আবুল খায়ের গ্রুপ ১৮ ব্যাংকে ঋণ আছে সাত হাজার ৭৮ কোটি টাকা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম : আবুল খায়ের গ্রুপ ভোগ্যপণ্য, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, মার্বেল, শিপিং ও ট্রেডিং ব্যবসায় অপ্রতিরোধ্য। আর এসব ব্যবসা পরিচালনায় ঋণ গ্রহণেও অপ্রতিরোধ্য এ গ্রুপ। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শাহজালাল, ঢাকা, এনসিসি, উত্তরা, আল-আরাফাহ্ ইসলামী, মিডল্যান্ড, ট্রাস্ট, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, প্রাইম, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, মেঘনা, ব্র্যাক, মার্কেন্টাইল, ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবিএল, সোশ্যাল, ন্যাশনাল ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় সাত হাজার ৭৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আর এসব ব্যাংকে শীর্ষ ঋণ গ্রহীতার তালিকায় আছে গ্রুপটি।
গ্রæপ সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৩ সালে বিড়ি ব্যবসায়ী আবুল খায়েরের হাত ধরে আবুল খায়ের গ্রæপের যাত্রা। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় আবুল বিড়ি কোম্পানি থেকেই এই গ্রæপের ব্যবসা শুরু। ১৯৭৮ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়ের মারা যান। এরপর একে একে গ্রæপে যোগ হয়েছে এক ডজনের বেশি মাঝারি ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আবুল খায়েরের উত্তরসূরিরা গড়ে তুলেছেন স্টিল মিল, সিমেন্ট কারখানা, চা বাগান, ডেইরি প্রোডাক্টসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৩ সালে আবুল খায়ের গ্রæপ স্টারশিপ কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে দুগ্ধ খাতে নাম লেখায়। এরপর ১৯৯৬ সালে যোগ হয় স্টারশিপ ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার। ১৯৯৭ সালে আসে মার্কস ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার। আর সিলন চা নিয়ে বাজারে আসে ২০০৪ সালে। দেশের সিমেন্ট খাতের বেশিরভাগ চাহিদা পূরণে সক্ষম আবুল খায়েরের প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেন্ট। ১৯৯৩ সালে আবুল খায়ের গরু মার্কা ঢেউটিন দিয়ে ইস্পাতশিল্পে নাম লেখায়। কয়েক বছর আগে তারা বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে একেএস টিএমটি ৫০০ডবিøউ ইস্পাতের রড উৎপাদনে।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী এ গ্রæপের ভোগ্যপণ্য, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, মার্বেল, শিপিং, ট্রেডিং প্রভৃতি ব্যবসা আছে। আর এসব ব্যবসা পরিচালনা করতে গত বছর ১৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে গ্রæপটি ঋণ নেয় সাত হাজার ৭৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ঋণ আছে ৩১৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, ঢাকা ব্যাংকে ২৪৭ কোটি ৫৭ লাখ ৮২ হাজার টাকা, এনসিসি ব্যাংকে ৩৪৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, উত্তরা ব্যাংকে ৪২৭ কোটি ৬৩ লাখ ১০ হাজার ২৫৯ টাকা, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে ৫৫৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, মিডল্যান্ড ব্যাংকে ৩৬ কোটি ৫৯ লাখ চার হাজার ৫৯০ টাকা, ট্রাস্ট ব্যাংকে ২৯৫ কোটি ৫৭ লাখ দুই হাজার ৯০৪ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ১৪৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, প্রাইম ব্যাংকে ৪৪৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ২৯৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, মেঘনা ব্যাংকে আট কোটি দুই লাখ টাকা, ব্র্যাক ব্যাংকে ৬৯২ কোটি ৯৬ লাখ ছয় হাজার ৮৫ টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ৭৩৬ কোটি ৮১ লাখ ৯০ হাজার টাকা, ইসলামী ব্যাংকে ৯৬৬ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা, ইউসিবিএল ব্যাংকে ৭৩২ কোটি ছয় লাখ টাকা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে ২০৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যমুনা ব্যাংকে ৩৩৪ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংকে ২৮৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, যা সব ব্যাংকের আর্থিক বিবরণ ২০১৭-তে পাওয়া যায়।
ব্যাংকগুলোতে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আবুল খায়ের গ্রূপের ঋণ ছিল ৬ হাজার ৭৪৮ কোটি দুই লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১৮ ব্যাংকে গ্রূপটির ঋণ বেড়েছে ৩৩০ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে জানার জন্য একাধিকবার আবুল খায়ের গ্রূপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সায়েদ চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র ব্যাংকাররা বলেন, অল্প কিছু বড় গ্রাহকের কাছে জিম্মি হয়ে আছে দেশের ব্যাংক খাত। এসব গ্রাহকের ভালো-মন্দের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে দেশের অনেক ব্যাংকের ভাগ্যও। ঝুঁকিপূর্ণ এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উৎপাদনমুখী এসএমই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে এলেও ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলো এখনও বড় গ্রাহকদের পেছনেই ছুটছে। এতে দেশের ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ৫৭ শতাংশই বড় ঋণ।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি এবং ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, বড় বড় গ্রাহকের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। ফলে বড় গ্রাহকের ঋণ গ্রহণের পরিমাণও বাড়ছে। আর আগে বড় কিছু গ্রাহকের কারণে ব্যাংক খাতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গ্রাহককে ভালোভাবে মনিটরিং করতে হবে। আর মামলা হলে তা দ্রæত গতিতে নিরসনের জন্য কাজ করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবনায় ছিল এসএমই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মেনে তো আমাদের বিনিয়োগ করতে হয়। এখন এসএমই খাতে ভালো বিনিয়োগ হচ্ছে।