‘আইন দ্বারা পরিচালিত একটি পদ কোম্পানি সচিব’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) ও কোম্পানি সচিব মো. জাকির হোসেন এফসিএ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. জাকির হোসেন এফসিএ উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) ও কোম্পানি সচিব। ঢাকা কলেজ থেকে বিকম পাসের পর সম্পন্ন করেছেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং পেশাগত ডিগ্রি। তিনি দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর একজন সম্মানিত ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

মো. জাকির হোসেন : ক্যারিয়ার শুরু করি ১৯৯৬ সালে কেপিএমজি রহমান রহমান হক সিএ ফার্মের অডিট অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। এরপর সুবাস্তু ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডে যোগ দিই ১৯৯৯ সালে। ওই প্রতিষ্ঠানে ২০০৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ম্যানেজার (অ্যাকাউন্টস, ফাইন্যানস অ্যান্ড প্লানিং) হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর উত্তরা ফাইন্যানস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডে যোগ দিই প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিব পদে। ২০১০ সাল থেকে শুধু কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: কোম্পানি সচিব পেশাকে কেন বেছে নিলেন?

মো. জাকির হোসেন : কোম্পানি সচিব হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ব এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার উদ্দেশে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করি। এসএসসিতে আশানুরূপ ফল না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ি। যশোর শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর নুরুল আলম স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং পড়ার লক্ষ্য ঠিক করে যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হই। এইচএসসিতে ১৯৮৮ সালে যশোর বোর্ডে বাণিজ্য বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করি। এরপর ঢাকায় আসি। ঢাকা কলেজ থেকে বিকম পাস করে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিংয়ে ভর্তি হই। এরপর কর্মজীবনে প্রবেশ করি। প্রথমে রহমান রহমান হক তারপর সুবাস্তু ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড ও সর্বশেষ উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের সিএফও ও কোম্পানি সচিব পদে যোগ দিই। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং পড়ার সুবাদেই মূলত এ পেশায় চলে আসা। এরপর এ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত অবস্থায় ২০১০ সালে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানে সিএফও ও কোম্পানি সচিব পৃথক ব্যক্তি হবেন এমন বিধান হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিই কোম্পানি সচিব হিসেবে কাজ করব। কারণ আইনগত বিষয়াদি নিয়ে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। তাছাড়া কোম্পানি সচিব একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। এ পেশায় কোম্পানি সংক্রান্ত আইনি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জন ও প্রয়োগের পাশপাশি প্রতিষ্ঠানের আইনি অভিভাবক ও মুখপাত্র হিসেবে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কাজ করা ও সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সচিবের সম্পর্ক কেমন?

মো. জাকির হোসেন: কোম্পানি সচিব প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ। কোম্পানি সচিব একদিকে যেমন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, অন্যদিকে তিনি পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে মুখ্য সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, শেয়ারহোল্ডার, অডিটর, রেগুলেটরি বডিসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব কোম্পানি সচিবের। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে কি না, তা দেখাশোনার দায়িত্বও তার। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোম্পানি সচিবের সম্পর্ক একদিকে যেমন আইন ও বিধান দ্বারা নির্দিষ্ট, ঠিক তেমনি দায়িত্ববোধ হতেও উৎসারিত।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে সচিবের ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই

মো. জাকির হোসেন: পেশাগত দিক থেকে কোম্পানি সচিব গুরুত্বপূর্ণ ও আইন দ্বারা পরিচালিত একটি পদ। কোম্পানি সচিবকে প্রতিষ্ঠানের চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রতিষ্ঠানে আইনকানুন, গভর্ন্যান্স ও কমপ্লায়েন্স যথাযথ পরিপালনের বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্বও কোম্পানি সচিবের। সচিবকে কোম্পানি আইনসহ সংশ্লিষ্ট অন্য আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে তার প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হয়। এগুলো নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদের সভা ও বার্ষিক সাধারণ সভার আয়োজন করা সচিবে অন্যতম প্রধান কাজ। একই সঙ্গে সভার আলোচ্য বিষয় কি হবে তা সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করাসহ এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা তার দায়িত্ব। পাশাপাশি সভার সিদ্ধান্তসমূহ লিপিবদ্ধ  ও সভা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রাদি সংরক্ষণ করা তার বিশেষ কর্তব্য। বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থাপনের জন্য কোম্পানির সার্বিক বিষয় তুলে ধরে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা কোম্পানি সচিবের অন্যতম প্রধান কাজ। এছাড়া পরিচালনা পর্ষদ গৃহীত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনাগুলো পরিপালন এবং রেগুলেটরি বডির বিধিনিষেধ ও পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তা দেখভালের দায়িত্ব কোম্পানি সচিবের ওপর বর্তায়। সুতরাং সামগ্রিক দিক বিবেচনায় একটি প্রতিষ্ঠানে কোম্পানি সচিবের ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে সচিবের চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

মো. জাকির হোসেন: আসলে কোম্পানি সচিবের কাজের পরিধি ব্যাপক। প্রযোজ্য সব আইনের পরিপালন, আইন অনুযায়ী সভার আয়োজন, সভার আলোচ্য বিষয় ঠিক করা, সভার বিজ্ঞপ্তি প্রদান ও সভার সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের বিষয় কোম্পানি সচিবকে নিশ্চিত করতে হয়। এটাই মূলত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের। প্রতিষ্ঠানে সচিবকে নির্দিষ্ট কোনো বিভাগ নয় বরং সব বিভাগের সঙ্গেই কাজ করতে হয়। একইসঙ্গে শেয়ারহোল্ডার, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদÑসবার সঙ্গে তাকে সেতুবন্ধ হিসেবে থাকতে হয়। আর এসব কিছু নানা আইনকানুন মেনে করতে হয়। এ জন্য আইন ও বিধিবিধানগুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানসহ এসব বিষয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আপডেট থাকা আবশ্যক। সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জন করা কোম্পানি সচিবের জন্য অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। অপরদিকে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তথা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার কাজের সমন্বয় সাধন করে কোম্পানির অগ্রগতি নিশ্চিত করা কোম্পানি সচিবের জন্য কম চ্যালেঞ্জের নয়।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে আপনার মূলমন্ত্র কী?

মো. জাকির হোসেন: একজন পেশাজীবীর জন্য কর্মক্ষেত্রে তার দায়িত্ব পালনে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজার রাখার মূল চাবিকাঠি হচ্ছে অন্যকে বুঝতে হবে, পরিবেশ পরিস্থিতি সব বুঝেশুনে কাজ করতে হবে। এছাড়া সততা ও কর্মনিষ্ঠার পাশাপাশি সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। অন্যের বিপদে-আপদে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। আরেকটি বিষয় হলোÑকারো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তাকে বকাঝকা না করে শিখিয়ে দিতে হবে। সহায়তা করার ইতিবাচক মনোবৃত্তিই কর্মক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখার মূলমন্ত্র।

শেয়ার বিজ: কোম্পানি সচিব পেশাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মো. জাকির হোসেন : কোম্পানি সচিব পেশাটি যেমন একাধারে চ্যালেঞ্জিং তেমনি উপভোগ্যও বটে। একজন সচিব প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারহোল্ডারদের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিষ্ঠানের ভেতর ও বাইরে ঊর্ধ্বতন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে কাজ করার অন্যতম একটা সুযোগ রয়েছে এ পেশায়।

শেয়ার বিজ: সফল কোম্পানি সচিবের কী কী গুণ থাকা জরুরি বলে মনে করেন?

মো. জাকির হোসেন : কোম্পানি সচিবকে সুনির্দিষ্ট কিছু গুণের অধিকারী হতে হয়। আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের পাশাপাশি তাকে কৌশলী হতে হয়। বিভিন্ন বিষয়ের চাপকে সহজভাবে নেওয়া খুবই জরুরি। কোম্পানি সচিব একজন সমন্বয়কারী। সুতরাং তাকে ধৈর্যশীল হতে হয়। এছাড়া নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে কাজে মনোনিবেশ করা, দায়িত্ব জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া, কাজের প্রতি অটল থাকা, ধারাবাহিকভাবে কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী হওয়া জরুরি। সহকর্মীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারসহ সবার সঙ্গে সমান ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে সুসম্পর্ক স্থাপনের গুণাবলি কোম্পানি সচিবের থাকা আবশ্যক। কোম্পানি সচিবের রেগুলেটরি বডির নিয়মকানুন, আদেশ-নির্দেশ, জারি করা গাইডলাইন সম্পর্কে আপডেট থাকার পাশাপাশি তা যথাযথভাবে পরিপালনের দক্ষতা থাকতে হবে।