‘আমাদের দেশে এইচআর নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ আছে’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইওর সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড প্রিন্সিপাল (রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) ফাহমিদা চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

ফাহমিদা চৌধুরী সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড প্রিন্সিপাল (রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের লাইফ ফেলো, জেনারেল সেক্রেটারি ও এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল মেম্বার

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার পেছনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

ফাহমিদা চৌধুরী: গল্পটা শুরু করতে চাই আমার মাকে দিয়ে। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় পড়ালেখায় বেশি দূর এগোতে  পারেননি। তাই তার সব আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে আমাকে বড় করেছেন। কর্মজীবনে প্রবেশ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। যা তিনি পারেননি, তা আমার কাজের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা দিতে চেষ্টা করেছেন।

১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে লেকচারার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করি। পরে সহযোগী অধ্যাপক হই। ওই প্রতিষ্ঠানে ২০১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কাজ করেছি। এরপর সাউথইস্ট ব্যাংকে যোগ দিই। চাকরির পাশাপাশি লেখালেখি করি। পিএইচডি করছি ‘ওমেন এন্টাপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ এর ওপর।

 

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ (এইচআর) ব্যবস্থাপনাকে কেন বেছে নিলেন?

ফাহমিদা চৌধুরী: আমি মানুষকে জানতে পছন্দ করি। তার মধ্য থেকে ভালো কিছু বের করে আনতে আনন্দ পাই। যা মানুষের নেশা, তা-ই যদি তার পেশা হয়, তাহলে মন্দ কী? আমাদের দেশে এইচআর নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। আমার মনে হয়েছে, এইচআর থিওরিগুলো শুধু বইপুস্তকে না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে লাগালে লেখাপড়ার সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ এইচআরের ভূমিকা সম্পর্কে বলুন

ফাহমিদা চৌধুরী: একটি প্রতিষ্ঠানের হৃৎপিণ্ড হচ্ছে মানবসম্পদ বিভাগ। এ বিভাগের কর্মীকে অবশ্যই দক্ষ হতে হবে। তাহলে বিভাগটি সুস্থ প্রতিষ্ঠানের ধারক হিসেবে গণ্য হবে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের সব সম্পদের মধ্যে মানবসম্পদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ মূল্যবান সম্পদ অদক্ষ হাতে পরিচালিত হলে তা কখনোই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। এ কারণে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ এইচআরের বিকল্প নেই।

শেয়ার বিজ: ব্যাংকিং খাতে কর্মী নিয়োগের পর তাদের দক্ষ করে তুলতে কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়?

ফাহমিদা চৌধুরী: মানবসম্পদ বিভাগের সব কাজই চ্যালেঞ্জিং। কর্মী নিয়োগও এর ব্যতিক্রম নয়। ব্যাংকে নানা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে কর্মীরা আসেন। প্রাথমিক অবস্থায় তাদের দক্ষ করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। পরের চ্যালেঞ্জ জব রোটেশন। আমাদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জব রোটেশনের জন্য পর্যাপ্ত সময় আর ইচ্ছা দরকার। এর দুটোর মধ্যে যথেষ্ট ঘাটতি আছে। ফলে দক্ষতা চারদিকে বিস্তৃত না হয়ে বিশেষায়নের দিকে ধাবিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি ও উচ্চ পর্যায়ে দক্ষকর্মী গঠনের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে।

শেয়ার বিজ: মধ্যম পর্যায়ে দক্ষ কর্মী থাকলেও উচ্চ পর্যায়ে দক্ষ নির্বাহী বা নেতৃত্বের অভাব লক্ষ করা যায় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

ফাহমিদা চৌধুরী: প্রতিষ্ঠানকে সাধারণভাবেই একটি পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। উপরের দিকে লোকবল কম থাকে, এটাই স্বাভাবিক। নেতৃত্ব তৈরি হয় একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। যদি মিড লেভেলে দক্ষ কর্মী থাকে ও প্রতিষ্ঠানটি সঠিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়, তাহলে লিডারশিপের অভাব হওয়ার কথা নয়। এক্ষেত্রে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন।

 শেয়ার বিজ: ব্যাংকিং খাতে অনেক নারীকর্মী নিয়োগ হলেও মিড লেভেল থেকে সংখ্যা কমতে থাকে নেতৃত্ব দিচ্ছে এমন নারীর সংখ্যা কম, এর কারণ কী?

ফাহমিদা চৌধুরী: একথা ঠিক যে, ব্যাংকিং খাতে অনেক নারীকর্মী আছেন। এখান থেকে যদি ‘নারী’ শব্দটি বাদ দিই, তাহলে থাকবে ‘কর্মী’। পদোন্নতি ও নেতৃত্বস্থানীয় পদ ধারণ করার জন্য নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই বিশেষ কিছু গুণ থাকা জরুরি। মানুষের জীবনচক্র লক্ষ করলে দেখা যায়, সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্ব বাড়তে থাকে। অফিসের দায়িত্বের সঙ্গে যোগ হয় পরিবারের দায়িত্ব। সামগ্রিকভাবে আমরা মনে করি, সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বের অধিকাংশই নারীর। তাই তাকে বেশি মানসিক ও শারীরিক কষ্ট ভোগ করতে হয়। একইভাবে প্রতিষ্ঠানে মিড লেভেলে চলে আসার কারণে দায়িত্বের পাশাপাশি মানসিক চাপ বেড়ে যায়। সব নারী এ দ্বিমুখী চাপ সমানভাবে সামলাতে পারে না। এ কারণে তারা একটিকে ছাড় দেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ক্যারিয়ারকেই বলি দেন। সেই শূন্যস্থানে উঠে আসে পুরুষকর্মী। উন্নত দেশে চিত্রটি আলাদা। সেখানে নারী নেতৃত্বে কোনো ঘাটতি আছে বলে মনে হয় না।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে নারীকর্মীর প্রেরণার জন্য কিছু বলুন

ফাহমিদা চৌধুরী: নারীকে মনে রাখতে হবে, তিনি যোগ্য বলেই কর্মজীবনে আসতে পেরেছেন। সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। আমি নারী তাই দেরিতে আসবো অথবা অফিস টাইমের আগে বাসায় ফিরব, এ ধরনের চিন্তা বাদ দিতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে শেষ করে বাড়ি যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমার মেধা আর কর্মক্ষমতার জন্য অফিস বেতন প্রদান করে। তাই অফিসের কাজে সঠিকভাবে মেধা ও মননশীলতা ব্যবহার করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে আমি ‘কর্মী’ শব্দটিই ব্যবহার করতে চাই, নারীকর্মী বা পুরুষকর্মী নয়। সবক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে পাল্লা না দেওয়াই ভালো। প্রকৃতিগতভাবে নারী ও পুরুষ আলাদা। এ ব্যবধান ঘোচানোর কোনো প্রয়োজন নেই। অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে হবে। সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব নারী তার যোগ্যতা দিয়েই উপরে উঠে এসেছে। কাজেই নতুনদের বলতে চাই, যোগ্যতার বলে কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়া সম্ভব। নারীকর্মীর এ ক্ষমতা আছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক ব্যবহার।

 শেয়ার বিজ: টপ ম্যানেজমেন্টে নারীকর্মীর বেশি অংশগ্রহণের জন্য কী কী বিষয় জরুরি বলে মনে করেন?

ফাহমিদা চৌধুরী: নারীকর্মীকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি সুনিশ্চিত প্রক্রিয়া থাকা জরুরি। আমাদের সমাজে অনেক নারী উদ্যোক্তা আছেন, যারা কেবল নামেমাত্র উদ্যোক্তা। মূলত ওই সব ব্যবসা পরিচালনা করে তাদের স্বামী, বাবা, ভাই কিংবা অন্য কেউ। এখানে তার ভূমিকা শুধু ফ্রন্ট লাইনে থাকা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিষ্ঠানের চিত্রও ক্ষেত্রবিশেষে একই রকম। আমি বলতে চাই, টপ ম্যানেজমেন্ট পদ আলঙ্কারিক পদ নয়। বরং এখানে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চিন্তা-চেতনাকে বিকশিত করতে হবে। এজন্য প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেন নারীকর্মী তার মেধা কাজে লাগিয়ে ওপরে উঠে আসতে পারে।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে নারীর সফলতার জন্য প্রধান বিষয় কী?

ফাহমিদা চৌধুরী: সব সফল নারীই কাজের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। এই ডেডিকেশনই তাদের সফল করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, কর্মই তাকে যোগ্য করে তুলেছে। এর সঙ্গে যোগ হতে পারে তার শিক্ষা, বিচক্ষণতা ও সততা।

 শেয়ার বিজ: ব্যাংকিং সেক্টরে একজন এইচআর ম্যানেজারকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়?

ফাহমিদা চৌধুরী: এইচআরএম মানেই চ্যালেঞ্জ। এটি সব সময়ই থ্যাংকলেস জব। এ বিষয়টি মেনে নিয়েই এইচআর-এর কাজ চালিয়ে যেতে হবে। এইচআর ম্যানেজারের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। মানবসম্পদ বিভাগ একজন কর্মীর নানা দিক নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে তার ভেতরে সততা, সমতা ও জাস্টিস নিশ্চিত করা খুবই চ্যালেঞ্জিং কাজ।