‘আমরা বহু হাইটেকের ওষুধ বানাতে পারি’

বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির মহাসচিব এসএম শফিউজ্জামান। হাডসন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছে ওষুধশিল্পের সাংগঠনিক কার্যক্রম। সম্প্রতি সমিতির নিজস্ব কার্যালয়ে ওষুধশিল্প সম্পর্কে নিজের ভাবনা জানিয়েছেন শেয়ার বিজকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোবারক হোসেন আমাদের তৈরি ওষুধ উন্নত দেশগুলোয় রফতানি হয় এটা সত্যি গর্বের। এ বিষয়ে বলুন…

এসএম শফিউজ্জামান: বাংলাদেশের লোকসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। ১৭ কোটি মানুুষের ৯৮ শতাংশ ওষুধ আমরা তৈরি করি। ১৬ কোটি বলেন আর ১৭ কোটি, আমরা সবাই দেশের ওষুধ খেয়ে অসুস্থতা কাটিয়ে উঠি। একই সঙ্গে বিশ্বের ১৫০টি দেশে ওষুধ রফতানি করি এবং প্রত্যেক বছর ডবল ডিজিট গ্রোথ আসে। মজার বিষয় হলো, গত বছর আমাদের দুটো কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে। একটা কোম্পানির তিন-চারটা কনসাইনমেন্ট অলরেডি পাঠিয়ে দিয়েছে। একটা কোম্পানি প্রসেসে আছে। আমার মনে হয়, এ বছর যেকোনো সময়ে রিকারেজ করতে পারবে। অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে কানাডা পর্যন্ত যে ওষুধগুলো আমরা রফতানি করি এটা কাগজও নয়, রেডিমেড গার্মেন্টসও নয়, টি-শার্টও নয়। যেহেতু এগুলো হাইলি টেকনিক্যাল জিনিস, ওই উদ্দেশ্যে আমাদের কাগজপত্র জমা দিতে হয়। কাগজপত্র জমা দিলে আমাদের কাছে স্যাম্পল চাইবে। এই স্যাম্পলগুলো তারা টেস্ট করবে। টেস্ট করার পর তারা সন্তুষ্ট হলে চিফ ইন্সপেক্টরসহ পাঁচ থেকে সাতজনের একটা টিম পাঠায়। তারা এসে সরেজমিনে যেসব কোম্পানি কাগজপত্র জমা দিয়েছে, ওইসব কোম্পানিতে ভিজিটে আসে। তাদের রিপোর্টের পর যদি আরও কোনো অবজার্ভেশন থাকে, তাহলে আমরা আরও কিছু তথ্য দিই। এরপর এক থেকে চার-পাঁচ বছর লাগে রেজিস্ট্রেশন পেতে। এক কথায় হলো ওই দেশের চাহিদা অনুযায়ী সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে আমাদের এক্সপোর্ট শুরু হয়। ধীরে ধীরে পরিচিতি পায়। আমাদের এজেন্ট ঠিক করতে হয়। ওই দেশের মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ ঠিক করতে হয়। তারা আমাদের ওষুধ প্রমোশন করে ডাক্তারদের কাছে। ডাক্তাররা যদি খুশি হন, তা হলে ওষুধগুলো লেখেন। এটা বাংলাদেশের জন্য মর্যাদার। স্বাধীনতার পর যত অর্জন হয়েছে, তার মধ্যে এটা একটা বড় অর্জন। বিষয়টি সরকারের জন্য যেমন অহঙ্কারের, তেমনি সাধারণ মানুষের জন্যও।

বাংলাদেশ কত সালে ওষুধ রফতানি শুরু করে?

এসএম শফিউজ্জামান: ’৭০-এ পাকিস্তানের নির্বাচনের পরে দেশে দু-চারটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ছিল। তখন ছোট আকারে কিছু কোম্পানি তৈরি করা হয়। উল্লেখযোগ্য হলো পাবনার নেপচুন, বগুড়ার ডক্টরস, দিনাজপুরের বেঙ্গল টেকনো, বরিশালের অপসোনিন এবং ঢাকায় ছিল ফার্মা স্বাধীনতার পরে নাম হয় ফার্মাদেশ। তখন রফতানির সুযোগই ছিল না। ১৯৮২ সালের ওষুধনীতি ওষুধশিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
হাই-টেকনোলোজির ওষুধ বিদেশি কোম্পানি করবে, আর লো-টেকনোলোজিরটা লোকাল কোম্পানি করবে। মূল থিম ছিল এটা। তারা চেষ্টা করেছে হাই-লো সবই বানাবে, কিন্তু ওষুধনীতির কারণে পারেনি। এটা হওয়ার পর ধীরে ধীরে লোকাল কোম্পানিগুলো প্রতিষ্ঠা পায়। মজার কথা হলো, এখন বহু হাইটেকের ওষুধ আমরা বানাতে পারি এবং আমি গর্বের সঙ্গে বলি, বাংলাদেশে টোটাল যে ওষুধের গ্রাহক, এক থেকে দশ পর্যন্ত বিদেশি কোম্পানির ওপরে সবখানে, দশের পরে হয়তো তারা। আরও মজার কথা, বাংলাদেশের যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো, এগুলোর সব এমডি বাঙালি। বিদেশি এমডি খুব এক্সপেনসিভ। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা অনেক ভালো। আপনার নিশ্চয়ই শুনে ভালো লাগবে, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতেও আপনার দেশের লোকেরা ওষুধ তৈরি করে।

ওষুধ আমদানিকারক দেশগুলোর নাম কী?

এসএম শফিউজ্জামান: অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ইজ আন্ডার প্রসেস, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ আরও অনেক দেশ।

আমাদের কতটি কোম্পানি ওষুধ রফতানি করছে? উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কোম্পানির নাম যদি বলেন…

এসএম শফিউজ্জামান: স্কয়ার, বেক্সিমকো, জেনারেল, অ্যারিস্টো ফার্মা, অপসোনিন, ইনসেপ্টা, এসকেএফ, ইউনিমেড, বীকন প্রভৃতি।

বর্তমানে ওষুধশিল্পের বিদেশি বাজার কত বিলিয়ন ডলারের?

এসএম শফিউজ্জামান: একটা উদাহরণ দিই। সারমা, এই ট্যাবলেটের দাম এক হাজার ডলার। সেই ওষুধ আমরা বিক্রি করি ছয় ডলারে। যদি কোনো দেশের ওষুধ এক্সপেনসিভ হয়, আর এটা যদি ওয়ার্ল্ডের কোনো দেশে পাওয়া যায়, আর যদি ওষুধটা রোগী সম্মান প্রদর্শন করে খেতে চায়, তাহলে রফতানির পরিসীমা বাড়ে। বীকন ফার্মা ডেইলি চার-পাঁচ হাজার ডলারের ক্যানসারের ওষুধ পোস্ট অফিসের মাধ্যমে রফতানি করে। তা-ও ডলারের ডিডি এলে তারপর ওষুধ পাঠায়। আশা করি দু-তিন বছরের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা হবে।

বিশ্বের ওষুধের বাজারে রফতানি বাড়ানোর জন্য প্রতিবন্ধকতাগুলো কী?

এসএম শফিউজ্জামান: আমরা যেখানেই যাই না কেন, আমাদের ফাইট করতে হয় প্রতিবেশী একটা দেশের সঙ্গে। এরা আবার স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ তৈরি করতে পারে, সাব-স্ট্যান্ডার্ড ওষুধও তৈরি করতে পারে; তবে সাব-স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ তৈরি করে বেশি। পৃথিবীর যত সাব-স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ তৈরি হয়, তার কমপক্ষে ৩৫ শতাংশ উৎপাদন তাদের। আমরা পৃথিবীর যেখানেই যাই না কেন মানসম্পন্ন ওষুধের জন্য হিরো হয়ে যাই, মাদার তেরেসা হয়ে যাই। আমাদের ওষুধ খেয়ে তারা হ্যাপি এবং আমাদের মাদার তেরেসার সঙ্গে তুলনা করা হয়। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যদি প্রশ্ন করা হয় কোন দেশের ওষুধ ভালো? এককথায় উত্তর আসবে বাংলাদেশের। যদি আমাদের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া না থাকত, আমরা আরও এগিয়ে যেতাম। রেজিস্ট্রেশন থাকার বদৌলতে আমরা পিছিয়েছি। তার পরও সরকার এই প্রথম ২০ শতাংশ ইনটেনসিভ দিয়েছে ওষুধ রফতানি আয়ের ওপর। আইপিই বা কাঁচামাল, বানানো শুরু করিনি। এটার ওপর ইনটেনসিভ দিচ্ছে ৫০ শতাংশ। আমরা যদি রফতানি করি তাহলে ২০ শতাংশ ইনটেনসিভ পাব।

দেশে নিম্নমানের কিছু ওষুধ কোম্পানি এ শিল্পের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করছেÑএ বিষয়টা যদি বিশ্লেষণ করেন?

এসএম শফিউজ্জামান: আলোর নিচে অন্ধকার। কিছু কোম্পানি ভেজাল তৈরি করে। ওষুধ বানায়, না মদ বানায়, না ফেনসিডিল বানায় ওপরওয়ালা জানে। আমাদের উচিত যে কোম্পানিগুলো সাব-স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ তৈরি করে বা আমার ওষুধটা নকল করে, তাদের সুদৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করা।

ওষুধশিল্পের প্রসারে আর কী কী পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে?

এসএম শফিউজ্জামান: অনেক পরিকল্পনা আছে। বিশেষ করে ওষুধের কাঁচামাল নিয়ে। অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে সরকার ঢাকা-চট্টগ্রামে ২০০ একর জমি ওষুধের কাঁচামাল তৈরির জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। আমরা উন্নয়নে যাচ্ছি।

এটা কি মুন্সীগঞ্জের মধ্যে?

এসএম শফিউজ্জামান: মুন্সীগঞ্জের আন্ডারে। এটার সুবিধাটা আমরা কাজে লাগাতে চাই সরকারের সূত্রে। এজন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি। অলরেডি ইলেকট্রিসিটি এসে গেছে, পানি এসে গেছে, গ্যাস কাছাকাছি চলে এসেছে। দু-একটা কোম্পানি মাটি ভরাট শুরু করেছে। এ মাসের মধ্যে আরও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখবেন।

ওষুধশিল্প নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ চিন্তা…

এসএম শফিউজ্জামান: আগে যারা বিশ্বাসই করত না, এখন তারা সমীহ করে। সারা বিশ্ব জানে বাংলাদেশে উন্নতমানের ওষুধ তৈরি হয়। এদেশের ফার্মাসিউটিক্যালের নাম শুনলে মানুষ সুনাম করে।