হোম মতামত-বিশ্লেষণ অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজ ২০১৭ থেকে কী পাওয়া গেল?

অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজ ২০১৭ থেকে কী পাওয়া গেল?


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

একুশ তাপাদার: ক্রিকেট খেলাটার সূচি এখন ঠিক করে টাকাকড়ির হিস্যা। কোন দল কার সঙ্গে খেলবে আইসিসি বলে-কয়েও সব সময় বাধ্য করাতে পারে না। টিভি রাইটস আর স্পনসরওয়ালা কী বলে, শুনতে হয় ওদের কথাই। তাই বাংলাদেশের সঙ্গে আরেকটি সিরিজ খেলতে প্রায় এক যুগ লাগল অস্ট্রেলিয়ার। গত দুবছর থেকেই সিরিজটি নিয়ে কত টানাপড়েন। নিরাপত্তা ইস্যু, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সঙ্গে বোর্ডের বিরোধ। শঙ্কার সব মেঘ সরিয়ে খেলা হয়েছে নির্বিঘেœ। তাতে ঢাকায় অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে উড়েছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে গিয়ে নিজেদের অহমিকা ফিরে পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া। মাঠের খেলায় সমানে সমানে টক্কর। তবে বাংলাদেশের প্রাপ্তি আছে আরও। দেখানো গেছে বুক চিতিয়ে লড়তে পারার তাকত। কুলীনদের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা হলে বাণিজ্যে ভাটা পড়বে না। দেওয়া গেছে সে বার্তাও।

বলা হয়, টেস্ট ক্রিকেটটা সবচেয়ে হƒদয় দিয়ে খেলে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। টেস্ট খেলার অভ্যাস যাদের ১৪০ বছরের। পরপর দুবছর এ দুদলকেই টেস্টে হারাতে পারল বাংলাদেশ। খেলার মাঠে মুশফিকদের উন্নতিটা স্পষ্ট। এই গ্রাফ নিয়ে আইসিসির টেবিলে অবস্থান শক্ত করার দায়িত্ব কর্তাদের।

২০০৬ সালেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিতে পারত বাংলাদেশ। তখনকার অস্ট্রেলিয়া ছিল প্রবল পরাক্রমশালী। সে দলে খেলতেন শেন ওয়ার্ন, রিকি পন্টিংদের মতো মহাতারকারা। ফতুল্লার মাঠে সেবার অনভিজ্ঞতায় ধরাশায়ী হয় বাংলাদেশ। পুড়তে হয় ৩ উইকেটে হারের আক্ষেপে। এবারের বাংলাদেশ অনেক অভিজ্ঞ। জানতেন স্টিভেন স্মিথরা। অস্ট্রেলিয়ার দলটাও সেই আগের রমরমা সময়ে নেই। সিরিজ শুরুর আগেই তাই জোর গলায় নিজেদের ফেভারিট বলতে পেরেছেন সাকিব আল হাসানরা। সে কথা শুনেও গলা চড়ানোর সাহস পাননি স্মিথ।

প্রথম টেস্টে মিরপুরে নেমেই অজিরা টের পেয়েছে সাকিবের আওয়াজ খালি মুখেই নয়। টার্নিং পিচ ছিল, ছিল আচমকা বাউন্স। তবে তা তো দুদলের জন্যই সমান। শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশের জন্য ভয়-জাগানিয়া। ১০ রানেই নেই ৩ উইকেট। একটা সময় হলে কাঁপন ধরে যেত, ভয়ে কুঁকড়ে ডুবে যেত বাংলাদেশ। সেদিন আর নেই। আঘাতের বদলে পাল্টা আঘাত দেওয়া শেখা গেছে। দুই বন্ধু সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল সাহসী বাংলাদেশের বড় দুই প্রতিনিধি। নিজেদের পঞ্চাশতম টেস্টে নেমেছিলেন। খেল দেখিয়েছেন তারাই। নাজেহাল অবস্থা থেকে চালিয়েছেন ব্যাট, দেখিয়েছেন দাপট। তাতে উলটো নাকাল অস্ট্রেলিয়া। ১৫৫ রানের জুটি। দুজনেই পেতে পারতেন সেঞ্চুরি। তা আর হয়নি। একজন ৮৪, আরেকজন ৭১। দল তাতেই পেয়ে যায় লড়াইয়ের পুঁজি। মিরপুরের পিচে যে ২৬০ রান বেশ তরতাজা সংগ্রহ জানত বাংলাদেশ। পরে জেনেছে অস্ট্রেলিয়া।

ব্যাটের পর বল। রাজা ওই সাকিব আল হাসান। বছরের পর বছর নিজের নামের পাশে কেন এক নম্বর অলরাউন্ডারের তকমা লাগানো, বুঝিয়েছেন পাই-পয়সা হিসাব করে। ৬৮ রানে ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন ২১৭ রানে। ৪৩ রানের লিড। দ্বিতীয় ইনিংসে স্বাগতিকদের ব্যাটিং আরেকটু নাজুক। সাকিবও পারেননি ব্যাট হাতে। তবে তামিম ছিলেন চোয়ালবদ্ধ। অধিনায়ক মুশফিকের দৃঢ়তাও ছিল। ২২১ রানে অলআউট হয়েও অস্ট্রেলিয়ার সামনে ২৬৫ রানের টার্গেট। গেল অক্টোবরেই এ মাঠে ইংল্যান্ডকে ২৭২ রানের টার্গেট দিয়ে বড়সড় ব্যবধানে জেতা গেছে। বাংলাদেশের শরীরী ভাষায়ও সেই পরিসংখ্যানের তেজ। না পারেনি অস্ট্রেলিয়াও। তবে লড়েছে বেশ। ডেভিড ওয়ার্নার সেঞ্চুরি করে রীতিমতো ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল টাইগার সমর্থকদের। সব ভয় দূর করার দাওয়াই জানা সাকিবের। একে একে ছেঁটেছেন অস্ট্রেলিয়ানদের। আবার ৫ উইকেট, ম্যাচে ১০ উইকেট, ব্যাট হাতে ৮৯ রান। ক্যারিয়ারের পঞ্চাশতম টেস্টে ইতিহাসের আর কোনো অলরাউন্ডারের নেই এমন কীর্তি। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ জিতেছে ২০ রানে। বিশ্বক্রিকেটে হইহই পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। সাদা পোশাকে নয় নম্বর দল হারিয়ে দিয়েছে অন্যতম সেরা দলকে। বিশ্ব তারকাদের পিঠ চাপড়ানো, সাকিব স্তুতি। মিলেছে সবই।

ঢাকায় এমন চাঙা নৈপুণ্যের পর চট্টগ্রামে গিয়ে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া বরং বেশ বেমানানই। বাংলাদেশের টার্নিং পিচের রেসিপি বুঝে নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। দলে ভেড়ায় অতিরিক্ত ঘূর্ণি বোলার। চট্টগ্রামে বাংলাদেশ কাবু হয়েছে কৌশলের ভুল আর তালগোল পাকানো ব্যাটিংয়ে। দুই টেস্টেই টসে জিতে ব্যাটিং নেন মুশফিক। ঢাকার সঙ্গে মিল কেবল এখানেই। বাংলাদেশ জেনেছিল চট্টগ্রামেও তৈরি টার্নিং পিচ। যেখানেও লাট্টুর মতো ঘুরবে বল। বৃষ্টির কারণে কিউরেটর বাংলাদেশের রেসিপি মতো পিচ বানাতে পারেননি। তবু লম্বা সময় ব্যাট করে ফায়দা তুলতে পারত বাংলাদেশ। মুশফিকরা ফেল করেছেন ওখানে। প্রথম ইনিংসে ৩০৫ রান। সাকিব-তামিম দুজনেই এবার ব্যর্থ। রান পান মুশফিক-সাব্বির। এই রান যে মামুলি, ব্যাট করতে নেমে বুঝিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের জন্য নামডাকওয়ালা ডেভিড ওয়ার্নার আগের টেস্টেও চিনিয়েছিলেন নিজের জাত। করেছিলেন দ্রুত সেঞ্চুরি। এবার তিনি নিলেন ছদ্মবেশ। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে পিচের ভাষা আয়ত্তে করেছেন সবচেয়ে ভালো। ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের বদলে টিকে থাকার নিবেদন। ওস্তাদি দেখিয়েছেন চোয়ালবদ্ধ দৃঢ়তায়। ক্যারিয়ারের মন্থরতম সেঞ্চুরি করতে

লাগিয়েছেন ২০৯ বল!

মোস্তাফিজুর রহমান তবু খেলায় ফিরিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। ৩৭৭ রানে অস্ট্রেলিয়াকে অলআউট করে দিয়ে লিড বাড়তে দেননি ৭২ রানের বেশি। তবে তা কাজে লাগাতে হবে তো ব্যাটসম্যানদের। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেই তালগোল পাকিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা। ৪৩ রানেই ৫ উইকেট পড়ল। মুশফিক, সাব্বির, মুমিনুলরা সেটা টেনেটুনে ১৫৭ পর্যন্ত নিতে পারলেন। বাংলাদেশের জন্য তৈরি করা খাবার একাই সাবাড় করলেন ন্যাথান লায়ন। অস্ট্রেলিয়ান অফস্পিনার প্রথম ইনিংসে নিয়েছিলেন ৭ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে নিলেন ৬টি। ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ার সামনে ২৬৫ রানের টার্গেট দিয়েছিল বাংলাদেশ, চট্টগ্রামে দিতে পারল মাত্র ৮৬ রানের। ফলটা তাই ভিন্ন হওয়ারই কথা। ওয়ানডে স্টাইলেই ৩ উইকেট হারিয়ে এ রান তুলেছে সফরকারীরা।

এবার কেন পারল না বাংলাদেশ? ব্যাটিং ব্যর্থতা তো আছেই, পিচের ভাষা বুঝতে না পারাও কারণ হয়তো। আরেকটি কারণ বড় দৃশ্যমান। ঢাকায় জেতানোর দুই হিরো সাকিব-তামিম যে চট্টগ্রামে মলিন। টেস্টের বাংলাদেশ কি এখনও তবে সাকিব-তামিমনির্ভর?

খেলার মাঠে ত্রুটি-বিচ্যুতি আর প্রাপ্তি নিয়ে আরও বিশ্লেষণ হতে পারে। মাঠের বাইরের বাণিজ্যের হিসাবটা কিন্তু মন্দ নয়। এর মধ্যেই ফিরতি সিরিজ খেলতে আসছে বছর অস্ট্রেলিয়ায় নিমন্ত্রণ পেয়ে গেছে বাংলাদেশ। দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ছে তরতর করে। জটলা দেখে লাইন পড়েছে স্পনসর কোম্পানিগুলোর। বাংলাদেশকে নিজেদের দেশে আমন্ত্রণ করলে এখন আর ক্ষতি নেই অস্ট্রেলিয়ার। শ্রীলঙ্কা, আয়ারল্যান্ড এমনকি নিউজিল্যান্ডেও স্পনসরশিপ কিনে নিচ্ছে বাংলাদেশি কোম্পানি। মাঠের খেলায় আসছে তেজ, বাণিজ্যের বাজারও তাই হচ্ছে রমরমা। বাণিজ্যের কারণেই সামনে হয়তো আরও খেলা বেড়ে যাবে বাংলাদেশের। আর হ্যাঁ, ক্রিকেট খেলতে বাংলাদেশে যে নিরাপত্তার সংকট একেবারেই নেই, ফের প্রতিষ্ঠা করা গেছে তা।

 

গণমাধ্যমকর্মী