আবারও হতাশ করল ইসলামী ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইসলামী ব্যাংক বরাবর বিনিয়োগকারীদের ভালো মুনাফা দিয়েছে। মুনাফা ঘোষণার সময় তারা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিষয়টি মাথায় নিয়েছে। এ কারণে ১৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ দিয়েছে ব্যাংকটি। কিন্তু গত বছর অতীতের সব রীতি লঙ্ঘন করে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এবারও এ ধারা অক্ষুণœ রেখে হতাশ করেছে বিনিয়োগকারীদের।
জানা গেছে, সক্ষমতার অভাবেই ইসলামী ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ বাড়াতে পারেনি। ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতেও ইসলামী ব্যাংকের বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তবে মাত্র ১৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের এ অবনতিতে হতাশ বিনিয়োগকারীরা।
গতকাল অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় ২০১৭ সালের জন্য বিনিয়োগকারীদের নগদ ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। আগামী ২৫ জুন বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই সভায় তা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অনুমোদন করা হবে।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকের লভ্যাংশ ঘোষণা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দর আরও কমিয়ে আনতে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিনা। তারা ইসলামী ব্যাংকের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় তারা সংশয় প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, মাত্র ১৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের এমন অবস্থা হওয়ার কথা নয়।
ঢাকার বিনিয়োগকারী মহসীন আলী শেয়ার বিজকে বলেন, গত বছর ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ১৫ টাকা কমেছিল। এ বছর দর সেভাবে কমলে বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ইসলামী ব্যাংকের লভ্যাংশ দেওয়া উচিত ছিল। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একজন বিনিয়োগকারী বলেন, ঘোষিত লভ্যাংশ ব্যাপকভাবে হতাশ করেছে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, যেখানে বরাবরই ব্যাংকটি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফা করে আসছে, সেখানে এমন লভ্যাংশ ঘোষণা বাজারের প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ বিনিয়োগকারীকে এক ধরনের বঞ্চিত করার শামিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মালিকানা পরিবর্তনসহ বেশকিছু কারণে ইসলামী ব্যাংকের ওপর গ্রাহক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে। এ পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ব্যাংকটি আরও পিছিয়ে পড়বে। পুঁজিবাজারের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়বে। বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকটির লভ্যাংশের হার না বাড়া দুঃখজনক বলেও মনে করছেন তারা।
তবে লভ্যাংশের হার না বাড়ার কারণ সম্পর্কে ইসলামী ব্যাংকের সদ্য পদত্যাগী চেয়ারম্যান আরাস্তু খান এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে ‘আমি এখন আত্মীয়ের বাড়িতে আছি’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। একইভাবে ব্যাংকটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিব এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
১৯৮৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও পরের বছরগুলোয় কমবেশি বেড়েছে কোম্পানিটির লভ্যাংশ। ২০০০ সালের পর কখনও তা ২০ শতাংশের নিচে নামেনি। ২০১০ সালে তা সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশে পৌঁছায়। এছাড়া ডিএসই থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৩ থেকে ২০১৩ সালের অন্য বছরগুলোয় ইসলামী ব্যাংক ঘোষিত লভ্যাংশ ছিল ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে। এর মধ্যে বেশিরভাগ অর্থবছরে ২৫ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা করে ব্যাংকটি। সর্বশেষ ২০১৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির লভ্যাংশের হার ছিল ২০ শতাংশ নগদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর দিকে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে। প্রত্যাশা পূরণ না হলে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। যার প্রভাব বাজারের লেনদেনের ওপরও পড়ে। তাই কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার সময় এ দিকগুলো বিবেচনায় নিতে হয়। ইসলামী ব্যাংকের লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য আমি এখনও পাইনি। এ নিয়ে কোনো মন্তব্যও করতে চাই না।’
ব্যাংকের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৬ সালে ব্যাংকটি কর-পরবর্তী মুনাফা করেছিল ১৫১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ওই হিসাববছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিয়েছিল ১০ শতাংশ। এ ঘোষণার পরই ৪৬ টাকায় থাকা ব্যাংকের শেয়ারদর এক পর্যায়ে ২৬ টাকায় নেমে যায়। এর প্রভাবে পুরো ব্যাংক খাতসহ পুঁজিবাজারে ধস নেমে আসে।
সূত্রমতে, সর্বশেষ হিসাবে ইসলামী ব্যাংকের কাছে বর্তমান মোট আমানত রয়েছে ৭৬ হাজার ৪৯৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬৭ হাজার ৫৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা মুদারাবা হিসাবে ও অবশিষ্ট প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার আমানত কোনো প্রকার খরচ ছাড়া সংগ্রহ করেছে। এর বিপরীতে ব্যাংকটি ঋণ দিয়েছে ৭৭ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। যার মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগ হয়েছে ৭৪ হাজার ৮৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকার। অন্যদিকে শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে বাকি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার।