হোম প্রচ্ছদ আবারও চতুর্মুখী সংকট চাল বাজারে!

আবারও চতুর্মুখী সংকট চাল বাজারে!


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

নাজমুল হুসাইন: বেসরকারি পর্যায়ে চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে মাত্র দুই শতাংশে নামিয়েছে সরকার। এরপর থেকে বেসরকারি পর্যায়ে মাত্র দুই মাসে প্রায় আট লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। সঙ্গে সরকারও নিজস্ব মজুত ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানি করছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত মিলিয়ে ইতোমধ্যে প্রচুর চাল আমদানি হয়েছে। কিন্তু তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই দেশের চালের বাজারে। বরং এক মাস ব্যবধানেই আবারও চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।

এত উদ্যোগ ও সুবিধা বাড়ার পরে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী কেন? এমন প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব নেই কারও কাছে। আমদানিকারক, মিল মালিক ও বিভিন্ন স্তরের বিক্রেতা বলছে ভিন্ন কথা। সব মিলে এ যেন আবারও এক চতুর্মুখী সংকট। চালের মিল মালিকদের মতে, শুল্ক কমানোর ফলে মূলত আতপ ও ভারতীয় মোটা চালের আমদানি বেড়েছে। এতে সরু ও মাঝারি চালের দাম কমছে না। আর আমদানিকারকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে বাড়ছে চালের দাম। এছাড়া সরকারের বাড়তি দামে চাল কেনায় শুল্ক কমানোর সুবিধা পাচ্ছে না তারা। আর খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের পর সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে সিন্ডিকেট।

এদিকে ঈদের পর থেকেই বাড়তি দামে চাল কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। বিশেষ করে সরু চালের দাম বেড়েছে বেশি। ঈদের আগে রাজধানীর পাইকারি বাজারে মোটা চাল (ইরি/স্বর্ণা) ৪০-৪২ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৪-৪৫ টাকা। একইভাবে বিআর-আটাশ চালের কেজিতে দুই টাকা বেড়ে ৪৮-৫০ টাকা, মিনিকেট চাল কেজিতে দুই টাকা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মানভেদে নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়, যা গত এক সপ্তাহের তুলনায় দুই থেকে চার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

একই ধরনের দরবৃদ্ধির তথ্য দিয়ে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবি বলছে, বাজারে এখন সরু চাল প্রতি কেজি ৫৬-৬২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে; যা গত এক সপ্তাহ আগেও ৫২-৫৮ টাকা ছিল। এছাড়া মাঝারি মানের চাল সপ্তাহ ব্যবধানে প্রতি কেজি ৪৭-৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৮-৫২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর মোটা চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪৪-৪৬ টাকা, যা আগে ৪৩-৪৫ টাকা কেজিদরে বিক্রি হতো।

আমদানিকারকরা বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে সরকার মূলত অনেক বেশি দামে চাল ক্রয় করার কারণে বেসরকারি পর্যায়ের আমদানিকারকদের বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। তাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বিক্রেতা দেশও সেই সুযোগে দফায় দফায় বুকিং রেট বাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে করে আমদানিকারকরা শুল্ক কমানোর সুবিধা পাচ্ছেন না।

ভারতে এক মাস আগেও চালের বুকিং দর ছিল টনপ্রতি ৩৫০ থেকে ৩৫৫ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৩৯৫ থেকে ৪০০ ডলার জানিয়ে হিলি স্থলবন্দরের চাল আমদানিকারক হারুন উর রশীদ হারুন বলেন, ভারতীয় রফতানিকারকরা যে হারে দাম বাড়াচ্ছেন, তাতে শুল্ক হ্রাসের পরও সব মিলে চালের দাম বাড়ছে। বাড়তি দামে কিনে আমরা কয়েক দিন বাড়তি দামে চাল বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।

অন্যদিকে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের জাহান রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী শাহ আলম স্বপন জানান, সপ্তাহের ব্যবধানে সব চালের দর বেড়েছে প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) ১০০ টাকা। আমদানিকারক ও মিল মালিকরা এ দর বাড়িয়েছেন। ঈদের আগে-পরে ধান ও চাল আনা-নেওয়ায় বেশি ভাড়া গুনতে হয়েছে তাদের। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ দরবৃদ্ধি।

তবে রাজধানীর আরেক বৃহৎ চালের আড়ত বাবুবাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী ?আমজাদ হোসেন বলেন, ধানের মৌসুম শেষ। এখন বাজারে ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আগামী নভেম্বরের আগে নতুন ধান আসবে না। বন্যায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন সবাই সুযোগ নিচ্ছে। আমদানি ও সরবরাহের সমস্যা না থাকলেও দাম বাড়াচ্ছেন সব স্তরের ব্যবসায়ীরা। আসলে প্রকৃত কারণ এটাই।

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, খাদ্যশস্যের সম্ভাব্য আমদানি মূল্য হিসেবে ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে আমদানিযোগ্য চালের সম্ভাব্য মূল্য প্রতি কেজি ৩৪ টাকা ৯ পয়সা থেকে ৩৬ টাকা ৩৫ পয়সা পর্যন্ত হওয়ার কথা। কারণ গত জুলাইয়ে ২৮ শতাংশ থেকে চালের শুল্ক ১০ শতাংশ করার পর গত মাসে তা আবার কমিয়ে দুই শতাংশ করা হয়। প্রথম দফায় শুল্ক কমানোর পর খাদ্য অধিদফতর চালের দাম কেজিতে ছয় টাকা কমবে বলে আশা করেছিল। অবশ্য তখন দুই টাকা কমেছিল। দ্বিতীয় দফায় শুল্ক কমালেও দাম কমেনি, বরং বেড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর সঙ্গে গত কয়েক দিনে দিনাজপুর, নওগাঁ ও কুষ্টিয়ার চালের আড়তগুলোতেও চালের দাম বাড়ছে। সেসব মোকামে সরু চালের দাম কেজিপ্রতি দুই টাকা বেড়েছে। কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামে মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ৫৬ টাকায়, যা ঈদুল আজহার আগে ৫৪ টাকা ছিল। সেখানে চিকন ও মাঝারি চালের দামও কেজিতে এক থেকে দেড় টাকা বেড়েছে।

সেখানে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, মিল মালিকদের কিছুই করার নেই। দেশে সরু ধানের চরম সংকট চলছে। আর এখন ভারতের যে চাল আমদানি হচ্ছে তার সবই প্রায় মোটা। তাই চিকন চালের সংকটে চালের দাম বেড়েছে।

বছরে দেশে চালের চাহিদা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন। এর মধ্যে বোরো মৌসুমে এক কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়। কিন্তু এবার হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত বোরোতে চালের উৎপাদন ২০ লাখ টন কম হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি বন্যার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ লাখ টন চাল কম উৎপাদন হয়েছে। আর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ হেক্টর বলে গত রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী।

সরকারের খাদ্যের মজুদ কমে যাওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বা অনিশ্চয়তা দূর করতে এ পর্যন্ত সরকার ১৫ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু গত তিন মাসে আমদানি করে সরকারি গুদামে তুলতে মাত্র দেড় লাখ টনেরও কম। পাশাপাশি দেশের ভেতরে ধান-চাল সংগ্রহের কাজে খাদ্য মন্ত্রণালয় ভয়ানক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। ফলে সরকারি খাদ্যগুদামে চালের মজুত বাড়ছে না। সেই সুযোগে চালের বাজারে সিন্ডিকেট বারবার মাথাচাড়া দিচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যশস্য পরিস্থিতির তথ্যে, এ পর্যন্ত সরকারি গুদামে মোট মজুদ তিন লাখ ২৫ লাখ টন। চলতি অর্থবছরে (২০১৭-১৮) গত ০৬ সেপ্টেম্ব^র পর্যন্ত সরকারি খাতে এক দশমিক ৪৮ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ দুই লাখ ৫২ হাজার ৩৩৯ টন বোরো চাল (সিদ্ধ ও আতপ) এবং চার হাজার ৮২ টন ধান।