বাণিজ্য সংবাদ

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এগোচ্ছে না অ্যান্টি মানি লন্ডারিং শাখা

অর্থ পাচার রোধে পদক্ষেপ গ্রহণ

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: ব্র্যান্ড নিউ যন্ত্রপাতি ঘোষণায় ৬৬ লাখ ৯৪ হাজার শলাকা সিগারেট আমদানি করে রাজধানীর মতিঝিলের মেসার্স এন ইসলাম এন্টারপ্রাইজ, যা গত বছরের ৬ মে কায়িক পরীক্ষায় চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের হাতে জব্দ হয়। কাছাকাছি সময়ে পুরানা পল্টনের গ্রামবাংলা ফুড করপোরেশন নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ফেল্ট ঘোষণায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি সিগারেট আমদানি করে। কিন্তু মিথ্যা ঘোষণায় সিগারেট আনলেও প্রকৃতপক্ষে আমদানির আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে প্রতিষ্ঠান দুটি, এমনই চিত্র উঠে আসে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্ত প্রতিবেদনে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারছে না কাস্টমসের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং শাখা।
ব্যাংক এশিয়ার উত্তরা শাখা থেকে গ্রাম বাংলা ফুড করপোরেশন ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় অস্তিত্বহীন গ্রাহক প্রতিষ্ঠন মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজ প্রায় ১২ কোটি টাকা মূলের পণ্য আমদানি করে। দুটি আলাদা ব্যাংকের ভিন্ন শাখায় দুই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ১২ কোটি টাকার পৃথক দুটি এলসি করে একই তারিখে। যার সরবরাহকারীও সিঙ্গাপুরের একই প্রতিষ্ঠান। ফলে উভয় আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং এলসির মার্জিন হিসেবে অর্থ জমা প্রদানকারীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগসাজশ কয়েছে বলে ধারণা করছে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং শাখা। তাই প্রাথমিক তথ্যে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে মুদ্রা পাচার করেছে।
এরপর চলতি মাসে চীন থেকে এক হাজার সাত পিস হুইল চেয়ার, ৪৫০ পিস ক্রাস প্ল্যাস ওয়াকার আমদানির ঘোষণা দিয়ে তিনটি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে আনে ঢাকার লোটাস সার্জিক্যাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শুধু একটি কন্টেইনারে ৪০টি হুইলচেয়ার পাওয়া গেলেও বাকি দুটিতে পাওয়া গেছে প্যাকেট ভর্তি ইট। যা শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় এ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে।
কাস্টম কর্মকর্তাদের ধারণা পণ্য আমদানির আড়ালে বিদেশে মুদ্রা পাচার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আমদানিকারকের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। শুধু লোটাস সার্জিক্যালই, মেসার্স এন ইসলাম এন্টারপ্রাইজ ও গ্রাম বাংলা ফুড করপোরেশন নয়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে পণ্যের আড়ালে টাকা পাচার হচ্ছে। অতীতে মুদ্রা পাচার আইনে একাধিক মামলা হলেও আলোর মুখ দেখেনি।
গত কয়েক বছরে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় গত বছর পাচার রোধে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং শাখা চালু করা হয়। দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মাধ্যমে গত বছরের নভেম্বরে ওই শাখার কার্যক্রম শুরু হওয়ার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। মিথ্যা ঘোষণায় বিদেশি সিগারেট আনার অপরাধে দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন কাস্টম কমিশনার ড. একেএম নুরুজ্জামান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই শাখার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। উল্টো তৎকালীন অডিট ইনভেস্টিগেন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার উপ-কমিশনারকে বদলি করলে সামগ্রিক কার্যক্রম থমকে যায়। এমনকি এআইআর শাখার কাজ অনেকটা স্তিমিত হয়। অবসরে যাওয়া দুই কর্মকর্তার পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে প্রায় চার হাজার চালান খালাস নেওয়ার ঘটনায় চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার নুরুজ্জামানকে বদলি করা হয়।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম কমিশনার মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, জনবল ও স্থান সংকটের কারণে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং শাখার কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না।
তবে বর্তমান অ্যান্টি মানিল্ডারিং শাখা প্রধান ও তৎকালীন অডিট ইনভেস্টিগেশন ও রিচার্স (এআইআর) শাখার উপকমিশনার নুর উদ্দিন মিলন শেয়ার বিজকে বলেন, মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের অনুমতির প্রয়োজন। তাই গত মাসে দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও অনুমতি পাওয়া যায়নি। অনুমতি পেলেই মামলা দায়ের করা হবে। গত বছর মানি লন্ডারিং মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তখন বিধি প্রকাশ হয়নি। তাই বিধি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ আইনে মামলা না করার পরামর্শ দেন এনবিআর চেয়ারম্যান। চলতি বছরের মার্চে বিধি প্রকাশ হওয়ার পর শাখার কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া আরও ১০টি প্রতিষ্ঠানের মামলা নিয়ে কাজ করছে এন্টি মানিল্ডারিং শাখা।
জানা যায়, পণ্য আমদানির নামে বৈধ এবং অবৈধ চ্যানেলে বিদেশে মুদ্রা পাচার হয়। এর মধ্যে কম মূল্যের পণ্য বেশি দাম দেখিয়ে ব্যাংকে এলসির মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয়। আবার বেশি দামের পণ্য কম মূল্য দেখিয়ে আমদানি করে। বেশি দামের পণ্যের ক্ষেত্রে কম দাম দেখালে কাস্টমসের শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হয় কম। পণ্যের বাকি টাকা পাঠানো হয় হুন্ডির মাধ্যমে। মুদ্রা পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রটি উভয় পদ্ধতি অনুসরণ করে।

সর্বশেষ..