আত্মহত্যা রোধে দরকার সামাজিক উদ্যোগ

পরীক্ষায় অকৃতকার্য

কাজী সালমা সুলতানা: এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ফল প্রকাশের দিন রংপুরে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ১০ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে মারা গেছে একজন। ৯ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে। একইদিনে যশোরেও আটজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পঞ্চগড়, যশোর, ঝিকরগাছা ও শরীয়তপুরে একজন করে আত্মহত্যা করে। প্রতি বছরই পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এমন খবর পাওয়া যায়। কোনো কোনো ঘটনা হয়তো খবরের পাতায়ও আসে না। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী একইদিনে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।
গত ৭ মে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। এতে ভালো ফল অর্জনকারীদের অবশ্যই আন্তরিক অভিনন্দন। কিন্তু যারা ভালো ফল করতে পারেনি বা পাস করতে পারেনি তাদের নিন্দা জানানোর কোনো কারণ নেই। কোনো পাবলিক পরীক্ষায় শতভাগ পরীক্ষার্থী ভালো ফল অর্জন বা পাস করতে পারে না। সে হিসেবে কোনো কোনো ছাত্র আশানুরূপ ফল করতে পারবে না বা ফেল করবে এটাই স্বাভাবিক। যেসব পরীক্ষার্থী ভালো ফল বা পাস করতে পারেনিÑতাদের জীবন থেমে গেল, বিষয়টি মোটেও তা নয়। ব্যর্থতার ওপর দাঁড়িয়ে ভালো প্রস্তুতি নিলে আগামীতে তারাও ভালো ফল করতে পারে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমন ব্রতই থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ও সমাজ ব্যবস্থার কারণে একটি পরীক্ষায় ভালো-খারাপ ফলাফলের ওপর শিক্ষার্থীর গোটা জীবনকে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় খারাপ ফল করলে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এ থেকেই ঘটে আত্মহত্যাসহ নানা অঘটন।
প্রশ্ন হলো কেন এই আত্মহনন? পরীক্ষায় একবার পাস-ফেলের ওপর কি জীবনের সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করে? পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলের ওপর কি জীবন গড়ে ওঠে? সনদমুখী শিক্ষাব্যবস্থার কারণে ভালো ফল হয়তো চাকরিজীবনে একটা প্রভাব ফেলে। সে ক্ষেত্রেও তো নতুনভাবে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হয়। ভালো ফলকারীরা যে চাকরির পরীক্ষাগুলোয় সবসময় ভালো করে তেমনটি নয়। আর একজন শিক্ষার্থী একবার খারাপ ফল করার অর্থ এ নয় যে, সে আর কোনোদিন ভালো ফল
করতে পারবে না।
শিক্ষাগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য নিজের জীবন গড়া এবং সমাজ বা দেশের জন্য অবদান রাখা। পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থী কি জীবনে প্রতিষ্ঠা পায় না? অবশ্যই পায় এবং এমন অসংখ্য উদাহরণ সমাজে রয়েছে। তাই যেসব পরীক্ষার্থী ভালো ফল করতে পারেনি, তাদের মানসিক শক্তি জোগানোর কাজটি করতে হবে পরিবার ও সমাজ থেকে। পৃথিবীতে সম্মানিত হওয়ার বা সমাজকে এগিয়ে নিতে অবদান রাখার মতো অনেক কাজ রয়েছে। যে কাজের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ভালো ফলই মুখ্য নয়। তাই পরীক্ষায় ভালো ফল না হলে জীবনকে থামিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ফল যা-ই হোক, জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণই মূল বিষয়। বিশ্বের অনেক নামি বা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা শিক্ষাজীবনে ভালো ফল করতে পারেননি। কিন্তু কর্মজীবনে তারা অত্যন্ত সফল এবং অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।
আমাদের দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়াকেই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একমাত্র উপায় বলে মনে করে। অনেক মা-বাবাও সন্তানদের মনে সে ধারণাকেই গেঁথে দেন। সন্তানকে শিক্ষানুরাগী বা পড়াশোনায় মনোযোগী করে তোলার জন্য হয়তো সেটি একটি উপায়। অনেক অভিভাবক পরীক্ষায় ভালো ফলাফলকেই জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে মনে করেন এবং ভালো ফলাফলের জন্য সন্তানের ক্রমাগত চাপ দিতে থাকেন। অতিরিক্ত মানসিক চাপ শিক্ষার্থীকে স্বাধীনভাবে লেখাপড়া করতে বা প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। কোনো কোনো অভিভাবকের আচরণে শিক্ষার্থীর মনে এমন ধারণার জš§ নেয় যে, জীবনের চেয়েও পরীক্ষার ফল বেশি মূল্যবান। অনেক অভিভাবক সন্তানকে পড়াশোনায় চাপ দিতে গিয়ে ক্রমাগত অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন, আত্মীয়স্বজনের কাছে হেয় করেন, অনেক তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকেন। এতে সন্তান হীনমন্যতায় ভুগে এবং পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন না করতে পারলে শিক্ষর্থী হতাশ হয়ে যায়, তখন সে জীবনের সব লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে।
আজকাল প্রায়ই বলা হয়ে থাকে প্রতিযোগিতার এ যুগে ভালো ফল অর্জন করতে না পারলে জীবনে প্রতিষ্ঠা অর্জন সম্ভব নয়। অথচ এই সময়েও যাদের নিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা গর্ববোধ করি, তারা অনেকেই শিক্ষার্থী হিসেবে ব্যর্থও অদক্ষ ছিলেন। পরীক্ষাতেও মোটেও ভালো ফল অর্জন করতে পারেননি। ছাত্র হিসেবে খুব দুর্বল ছিলেন আর্লবার্ট আইনস্টাইন। ডিজনি চ্যানেলের ওয়ার্ট ডিজনি, কালজয়ী শিল্পী লিওনার্দ দ্য ভিঞ্চিও মোটেই
ভালো ছাত্র ছিলেন না।
আজকের যে প্রযুক্তিবিদ্যার কারণে সমাজ এগিয়ে গেছে, সেই প্রযুক্তি প্রসারে অনন্য অবদান রেখে যাচ্ছেন বিল গেটস। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমি স্কুলের কিছু বিষয়ে কৃতকার্য হয়েছিলাম, আমার এক বন্ধু সব বিষয়ে কৃতকার্য হয়েছিল। আমার সেই বন্ধুটি মাইক্রোসফট কোম্পানির একজন প্রকৌশলী। আর আমি মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা। আমাদের এ দেশেও এমন অনেক প্রতিথযশা ব্যক্তি রয়েছেন, যারা শিক্ষাজীবনে ভালো ফল অর্জন করতে পারেননি। আবার অনেকেই শিক্ষাজীবনে অসাধারণ ফলাফল করেও প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি। তাই সন্তানকে পড়াশোনার প্রতি অনুরাগী করে তোলার সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনের লক্ষ্য নিয়ে ভাবার সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলে সে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণের মনোযোগী হবে এবং জীবন গঠনে সফল হবে। আত্মহননের মাধ্যমে জীবনকে থামিয়ে দিয়ে কোনো সফলতা অর্জিত হয় না। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর আত্মহননের ঘটনা একটি সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। তাই এ সমস্যা সমাধানে সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে, বস্তুত দেশকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ার পথে সম্মিলিত সহযোগিতা।

গণমাধ্যমকর্মী