আগ্রাসী বিনিয়োগে ২২ ব্যাংক

মেহেদী হাসান: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নিয়েও আগ্রাসী বিনিয়োগ করে যাচ্ছে বেশকিছু ব্যাংক। দেশে কার্যরত ২২টি ব্যাংক মাত্রাতিরিক্ত ঋণ দিয়েছে। এদের মধ্যে নতুন প্রজন্মের সমস্যাগ্রস্ত ফারমার্স ব্যাংক, আগ্রাসী বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়া বেসিক ব্যাংক এবং সরকারের বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দিয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে হুশিয়ারি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এবি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, বিদেশি স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং বেসিক ব্যাংক আগ্রাসী বিনিয়োগ করছে। অর্থাৎ, এসব ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত ঋণ ও আমানতের অনুপাত (এডি রেশিও) অনুসরণ করছে না।
যেসব ব্যাংক আগ্রাসী বিনিয়োগ করছে, তাদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এডিআর নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ব্যাংক এশিয়া, ঢাকা ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আগ্রাসী বিনিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এডি রেশিও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী বছরের মার্চের মধ্যেই ব্যাংকগুলো এডিআরের নতুন সীমায় নামিয়ে আনতে পারবে। তবে সুদহার কমিয়ে আনায় ব্যাংকগুলোকে আমানত সংগ্রহে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ছয় শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এডিআর সমন্বয়ে ব্যাংকগুলোর জন্য এটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও মনে করছেন তিনি।
জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগের লাগাম টানতে ঋণ ও আমানতের অনুপাত বা এডি রেশিও (এডিআর) সীমা কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ৮৩ দশমিক ৫০ এবং ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ৮৯ শতাংশ এডিআর নির্ধারণ করা হয়েছে; যা আগামী বছরের মার্চের মধ্যে সমন্বয়ের সময় বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তথ্যমতে, চলতি বছরের মে শেষে এবি ব্যাংক মোট আমানতের ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ ঋণ দিয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকটি মোট ২২ হাজার ১৪৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আমানতের মধ্যে ২১ হাজার ৮৮৬ কোটি ৩০ লাখ টাকাই ঋণ বিতরণ করেছে। ব্যাংক এশিয়া মোট আমানতে ৮৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, সিটি ব্যাংক ৮৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংক ৮৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ফারমার্স ব্যাংক ১০৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৮৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংক ৯২ দশমিক ২৫ শতাংশ, এনআরবি ব্যাংক ৮৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, এনআরবি কর্মাশিয়াল ব্যাংক ৮৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ৮৫ দশমিক ৮০ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৮৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ৮৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ, সীমান্ত ব্যাংক ৮৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ১০৩ দশমিক ৩২ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। এছাড়া বিদেশি স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ৮৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক মোট আমানতের ১০০ দশমিক ৩২ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে।
অন্যদিকে, ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ৯৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৯১ দশমিক ৬৫ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংক ৯১ দশমিক ৪৭ শতাংশ, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ৯৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৯০ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ এবং ইউনিয়ন ব্যাংক মোট আমানতের ৯২ দশমিক ৪১ শতাংশ বিনিয়োগ করেছে।
আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে ফারমার্স, বেসিক এবং রাকাব। চলতি বছরের মে শেষে আলোচিত সমালোচিত ফারমার্স ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৪১১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ঋণ হিসেবে ব্যাংকটি বিতরণ করেছে পাঁচ হাজার ১৪০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ঋণের নামে লুট হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের আমানত দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৩৯৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তবে এ সময়ে ব্যাংকটি ঋণ দিয়েছে ১৪ হাজার ৮৮৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকার। বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মোট আমানত তিন হাজার ৮৮৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা হলেও ব্যাংকটি ঋণ দিয়েছে পাঁচ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা।