি মাসে ১০০ কেজি করে মধু অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয়। গাছি সংগ্রহকারীরা মৌচাকে চাপ দিয়ে মধু সংগ্রহ করেন। এতে মধুর গুণাগুণ ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। আমার খামারে যন্ত্রের সাহায্যে বাতাস দিয়ে মধু সংগ্রহ করা হয়। এতে মধুর গুণ অক্ষুণœ থাকে। সরকারিভাবে মধু বিক্রির ব্যবস্থা করা হলে খামারিরা লাভবান হবেন বলে জানিয়ে তিনি বলেন, অল্প সুদে ঋণ এবং সরকারিভাবে মৌমাছি রাখার বাক্স দেওয়া হলে উপকৃত হবো।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, মামুন মৌ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার সাফল্য দেখে আরও অনেকে বাণিজ্যিকভাবে মৌচাষে আগ্রহী হচ্ছেন। আমাদের একটি প্রকল্প আছে। এটি হলো চাষি পর্যায়ে ডাল, তেল ও বীজ উৎপাদন, বিতরণ ও সংরক্ষণ প্রকল্প। এই প্রকল্প থেকে আমরা মৌচাষিদের মৌচাষের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। এছাড়া খামার বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবহন খরচ দিই। উৎপাদিত এসব মধু আমরা কৃষি বিভাগ থেকে স্থানীয়ভাবে বিক্রির ব্যবস্থা করেছি। মৌচাষিদের বাক্স দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাদের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মৌ-বাক্সও দেওয়া হবে।

 

কুদরতে খোদা সবুজ, কুষ্টিয়া

 

 

 

 

 

 

সর্বশেষ..