আইন লঙ্ঘন করছে কোম্পানি ভুগছে বিনিয়োগকারীরা!

 

শরিফুল ইসলাম পলাশ : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য। কিন্তু অনেক কোম্পানি সেই নির্দেশনা মেনে চলছে না, বরং নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে যাচ্ছে। কিন্তু এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো স্বল্প সময়ের মধ্যে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারছে না। যে কারণে কোম্পানির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি, নিয়মিত এজিএম না করা, উৎপাদন বন্ধ রাখা, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঠকানো এবং শেয়ার নিয়ে কারসাজির ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। অবশ্য এ বিষয়গুলো নতুন নয়, বিভিন্ন সময়ে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে।

রহস্যজনক কারণে প্রথম দিকে বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বশীলরা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। আইন লঙ্ঘনের কারণে বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ার বাজারের নীতিনির্ধারকরা নড়েচড়ে বসছেন। তড়িঘড়ি করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওটিসিতে পাঠানো, ক্যাটেগরিচ্যুত করা এবং শেয়ার কারসাজির জন্য হল্টট্রেড বা লেনদেন স্থগিত করা হচ্ছে। কিন্তু কোম্পানির আইন লঙ্ঘনের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হলেও কোম্পানিগুলোর বদলে বিনিয়োগকারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য সময়োপযোগী নীতিমালা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারপরও সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। তাই আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আইন লঙ্ঘন করে বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করছে কোম্পানিগুলো। কিন্তু কোম্পানিকে শাস্তি প্রদানের কারণে বিনিয়োগকারীরা যেন ভোগান্তির মুখে না পড়েন সেই বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন। আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে ধীরগতির কারণে কারসাজির শিকার হন বিনিয়োগকারীরা। আর শাস্তিস্বরূপ কোম্পানির লেনদেন বন্ধ বা কোনো নেতিবাচক ঘোষণায় শেয়ারদর কমলে কিন্তু বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। আমরা এ বিষয়ে আজ প্রথম লিখছি না। এর আগেও বিষয়গুলো দায়িত্বশীলদের নজরে আনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

পুঁজিবাজারে ‘কারসাজি’ অতি পরিচিত একটি শব্দ। সংঘবদ্ধ শক্তিশালী চক্র গুজব ছড়িয়ে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করে। কারসাজির কারণে কোনো ধরনের দৃশ্যমান কারণ বা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারদর বেড়ে যায়। দর বাড়তে শুরু করলে রহস্যজনক কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নীরব ভূমিকা পালন করে। কারসাজির শেষ পর্যায়ে এসে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারকরা সরব হওয়ার আগেই কারসাজি চক্র মুনাফা লুটে বাজার থেকে বেরিয়ে যায়। কারসাজির কারণে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। আর তখনই তদন্তের নামে লেনদেন স্থগিত করা হয়। লেনদেন স্থগিত (হল্টট্রেড) করা হলে সেই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি আটকে যায়। কোম্পানি বা কারসাজি চক্রের অপরাধের শাস্তি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভোগ করতে হয়।

একইভাবে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর নিয়মিত এজিএম না করলে, বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হলে এবং কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ থাকলে প্রচলিত আইন মেনে আগে অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোকে ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেটে পাঠানো হতো। কিন্তু ‘ভোগান্তির মার্কেট’ বলে খ্যাত ওটিসিতে চলে যাওয়ার পর কোম্পানিগুলো সেখান থেকে ফিরে আসতে পারে না। ওটিসিতে থাকলে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড না দিয়েও জবাবদিহিতার বাইরে থাকার সুযোগ থাকে, যে কারণে কোম্পানিগুলো মূল মার্কেটে ফিরতে চায় না। আর ওটিসির লেনদেনে জটিলতা, ক্রেতা সংকট এবং ডিভিডেন্ড না পাওয়ার কারণে কোম্পানিকে শাস্তি দেওয়া হলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

ওটিসি মার্কেটের ভোগান্তি বিবেচনা করে নতুন করে কোনো কোম্পানিকে সেখানে পাঠানো হচ্ছে না। এজিএম না করা, ডিভিডেন্ড হার কম হওয়া এবং কোম্পানির উৎপাদন বন্ধের শাস্তি হিসেবে অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোকে ক্যাটেগরিচ্যুত করা হয়। ক্যাটেগরি হারানোর পর কোম্পানিগুলোর স্থান হয় ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে। আর ‘জেড’ ক্যাটেগরিও ভোগান্তির আরেক নাম। দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারদর একই অবস্থানে থাকা, ডিভিডেন্ড না দেওয়া, শেয়ার নিয়ে কারসাজির আশঙ্কা এবং লেনদেনে জটিলতার কারণে বিনিয়োগকারীরা ‘জেড’ ক্যাটাগরি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।

আইন লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তিস্বরূপ ইদানীংকালে কোম্পানিগুলোকে ক্যাটেগরিচ্যুত করা এবং হল্টট্রেড করার মতো শাস্তি প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু এসব শাস্তির কারণে কোম্পানিগুলোর বদলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আর ‘শাস্তি’ কোম্পানির জন্য কখনও কখনও ‘স্বস্তি’র কারণ হচ্ছে। তাই বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখার তাগিদ দিচ্ছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, প্রচলিত আইনের দুর্বলতা এবং নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতার কারণে কোম্পানিগুলো আইন লঙ্ঘন করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেই ক্ষেত্রেও বিনিয়োগকারীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তাই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কোম্পানিকে শাস্তি দিতে গিয়ে যাতে বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা না হয় সেজন্য দায়িত্বশীলদের যত্নশীল হতে হবে।

 

গণমাধ্যমকর্মী