আবাসনে রাজস্বের হার যৌক্তিক করুন

বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন করারোপের কারণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন মধ্যবিত্তরা। এতে এ খাতের উদ্যোক্তারা গ্রাহক হারাচ্ছেন; তাদের কারও কারও ব্যবসা হয়ে আসছে সংকুচিত। এ পরিস্থিতি খাতটির জন্য উদ্বেগের। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিশেষত ব্যাংকঋণ নিয়ে যারা আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাদের দুশ্চিন্তা বাড়বে বৈকি। ঋণখেলাপিও হয়ে পড়তে পারেন কেউ কেউ। খাতটি ঘিরে কর্মসংস্থান কমে এলে তার প্রভাব পড়বে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি)। উচ্চ করহারের কারণে আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে উদীয়মান নগরীগুলোয় বিশেষ করে বাসস্থান সংকট প্রকট হতে পারে। এদিকে মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একতলা-দোতলা বাড়ি গড়ে তোলার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কৃষিকাজ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য জমি হ্রাস পাবে। এ কারণেও বিষয়টির প্রতি নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়া দরকার। বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে করহার যৌক্তিকীকরণে তাই নেওয়া চাই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

বর্তমানে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে মোট ১৪ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হয় সংশ্লিষ্টদের। আবাসন খাতের উদ্যোক্তাদের দাবি, এক্ষেত্রে করের এত উচ্চ হার আর কোনো দেশে নেই। এ বক্তব্য খতিয়ে দেখা দরকার। বস্তুত ব্যয়বহুল সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে উচ্চ হারে করারোপ করা হলে প্রায় সব গ্রাহকের মধ্যে এটি ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে দাম কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা এ কারণেই বেড়ে উঠেছে বলে মনে হয়। এর হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা গেলে এ প্রবণতা কিছুটা হলেও কমানো যাবে। এতে রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে, তেমনি গতিশীলতা আসবে খাতটির ব্যবসায়। সার্বিকভাবে জিডিপিতে আবসান খাতের অবদান বাড়াতে গেলে করহার যৌক্তিকীকরণের বিষয়টি ভাবতে হবে সঙ্গত কারণেই।

শেয়ার বিজের গতকালের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশে ফ্ল্যাট ক্রয়ে নিবন্ধন ব্যয় চার থেকে ছয় শতাংশের মধ্যে। বাংলাদেশেও তা একই পর্যায়ে রাখা গেলে এর প্রতি মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা আকৃষ্ট হবেন বলে আশা করছেন খাতটির উদ্যোক্তারা। এটা যে যৌক্তিক, তাতে সন্দেহ নেই। মনে রাখা ভালো, বাস্তব কিছু কারণে সারা জীবনের সঞ্চয় জমিয়েও ফ্ল্যাট কেনার প্রবণতা বেড়ে উঠেছে বিশেষত চাকরিজীবী মধ্যবিত্তের মধ্যে। এটাও এ খাতের বিকাশের সম্ভাবনা ইঙ্গিত করে। গৃহনির্মাণ বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য বিতরণ করা ঋণে বেশ কিছু ব্যাংক সুদের হার নামিয়ে এনেছে এক অঙ্কে। এ অবস্থায় করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা না হলে সুদের হার কমিয়ে ব্যাংক খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগেও কাক্সিক্ষত ফল মিলবে বলে মনে হয় না।

উদীয়মান অর্থনীতিতে ভোক্তা খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধিকে অনেক সময় নিরুৎসাহিত করা হয়Ñশিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য। এজন্যও আরোপ করা হয় উচ্চ হারে কর। বাংলাদেশেও শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এ ধরনের কাঠামোগত বাধা তৈরির পরামর্শ দিয়ে থাকেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তবে এ দেশের বাস্তবতায় মনে রাখা ভালো, এখানকার ব্যাংক খাতে রয়েছে বিপুল অলস অর্থ। জ্বালানিসহ অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে, তাতে শিল্প খাতে বিনিয়োগ সহসা বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এ অবস্থায় ফ্ল্যাট ক্রয়ে নিবন্ধন ফিসহ করের হার কমানো গেলে তারল্য ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান সংকটের কিছুটা হলেও সমাধান হবে। এতে অলস অর্থ বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্রও সৃষ্টি হবে বলে মনে হয়। তবে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আশায় অবকাঠামোগত সমস্যা দূর না করে ভোক্তা খাতে কাঠামোগত বাধা বিদ্যমান রাখা হলে তাতে ভোক্তা বা শিল্প খাতÑকোনোটারই উপকার হবে না। নীতিনির্ধারকদের এটা বোঝা দরকার।