অ্যাপ বন্ধ করে চুক্তিতে চলছে বাইক রাইডাররা

নীতিমালাবিহীন রাস্তায় অবৈধ পার্কিং

২০১৬ সালে রাজধানীতে যাত্রা রাইড শেয়ারিং সেবার। দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ায় চলতি বছর এ-সংক্রান্ত নীতিমালা করে সরকার। তবে নীতিমালা না মেনে চলছে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং সেবা। এতে যাত্রী হয়রানি বাড়লেও আইনি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে শেয়ার বিজের ধারাবাহিক আয়োজনের আজ ছাপা হচ্ছে শেষ পর্ব

হামিদুর রহমান : রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারাসংলগ্ন মোড়। রাজধানীর ব্যস্ততম ও যানজটপূর্ণ একটি মোড়। তবে এ মোড়ে প্রতিদিন বিকাল ৪টার পর থেকেই ৫০-৬০টি বাইক পার্কিং করে বসে থাকেন চালকরা। অ্যাপভিত্তিক বাইক রাইড শেয়ারিং হলেও তা বন্ধ করে চুক্তিতে চলার জন্য বসে থাকেন তারা, আর পাশ দিয়ে কেউ যাওয়ার সময়ই গন্তব্যে পৌঁছে দিতে তাদের ডাকতে থাকেন। যদিও রাইড শেয়ারিং নীতিমালায় রাস্তায় এ ধরনের পার্কিং নিষিদ্ধ।
সম্প্রতি এ সড়কে হাঁটার সময় প্রতিবেদককে দেখে ডেকে ওঠেন এক রাইডার। বলেন, ‘ভাই, যাবেন? রামপুরা, গুলশান, বাড্ডা, লিংক রোডÑ৬০ টাকা। ভাই কোথায় যাবেন?’ উত্তরে প্রতিবেদক বলেন, ‘বাড্ডা যাব, অ্যাপ চালু করেন।’ তখন বাইক রাইডার বলেন, ‘অ্যাপ ছাড়াই চলেন, কত দেবেন?’ এভাবেই যাত্রী নিচ্ছেন পাঠাও চালকের রাইডার শাকিল হোসেন।
অ্যাপ ছাড়া কেন যাচ্ছেনÑজানতে চাইলে রাইডার শাকিল বলেন, ‘অ্যাপে রাইড দিলে পোষায় না। তাই দিনে চার-পাঁচটি রাইড অ্যাপ ছাড়া দিই। অ্যাপে অনেক যাত্রীর ডিসকাউন্ট থাকে। এতে ১০০ টাকার রাইডে ৫০ টাকার মতো পাওয়া যায়। অ্যাপ ছাড়া যাত্রী ডেকে নিলে প্রতিষ্ঠানকে কোনো চার্জ দিতে হয় না।’
একই ধরনের কথা বলেন ওভাইয়ের রাইডার সাইমন ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের আকর্ষণ বাড়াতে প্রতিদিন বিভিন্ন অফার দিয়ে থাকে। যত রিকোয়েস্ট আসে, তাদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে পাঁচ গ্রাহকের ডিসকাউন্ট থাকে। রিকোয়েস্ট ক্যানসেল করলে আবার রেটিং কমে যায়। ফলে রেটিং ধরে রাখা কঠিন। কোনো না কোনো কারণে রিকোয়েস্ট ক্যানসেল হয়ে যায়। তাছাড়া রেটিংয়ের জন্য আলাদা বোনাস দেওয়া হয়। তার চেয়ে অ্যাপ ছাড়া যাত্রী ডেকে নিলে কম রাইডেই সারা দিনে ভালো টাকা আয় করা যায়।’
এদিকে অ্যাপভিত্তিক এই পরিবহন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগও কম তুলছেন না গ্রাহকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপে যাত্রীরা প্রায়ই ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তুলে ধরেন। সেসব পোস্টের বরাতে জানা যায়, অনেক যাত্রীর সঙ্গে চালক অশোভন আচরণ করেন। তাছাড়া ডিসকাউন্ট থাকলে যাত্রীকে নিতে চান না। অনেক চালক যাত্রীর কাছে আসার আগেই যাত্রা শুরু করেন। আবার অনেকে পিক পয়েন্টে না এসে যাত্রীকে তার কাছাকাছি কোথাও গিয়ে দাঁড়াতে বলেন।
দিপক সাহা নামে এক উবারের যাত্রী বলেন, ‘গত ১ সেপ্টেম্বর আমি ধানমন্ডি রাপা প্লাজার সামনে দাঁড়িয়ে উবারে কল দিয়েছি। আমার গন্তব্য ছিল বাড্ডা। এ সময় মোটরসাইকেলের চালক আমাকে রাপা প্লাজার বিপরীত পাশে আসতে বলেন। আমি না যেতে চাইলে রেগে যান। একপর্যায়ে বাকবিতণ্ডাও হয় তার সঙ্গে। পরে আমি রাইড ক্যানসেল করে দিই। আশপাশে রাইডার না পাওয়ার হঠাৎ পরে চুক্তিতে বাসায় পৌঁছাতে হয়।’
যাত্রীরা বলছেন, ‘অ্যাপভিক্তিক সেবা প্রদানের নির্দেশনা থাকলেও তা মানছেন না অনেক ড্রাইভার। কিছু ড্রাইভার যাত্রীদের বাসা বা অফিসের নিচ থেকে পৌঁছে দিচ্ছেন গন্তব্যে। এক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলেও তা আমলে নিচ্ছেন না যাত্রীরা। অন্যদিকে রাস্তায় রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইক পার্কিংয়ের অনুমতি না থাকলেও রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তার মোড় ও মার্কেটের সামনে অবৈধভাবে যত্রতত্র পার্কিং করে রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশার মতোই যাত্রী ডাকছেন বাইকাররা। আর অ্যাপ ছাড়া যাত্রী ডাকায় বিব্রত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘অ্যাপবিহীন সার্ভিসে যে কোনো সময়ই দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে যাত্রী ও রাইডারদের উভয়েকেই সতর্ক থাকতে হবে। তবে অ্যাপ ছাড়া এভাবেই চুক্তিতে সার্ভিস চলতে থাকলে একসময় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা হুমকিতে পড়বে, পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অপরাধও বেড়ে যাবে।
তারা আরও জানান, ‘দেশের মানুষ বিকল্প ব্যবস্থা না পেয়ে বহুদিন ধরেই যানজটে ভোগান্তি পোহাচ্ছে। এতে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ে মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরেছে, ভবিষ্যতের জন্যও একটি ভালো ম্যাসেজ দিচ্ছে। তবে কিছু বাইকার ও যাত্রীদের জন্য সার্ভিস যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। নিরাপদ সার্ভিস প্রদানে অ্যাপের বিকল্প নেই। তবে রাস্তায় বাইক পার্কিং ও অ্যাপবিহীন বাইকারদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদাড়ি বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি সরকারেরও বিষয়টি নজরদারির আওতায় আনতে হবে।’
জানতে চাইলে পাঠাও’র হেড অব মার্কেটিং বিভাগের সৈয়দা নাবিলা মাহবুব শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অ্যাপবিহীন বাইকারের বিরুদ্ধে যাত্রা নেওয়ার কোনো অভিযোগ পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেসব বাইকারের রেজিস্ট্রেশন বাদ করে দিচ্ছি, কেননা অ্যাপ ছাড়া কোনো যাত্রী বাইকে উঠলে তা ট্র্যাক করা যায় না। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আমরা যাত্রীদের বলব নিজের এবং দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে যাতায়াত করুন।’
জানতে চাইলে উবারের ঢাকা অফিসের পক্ষ থেকে এক মেইল বার্তায় শেয়ার বিজকে জানানো হয়, ‘আমরা সব সময় যাত্রীদের সাশ্রয়ী মূল্যের যাত্রাসেবা দিয়ে থাকি। রাইডার্স ও যাত্রীদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ড্রাইভার ও যাত্রী উভয় পক্ষকেই উবার অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের পাশাপাশি আইন মেনে চলতে নির্দেশনা প্রদান করে থাকি। কোনো ড্রাইভার নির্দেশনা বা আইন ভঙ্গ করলে সঙ্গে সঙ্গে তার অ্যাকাউন্ট অ্যাক্সেস ক্যানসেল করে থাকি। এছাড়া যে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার শিকার হলে, অর্থাৎ যাত্রীদের কোনো ধরনের অভিযোগ থাকলে আমার তাদের অভিযোগ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।’