আমাদের শিশু-কিশোর বেড়ে উঠুক মানবিক ছায়াতলে

কাজী সালমা সুলতানা: কিশোর বয়স প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা। আনন্দ-উদ্দীপনা আর অজানাকে জানার আকাক্সক্ষা সারাক্ষণ উঁকি দেয় মনের ভেতর। তা থেকে অনেক সময় দুঃসাহসী কাজও করে বসে কিশোর বয়স। এমন দুঃসাহস কখনও মনকে আনন্দে ভরে দেয়, যখন নতুন কোনো অভিজ্ঞতার সন্ধান পায়। আবার কখনও কখনও জীবনকে ফেলে দেয় কঠিন সমীকরণে। এমনি এক সমীকরণের নাম ‘১২ কিশোরের ১৭ দিন গুহায় বন্দি জীবন’।
হ্যাঁ, থাইল্যান্ডের ঘটনার কথাই বলছি। ১২ জনের কিশোর ফুটবল দল কোচকে নিয়ে প্রবেশ করে ‘থাম লুয়াং’ পাহারের গুহায়। উদ্দেশ্য বন্ধুর জন্মদিন পালন। জন্মদিন পালন হতে পারত কোনো হোটেল, ক্লাব, এমনকি যে মাঠে তারা অনুশীলন করে সেখানেও। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? মনটা তো কিশোরদের। উৎসুক মন তাদের নিয়ে যায় গুহার ভেতরে। দিনটি ছিল ২৩ জুন শনিবার। বন্ধুর জন্মদিন পালন করতেই পাহারের গুহায় প্রবেশ করা। কোনোই সমস্যা ছিল না। যে পথে যাচ্ছি, সে পথেই বেরিয়ে আসবে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে। বৃষ্টিপাতের কারণে উপত্যকায় পানি জমে। পানির উচ্চতা বাড়তে বাড়তে গুহায় ঢুকে পড়ে। বাইরের এই যে বিপদ ঘটে গেছে তখনও টের পায়নি ওই কিশোর ফুটবল দল। ইতোমধ্যে গুহার বিরাট অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। যখন তারা টের পায় তখন বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। গুহার প্রবেশ মুখসহ ভেতরেরও উল্লেখযোগ্য অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। সেই পানি অতিক্রম করে বের হওয়া আর সম্ভব নয়। অবস্থা বুঝে গুহার ভেতরের একটি কার্নিশে শুকনো জায়গায় আশ্রয় নেয়। ৯ দিন এভাবে কেটে যায় তাদের।
জন্মদিন উপলক্ষে যে কেক ও খাবার সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল তাই খেয়ে জীবন বাঁচায় এই ৯ দিন। পানি ফুরিয়ে যাওয়ায় গুহার দেয়াল থেকে চুইয়ে পড়া পানি পান করেছে। কোচ একাপল চানতাওং, তার শিষ্যদের জীবন বাঁচাতে সঙ্গে নেওয়া খাবার খেতে চাননি। তার শিষ্যদের জীবন বাঁচানোকেই প্রধান কাজ মনে করেছেন। তাদের সঙ্গে যে আলোর উৎস ছিল তাও এক সময় নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই অন্ধকারেই কাটাতে হয়েছে তাদের। কখন দিন আর কখন রাত তাও বোঝার কোনো উপায় ছিল না।
নিখোঁজ হওয়ার ৯ দিন পর ২ জুলাই রাতে ব্রিটিশ ডুবুরি রিচার্ড স্ট্যানটন ও জন ভলানথেন প্রথম তাদের খোঁজ পান। তখন তাদের অবস্থান প্রবেশমুখ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার ভেতরে।
ব্রিটিশ ডুবুরি রিচার্ড স্ট্যানটন ও জন ভলানথেন গুহার কাছে একটি সাইকেল দেখতে পান। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ সাইকেলের মালিককে না দেখে কৌতূহল জাগে। ওই গুহা সম্পর্কে তার আগে থেকেই জানা ছিল। একজন ডুবুরি হিসেবেই তিনি গুহায় প্রবেশ করেন। এভাবেই তিনি সন্ধান পান গুহার ভেতরে আটক কিশোর ফুটবল দলের। সন্ধান পাওয়ার পর তার প্রথম চেষ্টা ছিল কিশোর দলটিকে বাঁচিয়ে রাখা। সে জন্য প্রথমে তাদের বাইরে থেকে খাবার দেওয়া শুরু হয়।
এরপরই সরব হয়ে ওঠে গোটা মানবতা। কিশোরদের গুহার মধ্যে বাঁচিয়ে রাখা এবং উদ্ধার করার উপায় নিয়ে চলে আলোচনা। থাইল্যান্ডের সরকারসহ গোটা দেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে আটকে পড়া এই কিশোর ফুটবলারদের উদ্ধারের উপায় নিয়ে। কিশোরদের অবস্থান জানার পর ৬ জুলাই নৌবাহিনীর একজন সাবেক ডুবুরি সামান গুনান সেখানে অক্সিজেন ট্যাঙ্ক পৌঁছে দেন। ফেরার পথে পানির ভেতরেই নিজের অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলে তিনি মারা যান। প্রথমে বলা হয়েছিল কিশোর দলটিকে পানি না সরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তাহলে কয়েক মাস তাদের গুহায় আটক থাকতে হবে।
গুহায় আটকে পড়া থাইল্যান্ডের ওই কিশোর ফুটবলার দলকে উদ্ধারকাজে শেষ স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের ডুবুরি। তারা মানবতার টানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে অংশ নিতে এগিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত উদ্ধার অভিযানে ৯০ জন ডুবুরির একটি দল কাজ করে। এর মধ্যে ৫০ জন বিদেশি। তারা এসেছেন ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া থেকে। তারা কিশোরদের উদ্ধার করতে নিজেদের জীবন ঝুঁঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড হ্যারিস, পেশায় চিকিৎসক আবার ডুবুরি হিসেবেও বেশ পারদর্শী। শিশুদের আটকে পড়ার খবর শোনার পর হ্যারিস স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। কিশোরদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করতে রিচার্ড হ্যারিস গুহার ভেতর গিয়ে শিশুদের সঙ্গে গুহার ভেতরে ছিলেন তিনদিন। সবাইকে গুহার ভেতর থেকে সফলভাবে বের করে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল হ্যারিসের। প্রথমে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছেলেদের বের করে আনা হয় তারই নির্দেশনায়। চূড়ান্ত অভিযান শুরু হয় ৮ জুলাই। তিনদিন ধরে চলা জটিল ও বিপজ্জনক এক অভিযান চালিয়ে একে একে সবাইকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। প্রথম দিন চারজন, দ্বিতীয় দিন চারজন আর তৃতীয় দিনে চার কিশোরসহ কোচকে উদ্ধার করা হয়। গুহার ভেতর থেকে উদ্ধারকৃতদের মধ্যে সবার শেষে বেরিয়ে আসেন রিচার্ড হ্যারিস।
কিশোর ফুটবলার দলটাকে উদ্ধারের জন্য ১৮ জন ডুবুরিকে গুহার ভেতরে পাঠানো হয়েছিল। প্রত্যেকটি ছেলেকে পুরো মুখ ঢাকা অক্সিজেন মাস্ক পড়তে হয়েছে। প্রতিজনের সামনে এবং পেছনে দুজন করে ডুবুরি গাইড হিসেবে থেকেছেন। তারা ছেলেদের এয়ার সিলিন্ডারও বহন করেছেন। সবচেয়ে কঠিন অংশটা ছিল গুহার মাঝামাঝি জায়গায়। সেখান থেকে বাকিটা পথ পায়ে হেঁটে তাদের গুহামুখে আসতে হয়েছে। কিশোর ফুটবল দলের সঙ্গে আটকে পড়া কোচই কিশোরদের উজ্জীবিত রেখেছিলেন। তিনি আগে ১২ বছর ভিক্ষু হিসেবে ছিলেন। বেশ কয়েকদিন অন্ধকার গুহায় থাকার পর হঠাৎ আলোয় চোখের ক্ষতি হতে পারে। তাই উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গেই ছেলেদের সানগ্লাস পড়ানো হয়।
এমন একটি দুঃসাহসিক অভিযানের জন্য অর্থ একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বিদেশি ডুবুরিদের বেশ কয়েকজন এসেছেন ইউরোপ থেকে। এই অভিযানের পেছনে ব্যয়িত অর্থের সিংহভাগ জোগান দিয়েছে থাই সরকার। আবার কোনো কোনো দেশ নিজেদের অর্থেই কিশোরদের উদ্ধারে অংশ নিয়েছে। মার্কিন বিমানবাহিনীর ৩০ জন সদস্য এসেছিলেন সাহায্য করার জন্য। এ জন্য ব্যয়ভার বহন করেছে মার্কিন সরকার। বিদেশি ডুবুরিদের আসার জন্য কোনো কোনো এয়ারলাইনস বিনামূল্যে টিকিট দিয়েছে। থাই ব্যবসায়ীরা পরিবহন এবং খাবার দিয়ে সাহায্য করেছেন। এত সব আয়োজন ও ব্যয়ের পেছনে মূল চেতনা ছিল মানবতা।
কেমন ছিল গুহার মধ্যে আটকে পড়া কিশোররা? ১৭ দিন আলো-বাতাস নেই। কখন দিন কখন রাত বোঝার উপায় নেই। খারাব নেই, পানি নেই। এমন একটি পরিবেশে এই কিশোর কেন, একজন বয়স্ক মানুষের পক্ষেও টিকে থাকা কঠিন। গুহা থেকে বের হয়ে সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছিল ১৪ বছর বয়সী আদুল সাম-অন। সে জানায়, জলমগ্ন অন্ধকার গুহায় ১০ দিন কেবল পানি পান করে সময় পার করেছে তারা। এক পর্যায় একজন বলে ওঠে লড়াই করো, হাল ছেড়ো না। সবচেয়ে কমবয়সী টিটান বলেছে, আমি খাবারের কথা একদম ভাবতে চাইনি। ওতে আরও খিদে পায়। কোচ এক্কাপাল চানতাওয়াং জানান, নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের খুঁজে পাবেন, এমন ভাবার সুযোগ আমাদের ছিল না। আমরা পথ খুঁজে পেতে নিজেরা খনন করার চেষ্টা করেছি। যেদিন প্রথম ডুবুরিকে দেখলাম ‘মুহূর্তটা ছিল জাদুকরী। পথ তৈরি করতে আমরা পাথর ঘষছিলাম। আর এরই মধ্যে হঠাৎ কণ্ঠ শুনতে পেলাম। একটু পর তাকে দেখতে পেলাম। বিদেশি মনে হওয়ায় বললাম, হ্যালো। উদ্ধার হওয়া আরেক কিশোরের কথাÑ‘আমার ভয় হচ্ছে, বাড়ি যেতে। মা-বাবা নিশ্চয়ই বকা দেবেন।’ উদ্ধার হওয়া কিশোরদের সঙ্গে কথা বলেতে গিয়ে সাংবাদিকদের লিখিত প্রশ্ন জমা দিতে হয়েছে। প্রশ্নগুলো মনোবিজ্ঞানী পরীক্ষা করে সম্মতি দিলেই প্রশ্ন করার অনুমতি মিলেছে। উদ্ধার হওয়া কিশোরদের এক মাস সাক্ষাৎকার দিতে বারণ করেছেন চিকিৎসকরা। অন্যথায় তাদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাদের শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলেও মানসিক ভীতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।
গুহায় আটকে পড়া থাইল্যান্ডে কিশোর ফুটবল দলের এ ঘটনা বিশ্বাবাসীকে নাড়া দিয়েছিল। বিশ্বমানবতা সজাগ হয়েছিল, যে করেই হোক উদ্ধার করতে হবে তাদের। তাই অর্থ বা অন্যান্য সহায়তা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু তার পরের ঘটনা প্রবাহ? উদ্ধারের পর বাসায় না পাঠিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা, শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, এক মাস কোনো সাক্ষাৎকার না দেওয়া এতসব নিয়মকানুন কেন? আসল কথা ওরা সবাই বয়সে কিশোর। ওদের সামনে অনাগত ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। ওরাই হয়তো একদিন থাইল্যান্ডকে ফুটবলের বিশ্বকাপ এনে দেবে। অথবা সে বড় হয়ে দেশের কোনো বিজ্ঞানী হবে। তাই তো উদ্ধারের পরও এত বিধিনিষেধ। এসব বিধিনিষেধের মূলে রয়েছে এই কিশোরদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে। ওদের ভেতরের প্রতিভাকে প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।
এটা শুধু থাইল্যান্ডের শিশু বা কিশোর বলে কথা নয়, এ অধিকার সারাবিশ্বের শিশু ও কিশোরদের। আর এমন পরিচর্যা ছাড়া কোনো শিশু-কিশোর সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে না।
আজ আমাদের কিশোররা যখন তার সহপাঠী হত্যার প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছে, আমরা কি পারি না তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে। ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় জাবালে নূর নামে একটি বাস অপেক্ষারত শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে গেলে ঘটনাস্থলেই দুই শিক্ষার্থী মৃত্যুবরণ করে এবং আরও ১৫ জন গুরুতর আহত হয়। সড়কে মৃত্যুর ভয়াবহতায় ক্ষুব্ধ সহপাঠীদের সঙ্গে অসংখ্য শিক্ষার্থী হত্যার বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীর সর্বত্র অবস্থান নিয়েছে। তাদের এই দাবি বলতে গেলে দেশের সব মানুষেরও চাওয়া। তাদের চাওয়াটাকে গুরুত্ব দিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে রাজনৈতিক বিদ্বেষ সৃষ্টির পরিবেশ গড়ে না তুলে মানবিক দৃষ্টিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের শিশু-কিশোরও বেড়ে উঠুক মানবিকতার ছায়াতলে। আর এ মানবিক ছায়া সৃষ্টি করতে হবে আমাদেরই।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]