আট হাজার শ্রমিককে দুপুরে বিনা মূল্যে খাবার দেয় স্নোটেক্স

পলাশ শরিফ: দুপুর সাড়ে ১২টা, ধামরাইয়ের বেসরকারি তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী কোম্পানির কারখানায় শ্রমিকরা সুশৃঙ্খলভাবে ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছেন। সেখানে সারিবদ্ধ হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করছেন। কেউ কেউ এরই মধ্যে খাবার নিয়ে টেবিলে বসেছেন। প্রায় দেড় হাজার মানুষের সমাগমে পুরো এলাকাজুড়েই কলরব এমন চিত্র স্নোটেক্স আউটারওয়্যারের। বেসরকারি রফতানিমুখী তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি বিনা মূল্যে প্রায় আট হাজার শ্রমিককে দুপুরের খাবার খাওয়ায়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে খাওয়ার পর্ব চলে।
প্রতিদিনই শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার জন্য রান্নার আয়োজন করা হয়। খাবারের তালিকায় ডিম, ডাল, মাছ, মাংস, সবজি, ভর্তা, ভাজি থেকে শুরু করে পুষ্টিকর সবকিছুই থাকে। ক্যান্টিনে একসঙ্গে প্রায় এক হাজার ৪০০ জনের খাবার ব্যবস্থা রয়েছে। আর মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা করা হয় প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব অর্থায়নে। আর এ প্রক্রিয়া দেখভালের জন্য প্রায় ৬০ জনের একটি দল সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করে। সে সঙ্গে কারখানার ল্যাবে খাবার পরীক্ষা করে মান যাচাই করা হয়। আর খাবারের মান ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় ডিম, মাছ ও মাংস কাজী ফার্মসের ও ব্র্যাকের মতো স্বনামখ্যাত প্রক্রিয়াজাত খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনা হয়। এদিকে শ্রমিকদের বিনা মূল্যে খাদ্য সরবরাহ করতে গিয়ে সব মিলিয়ে দৈনিক ব্যয় হয় প্রায় তিন লাখ টাকা। সে হিসেবে বছর শেষে টাকার অঙ্কটা ১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০১৫ সাল থেকেই কর্মীদের এভাবে খাবার সরবরাহ করছে স্নোটেক্স গ্রুপ। আর এ খাবার শুধু শ্রমিকদের জন্য নয়, বরং কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শুরু করে আমন্ত্রিত অতিথিরাও একই খাবার খান। কোম্পানিটিতে শ্রমিক-কর্মকর্তা বলে কোনো শব্দ নেই। বরং সবাইকে একই পরিবারের সদস্য বলেই মনে করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক (অপারেশন) জয়দুল হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘একজন কর্মীর খাবারের ব্যবস্থা করায় সে দুপুরে নিজের জন্য এক ঘণ্টা সময় পায়। এ সময়ে সে বিশ্রাম নিতে পারে। আর তারা যদি বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসে তাহলে দুপুরে সেই খাবার স্বাস্থ্যসম্মত থাকে না। কেউ কেউ আগের দিনের রান্না করা খাবার নিয়ে আসে। তাই আমরা কর্মীদের সতেজ খাবার সরবরাহ করি। এতে সে সুস্থ থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানের কাজে তারা আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারে।’
স্নোটেক্স আউটারওয়্যারের কর্মীরা বলছেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের স্বার্থ সবসময়েই উপেক্ষিত। নামমাত্র মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের খাটানো হয়। যাদের শ্রমে কোম্পানির ভিত গড়ে তাদের স্বার্থের দিকে নজর দেওয়া হয় না। এমন অবস্থার মধ্যেই স্নোটেক্স সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি কর্মপরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। এখানে কর্মীদের পরিবারের সদস্য হিসেবে গণ্য করে তাদের খাদ্য, চিকিৎসা ও বিনোদনসহ সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। শ্রমিকদের মুনাফার অংশও দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে স্নোটেক্স শুধু একটি শিল্প-কারখানা নয়, একটি বড় আকারের একটি শিল্প-পরিবার।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মী রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘আমি প্রায় দুই বছর ধরে স্নোটেক্সে কাজ করছি। এর আগে অনেক জায়গায় কাজ করেছি। কিন্তু সেখানে এ রকম পরিবেশ নেই। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। তাই সময় কম থাকার কারণে খেয়ে না খেয়ে কাজ করতে হতো। এখানে সে সমস্যা নেই।’

যদিও কর্মীদের খাবারের পেছনে ব্যয়কে কোম্পানির জন্য ইতিবাচক বলেই মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীলরা। তাদের মতে, কর্মীরা দুপুরে ভালো খেতে পারলে তারা সুস্থ থাকবে। তাদের কর্মক্ষমতা বাড়বে। আবার খাবার জন্য তাদের দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। এমন চিন্তা থেকেই আমরা দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। এতে ব্যয় হলেও তারা ভালো খাবার পাচ্ছে। বাকি সময়টা বিশ্রাম করতে পারছে। আর খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও আমিষ জাতীয় খাদ্য ব্র্যাক, কাজী ফার্মস এবং আফতাবের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়। খাবার রান্নার হওয়ার পর তার পুষ্টিগুণ নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে যাচাই করে নেওয়া হয়।
স্নোটেক্সের স্বপ্নদ্রষ্টা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘শুরুতে খুবই ছোট পরিসরে অ্যাক্সেসরিজ সাপ্লাই প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা পথচলা শুরু করি। প্রথম ছয়টা মাস আমাদের জন্য খুবই কঠিন সময় ছিল। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর চেষ্টার পর সাফল্য আসে। স্নোটেক্স গ্রুপের শুরু থেকে বর্তমান অবধি এ সাফল্যের জন্য কর্মীদের অবদানই মুখ্য। আর এখন পর্যন্ত এতকিছু করা সম্ভব হয়েছে আমাদের কর্মীদের জন্য। তাই তাদের একই পরিবারের সদস্য হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আমরা কাজ করছি। তাদের খাবার, চিকিৎসা, বিনোদনসহ অন্য দিকগুলো গুরুত্ব সহকারে দেখছি।’
তিনি আরও বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীরাও অনেক বেশি আন্তরিক। শুরুতে যাদের নিয়ে এসেছিলাম তাদের অনেকেই এখনও আমাদের সঙ্গে আছেন। গার্মেন্ট ব্যবসা খুবই কঠিন। এর মধ্যেই আমাদের সাধ্যমতো সবটুকু করার চেষ্টা করছি। কর্মীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।’

ভিন্নধর্মী স্বপ্ন নিয়ে স্নোটেক্স গ্রুপের পথচলা শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। ২০ বছরের পথচলায় উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান, বাজারদর ও কর্মীবান্ধব পরিবেশের কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এগিয়েছে স্নোটেক্স। ওই গ্রুপের চারটি কারখানায় বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে ধামরাইয়ের স্নোটেক্স আউটারওয়্যারেই প্রায় আট হাজারের বেশি কর্মী রয়েছেন। ওই কারখানায় সাততলা ভবনের প্রায় চার লাখ বর্গফুট জায়গা নিয়ে স্নোটেক্স আউটারওয়্যার।

ছবি: শরীফুল ইসলাম