আমরাই বাংলার উত্তরাধিকারী

কাজী সালমা সুলতানা: ১৯৫৪ সালকে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও ভাষা আন্দোলনের ব্যাপক পট পরিবর্তনের বছর হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সে সময় এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ বৃহত্তর প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের নিন্দা জ্ঞাপন করে। নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তফ্রন্ট যেন আন্দোলনের আর কোনো সুযোগ না পায়, সেজন্য মুসলিম লীগ তাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। সেজন্য তারা ভাষা আন্দোলন দিবসের আগে যুক্তফ্রন্টের একাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতারও করে। অন্যদিকে ভাষাসংক্রান্ত বিষয়ের অচলাবস্থা নিরসনের উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগের সংসদীয় কমিটির একটি সভা করাচিতে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী এবং সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বাংলা ভাষাকে উর্দু ভাষার সমমর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রভাষা করা হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের ছয়টি ভাষাকে একই মর্যাদা দেওয়ার দাবি তোলেন সেখানকার প্রতিনিধিত্বকারীরা। বাবা উর্দু নামে পরিচিত আবদুল হক এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। তার নেতৃত্বে ২২ এপ্রিল করাচিতে এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করা হয়। প্রায় এক লাখ মানুষ মিছিলে অংশ নেন ও মুসলিম লীগের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। সেখানে সহিংস ঘটনায় সিন্ধি ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক আল ওয়াহিদ পত্রিকার অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ২৭ এপ্রিল বাংলা ও অন্যান্য ভাষাকে সমমর্যাদা দেওয়ার দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সংখ্যালঘু উর্দুভাষী যারা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছিলেন, তাদের মানসিকতার তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়।
যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে বাংলা একাডেমি গঠন করে। এ প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, গবেষণা ও মানোন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবে বলে গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মালিক গোলাম মাহমুদ ১৯৫৪ সালের ৩০ মে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার বাতিল ঘোষণা করেন। ১৯৫৫ সালের ৬ জুন যুক্তফ্রন্ট পুনর্গঠন করা হলে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিপরিষদে যোগ দেয়নি।
১৯৫৬ সালে প্রথমবারের মতো সরকারের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়। শহিদমিনার নতুনভাবে তৈরি করার লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে পাকিস্তানের গণপরিষদে কার্যক্রম পাঁচ মিনিট বন্ধ রাখা হয়। দেশব্যাপী পালিত হয় শহিদ দিবস এবং বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। আরমানীটোলায় এক বিশাল সমাবেশের নেতৃত্ব দেন মওলানা ভাসানী।
১৯৫৪ সালের ৭ মে মুসলিম লীগের সমর্থনে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি।
সংবিধানের ২১৪(১) অধ্যায়ে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে লেখা হয়:
২১৪.(১) ) The state language of Pakistan shall be Urdu and Bengali. . (উর্দু ও বাংলা হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।)