আমাদের শেয়ারবাজার সামষ্টিক অর্থনীতির অংশ হতে পারেনি

মো. তৌফিক হোসেন পুঁজিবাজার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ‘বাংলাদেশ শেয়ার মার্কেট: লুকিং অ্যাহেড আফটার টু বিগ ক্র্যাশেস’ শীর্ষক গ্রন্থের লেখক তিনি। ২০১৪ সালে প্রকাশিত এ গ্রন্থে পুঁজিবাজার সম্পর্কে তার গভীর চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। ২০০৭ সাল থেকেই তিনি গবেষণা করছেন। লিখছেনও। বর্তমানে কর্মরত ‘ওয়েভ ফাউন্ডেশন’-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট কো-অর্ডিনেটর হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ের পুঁজিবাজারের বিভিন্ন দিক নিয়ে শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাকারিয়া পলাশ

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ মানেই অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে অনেকেই বলছেন ক্যাসিনো টেবিল। কিন্তু কেন? এর কি কোনো অনুমানযোগ্যতা থাকতে পারে না?

মো. তৌফিক হোসেন: আসলে ওঠা-নামা যে কোনো পুঁজিবাজারের সহজাত বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর যেকোনো পুঁজিবাজারেই এমনটা হতে পারে। বাংলাদেশেও হচ্ছে। তবে দুবার এখানে ধস নেমেছিল। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে। দুটো ধসেরই নিজস্ব গতিপ্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য ছিল। ১৯৯৬ সালের ধসের সময়ে কিছু বিদেশি কোম্পানি বাজারে বিনিয়োগ করে বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নিয়েছিল। সে সময় তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আর ২০১০ সালে ব্যাংকিং খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিমাত্রায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, সমন্বয়হীন নীতিকাঠামো, ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসির অভাব ও বাজারে সার্বিক সুশাসনের ঘাটতির কারণে ধস হয়েছিল। অবশ্য এখন দেখছি, অদ্ভুত সব কারণে পুঁজিবাজার প্রভাবিত হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতারের কারণে মুদ্রানীতি ঘোষণার সময়ে বা বাজেটের সময়ে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ঋণ-আমানতের হারে পরিবর্তন আনল তখনও তার প্রভাব পড়েছে বাজারে। একইভাবে আমরা দেখছি কৌশলগত অংশীদার নির্ধারণকে কেন্দ্র করেও বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়গুলো আমার কাছে খুবই হাস্যকর মনে হয়। শুধু একজন রাজনীতিককে গ্রেফতার করলে যদি বাজার অস্থির হয়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটা অন্য জায়গায়। বুঝতে হবে সমস্যাটা ঠিক বাজারের নয়। সমস্যাটা হচ্ছে, একশ্রেণির লোক কোনো একটা ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসে বাজারকে প্রভাবিত করছে। এটাকে আমরা বলব মোরাল হ্যাজার্ড বা নৈতিক দুর্যোগ।

শেয়ার বিজ: তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন কৌশলগত অংশীদার নির্ধারণকে কেন্দ্র করে বাজারে প্রভাব পড়া অপ্রয়োজনীয়।

মো. তৌফিক হোসেন: আমি নিজে একটা জরিপ চালিয়ে দেখেছি, স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের ভূমিকাকে বিনিয়োগকারীরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। ৬২ শতাংশ স্টেকহোল্ডারই মনে করছেন, এটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। বাজারের এসব অকারণ ওঠানামার দিকে ফোকাস না দিয়ে বরং ফোকাস থাকা উচিত ছিল ভালো কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার বিষয়ে।

শেয়ার বিজ: ডিমিউচুয়ালাইজেশন, স্ট্র্যাটেজি পার্টনারশিপÑএতকিছুর পরও কেন ভাল কোম্পানি বাজারে আসছে না? আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মো. তৌফিক হোসেন: ভাল কোম্পানি না আসার একটা বড় কারণ হলো আমাদের শেয়ারবাজারটা সামষ্টিক অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেতে পারেনি। এখনো আমরা ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি। আপনি দেখবেন, ব্যাংক খাত নিয়ে যত আলোচনা হয়, শেয়ার বাজারের জন্য তত কথা হয় না। ২০২১ সালে আমরা মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছি, ২০৪১-এ উন্নত হতে চাচ্ছি। ভালো। সেজন্য সামগ্রিক অর্থনীতিকে ভালো করতে হবে। সরকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্ব দিচ্ছে। এরই সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার মার্কেটের মনিটরিংয়ের সময় এসেছে বলে আমি মনে করি। ভালো শেয়ার আনতেই হবে। এছাড়া ডিমিউচুয়ালাইজেশন বলেন আর কৌশলগত পার্টনারশিপ বলেন, কোনো লাভ নেই। ভালো কোম্পানি না আসার আরেকটা কারণ হলো, আমরা তাদেরকে আকৃষ্ট করতে পারছি না। কোম্পানিগুলো বাজারে তালিকাবদ্ধ হয় ট্যাক্স হ্র্যাসকৃত সুবিধা পাওয়ার জন্য। ট্যাক্স কমানো হয় বটে, কিন্তু তাতে কোম্পানিগুলো সন্তুষ্ট হচ্ছে না। টেলিকমের মতো সম্ভাবনাময় খাতে একমাত্র গ্রামীণফোন বাজারে তালিকাভুক্ত। বাকিরা বাজারে নেই। সরকারি কোম্পানি টেলিটকও নেই। এটাকে বড় ব্যর্থতা হিসেবে ধরতে হবে যে কেন রবি, বাংলালিংক, টেলিটক বাজারে নেই। সার্বিক অর্থনীতির জন্যই বড় বড় কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে হবে। ২০০৯ সালে জিপি যখন বাজারে এসেছিল তখন আমরা জিপির শেয়ার কিনতে লাইন দেখেছি। এতে বাজারের গভীরতা বাড়ে। কোনো নেত্রী গ্রেফতার হলো, রাজনৈতিক অবস্থার কী হলো এসব অহেতুক বিষয়ের চেয়ে ভাল কোম্পানি বাজারে কেন নেই, সেদিকে মনযোগ দেওয়া দরকার। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ছাড়া বাকি এমএনসিরা কেন নেই। ইউনিলিভার কেন নেই? তার মানে আমরা তাদেরকে আকৃষ্ট করতে পারছি না, সে রকম বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারছি না।

শেয়ার বিজ: আমাদের পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ বলুন।

মো. তৌফিক হোসেন: আমাদের দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মান কিন্তু আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে। বেশ কিছু আধুনিকায়ন হয়েছে। ৫ বছর আগের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আজকের নিয়ন্ত্রক সংস্থার তুলনা করলে দেখা যাবে আকাশ-পাতাল পরিবর্তন হয়েছে। তারা এখন আরও বেশি ম্যাচিওরড। পরিণত। কিন্তু মজার বিষয় দেখলাম যখন ১০ টাকার শেয়ার ২০ টাকা হচ্ছে তখন শো-কজ হচ্ছে। কিন্তু ১০ টাকার শেয়ার যখন এক বা দুই টাকা হয়ে যাচ্ছে, তখন কিন্তু চাপ থাকছে না। এক্ষেত্রে দুটোই হওয়া উচিত। দুটোরই যৌক্তিক মনিটরিং হওয়া উচিত। বাজার ডি-মিউচুয়ালাইজড, অর্থাৎ এটা পৃথিবীর বড় বড় বাজারের সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ একটা প্ল্যাটফর্মের সদস্য। কাজেই এ বাজারের এখন কিছুটা ম্যাচুইরিটি দেখানো উচিত। ২০১৩ সালে ডিমিউচুয়ালাইজেশন হয়েছে। এখন ২০১৮। প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল। কাজেই এখন ডিমিউচুয়ালাইজেশনকে কেন্দ্র করে আরও অনেক কমপ্লায়েন্স ইস্যু সামনে আসবে। এ অবস্থায় বাজারকে এভাবে বিনা কারণে কমতে বা বাড়তে দেখলে তা অযৌক্তিক মনে হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ বিষয়গুলো আমলে নিতে হবে।

শেয়ার বিজ: সামনে বাজারের অবস্থা কেমন হতে পারে? অনুমান করা যায় কি?

মো. তৌফিক হোসেন: নির্বাচনী বছর বলেই হয়তো অনেক কিছুই এবার বদলে যাবে। কিন্তু সবগুলো সূচকের পরিবর্তন দেখার জন্য আমাদের ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত হয়তো অপেক্ষা করতে হবে। ২০০৯ সালে আমরা দেখেছি, শেয়ারের দাম তিন-চারগুণ বেড়েছে। ২০১০ সালে এসে ধস নেমেছে। সেই হিসাবে আমরা আশা করেছিলাম ২০১৮ সালে বাজারের সূচক উঠবে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে এসেও দেখা যাচ্ছে, বাজারে ব্যাপক দরপতন। ২০১৭ সালের ২৩ জুলাই বাজারের সূচক ছিল পাঁচ হাজার ৭৭৫ পয়েন্ট। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ এ পয়েন্ট হলো প্রায় একই। পাঁচ হাজার ৭৭৪ পয়েন্ট। এটা ভালো লক্ষণ নয়। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে তৎপর থাকতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে বাজার সংশোধন হবে।

শেয়ার বিজ: বিনিয়োগের পরিবেশের কথা বলছিলেন। সার্বিক বাণিজ্যের জন্যও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন জরুরি। ইজ অব ডুইং বিজনেসে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখনও অধরা। বাজারেও বিনিয়োগের ঝুঁকি কমছে না। এর উত্তরণ কীভাবে হবে?

মো. তৌফিক হোসেন: বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের জন্যও কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে হবে। কাজেই শেয়ারবাজারকে বিনিয়োগবান্ধব বা ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে। শেয়ারবাজারকে বাদ দিয়ে অর্থনীতিকে বিনিয়োগবান্ধব বলা যাবে না। আর বাজারের উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগকারীদেরও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

শেয়ার বিজ: বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণের জন্য কিছু উদ্যোগ রয়েছে। সেগুলো কি যথেষ্ট নয়?

মো. তৌফিক হোসেন: একদমই যথেষ্ট নয়। উল্লেখ করার মতো কিছু খবরের কাগজ বাজারে এসেছে। তারা ইডুকেইট করছে। এছাড়া লংকাবাংলা, আইডিএলসি ও ডিএসই কিছু ট্রেনিং দেয়। আমার দেখতে হবে বাজারের বিনিয়োগকারীরা কোন লেভেলের। তাদের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়েই আমাদের বিনিয়োগ প্রশিক্ষণের কারিকুলাম, মডিউল বা প্রোগ্রামটা নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণের জন্য সিএসআর খাত থেকে অর্থায়ন করা যেতে পারে।

শেয়ার বিজ: সিএসআর খাতের অর্থ পুঁজিবাজারের শিক্ষায় কীভাবে আনা যাবে?

মো. তৌফিক হোসেন: আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছি। আমাদের কিন্তু এখন দাতানির্ভরতা কমার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখন আমাদের বিকল্প অর্থায়নের জন্য ভাবতে হবে। সাধারণত সিএসআর ফান্ড শিক্ষা-স্বাস্থ্য প্রভৃতি খাতে ব্যায় করা হয়। বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমকেও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে সংযুক্ত করে অর্থ বরাদ্দ করা যেতে পারে। আমরা মার্কেট ভালো বুঝি না। আমরা হুজুগে-গুজবে বিশ্বাসী। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। বাজার না বোঝার জন্য বিনিয়োগকারীদের একতরফা দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাজারে নীতিনির্ধারক আছে, অনেকগুলো ব্রোকারেজ হাউজ আছে ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে। এসব বড় প্রতিষ্ঠানের এখন গবেষণা বিভাগ থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। ট্রেনিং বিভাগ বাধ্যতামূলক। এসব বিভাগের মাধ্যমে তারা বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণ দিতে পারে। আমাদের বন্ড মার্কেট নেই, মিউচুয়াল ফান্ড এখনো বিকশিত নয়। এখনও মাত্র দুটি করপোরেট বন্ড রয়েছে বাজারে। আসলে কৌশলগত বিনিয়োগকারী ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিষয় কিছুটা প্রভাব রাখলেও এগুলো মৌলিক বিষয় নয়। মৌলিক বিষয়ে আমাদের ফোকাস থাকা জরুরি।