প্রচ্ছদ প্রথম পাতা সাক্ষাৎকার

‘আগামীতে প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ’

দেশের প্রযুক্তি খাতে মোস্তাফা জব্বার অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। দেশে কম্পিউটারভিত্তিক বিভিন্ন সেবার বিকাশে তার অবদান অপরিসীম। নবগঠিত মন্ত্রিসভায় পুনরায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন এ প্রযুক্তিবিদ। নতুন করে দায়িত্ব গ্রহণের পর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হয়েছেন দৈনিক শেয়ার বিজের।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হামিদুর রহমান

শেয়ার বিজ: নতুন করে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের। আগামী পাঁচ বছরে লক্ষ্য সম্পর্কে কিছু বলুন?
মোস্তাফা জব্বার: এরই মধ্যে দেশে প্রযুক্তিতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে। সামনে আরও কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাই। অর্থাৎ, প্রযুক্তি খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে চাই। যেখানে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত নয়, বরং নিজেরাই নতুন নতুন প্রযুক্তি তৈরি করব। যার নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ। আমরা স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রযুক্তি শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাই। সব ধরনের সেবাই অনলাইনভিত্তিক হবে।

শেয়ার বিজ: প্রযুক্তি খাতে আমাদের দেশের তরুণদের দক্ষতা কেমন? তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে কি ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
মোস্তাফা জব্বার: অন্যান্য দেশে তরুণদের যেভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সে অর্থে আমাদের তরুণরা অনেক দক্ষ। তারা তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়েই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কিছুদিন আগে গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ডে গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকজন বিদেশি কর্মীর সঙ্গে আমাদের তরুণদের একটি টিম কাজ করছে। বিদেশিদের কাছে আমাদের তরুণদের অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তারা আমাদের তরুণদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলে চাইলে বিদেশিদের ছাড়াই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পরিচালনা করতে পারবে বাংলাদেশ। সুতরাং বোঝাই যায়, আমাদের তরুণরা যদি মাত্র তিন মাসের প্রশিক্ষণে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পরিচালনা করতে পারে, তাহলে এর চেয়ে দক্ষ তরুণ আর কোনো দেশে থাকতে পারে না। এখন এ দক্ষতাকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে হবে। এরই মধ্যে দেশে বিভিন্ন হাইটেক পার্ক গড়ে উঠেছে। যেখানে তরুণদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতেও তাদের কাজে লাগাতে চাই।

শেয়ার বিজ: বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি খাতে দেশ বস্তুতপক্ষে কতটুকু এগিয়েছে। মানুষের সেবা বাড়াতে কি ধরনের উদ্যোগ নেবেন?
মোস্তাফা জব্বার: ২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। একটি দেশের শিল্পবিপ্লব ঘটাতে ১০ বছর কিন্তু বেশি নয়। এ সময়ের মধ্যেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন সাধারণ মানুষ প্রবাসে আত্মীয়র সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারছে। এরই মধ্যে সরকারি প্রায় ৩০০ সেবা ডিজিটাল করা হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত একটি আমূল রূপান্তর হয়েছে। ইন্টারনেট হাতের নাগালে আসায় ই-কমার্সে কাজের সুযোগ ক্রমেই বাড়ছে; কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে আইসিটি খাত। এছাড়া দেশে এখন মোবাইল ফোনে প্রায় এক হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়। অর্থাৎ, মোট আর্থিক লেনদেনের ৪০ শতাংশ সম্পন্ন হয় ইন্টারনেটে। শুধু এ আর্থিক পদ্ধতি দেখলেই বোঝা যায় মানুষের জীবনধারা বদলে গেছে। আগে লক্ষ্য ছিল গ্রামে গ্রামে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া। এখন লক্ষ্য বাড়ি বাড়ি ইন্টারনেট সেবা পৌঁছানো। এটি নিশ্চিতে এরই মধ্যে অবকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যেই এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

শেয়ার বিজ: ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে খাতভিত্তিক পরিকল্পনা আছে কি?
মোস্তাফা জব্বার: গ্রাম ও শহরের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি আমাদের চাওয়া কাগজবিহীন সরকারি দফতর, নগদবিহীন আর্থিক ব্যবস্থা, ডিজিটাল শিক্ষা, ডিজিটাল গ্রাম, ডিজিটাল শিল্প এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা। এ সবকিছু ২০২০-২১ সালের মধ্যে দৃশ্যমান করতে চাই। অনলাইনভিত্তিক সেবা আরও জোরদার করতে আমরা ২০২১-২৩ সালের মধ্যে ফাইভ-জি সেবা চালু করতে চাই।

শেয়ার বিজ: এগুলো বাস্তবায়ন হবে কীভাবে?
মোস্তাফা জব্বার: এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জগুলো বাস্তবায়নে আমরা কাজ শুরু করেছি। স্কুল থেকে শুরু করে মাদরাসা পর্যন্ত ডিজিটাল শিক্ষা দ্রুত সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন করা হবে। এগুলো বাস্তবায়নের মূলে রয়েছে ইচ্ছাশক্তি, যে ইচ্ছাশক্তির আলোকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের। সে লক্ষ্য অর্জনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। গত এক বছরে দেশে বেশকিছু নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফোর-জি, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, এমএনপিসহ বেশ কিছু নতুন প্রযুক্তি। এখন লক্ষ্য বাড়ি বাড়ি ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়া। এটি বাস্তবায়ন হলে সবকিছু সহজলভ্য হবে। আমার বড় চ্যালেঞ্জ হবে, অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কারিকুলাম ও বিনোদন কনটেন্ট তৈরি। দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জনগণের রুচির বিষয়টি মাথায় রেখে এগুলোর উন্নয়ন করা হবে। প্রশ্ন আসতে পারে: এগুলোর জন্য রিসোর্স কোথায়? এবার নির্বাচন পরিচালনার কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, দেশের সাধারণ ছেলেমেয়েরা দারুণ দক্ষতা দিয়ে মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি করছে। আমরা এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাব; আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী অনেক।

শেয়ার বিজ: প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে কি পদক্ষেপ নেবেন?
মোস্তাফা জব্বার: সবকিছুতেই নজরদারি বাড়ছে। বিটিআরসির নিজস্ব ভবন তৈরি হচ্ছে; সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। আপনারা দেখেছেন, অতীতে নিরাপদ সড়ক ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ইস্যুতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার এক শতাংশও এবারের জাতীয় নির্বাচনের সময় হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিটিআরসিকে সঙ্গে নিয়ে একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ জনগণকে উপহার দিতে পেরেছি। আমরা সেনাবাহিনীর নামে ৭৬০টি ভুয়া ফেসবুক আইডি-পেইজ চিহ্নিত করতে পেরেছি। আর এগুলো বন্ধ করতে সময় লেগেছিল মাত্র দেড় ঘণ্টা। নাগরিকদের সাইবার জগতের সুরক্ষায় সব ব্যবস্থা করব। ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সি প্রথমবার মন্ত্রী থাকার সময়ই বানিয়ে ফেলেছি। যেটা এখন পুরো গতিতে কাজ করতে থাকবে। এছাড়া প্রযুক্তি যত ধরনের অ্যাডভান্সমেন্ট এসেছে আর আসবে, সেগুলো এর মাধ্যমে গড়ে তোলা হবে।

শেয়ার বিজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
মোস্তাফা জব্বার: শেয়ার বিজকেও ধন্যবাদ।

সর্বশেষ..