আদায় অনিশ্চিত ঋণঝুঁকি কমাতে লাগাম টানুন

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা কোনোভাবেই ফিরছে না। খেলাপি ঋণ যেমন বাড়ছে, একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ঋণ। বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতিও। লাগামহীন ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে খেলাপি ঋণ। এতে ব্যাংকগুলো দুরবস্থায় পড়ছে। এ বিষয়ে একটি সংবাদ গতকাল শেয়ার বিজ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।
গত বছরের ডিসেম্বরে আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ঋণ ছিল ৬৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। এ বছরের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতিও বাড়ছে। কারণ এ ধরনের ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে এলেও দেখা যাচ্ছিল চলতি বছরে তা বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪৪ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য হয়ে পড়ায় গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৫৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ আরও বেশি।
ব্যাংক খাতে এ অবস্থা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের ব্যক্তিদের দাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বেশকিছু প্রশ্নবিদ্ধ ঋণ বিতরণ করে বলে জানা গেছে। এগুলো খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। একইভাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে কিছু দাপুটে ব্যক্তিকে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছিল, তাও খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। আবার কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, সুশাসনের অভাবে ব্যাংকগুলো অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে ঋণ অনুমোদনে যথার্থতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটান। তাদের কারণে ব্যাংক এমডিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংক খাতে দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে বলেও কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে কী কারণে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি জোরদার হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর অবস্থান প্রত্যাশিত হলেও তা দৃশ্যমান নয়।
প্রকৃত বিনিয়োগকারীকে ঋণ প্রদান করা হলে তা খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। খেলাপি ঋণের হালচাল দেখে মনে করার তেমন কারণ নেই যে, প্রকৃত বিনিয়োগকারীকেই বেশি করে ঋণ জোগানো হয়েছে। ঋণ বিতরণের আগেই এ বিষয়ে যথেষ্ট খোঁজখবর নেওয়ার কথা থাকলেও তা সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে বলে মনে হয় না। অপরদিকে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ ব্যবস্থাটিও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বড় কারণ। এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ঋণের অর্থ সঠিকভাবে বিনিয়োগ হচ্ছে কি না, তাও আশানুরূপভাবে দেখা হয় না। ব্যাংকঋণ নিয়ে বিনিয়োগের বদলে মানি লন্ডারিং হচ্ছে কি না, তাও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
ব্যাংক খাতের এ বিপুল অঙ্কের আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ঋণ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পথে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ধরনের ঋণ থেকে ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা। ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে সে উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। যারা এভাবে বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করান, তাদের প্রতি ব্যাংকগুলোকে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় আদায় অনিশ্চিত ঋণসংস্কৃতি ব্যাংক ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেবে। আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণের বিষয়ে মামলা করাই যথেষ্ট নয়। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঋণগ্রহীতার পার পাওয়ার ঘটনাও কম নয়। তাই আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা; ঋণ নিয়ে পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে সে লক্ষ্য অর্জিত হবে না।