আমার সন্তানদের মারবেন না

পাঠকের চিঠি

রাজপথের চিত্র পাল্টে গেছে। স্কুল-কলেজপড়–য়া ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা প্ল্যাকার্ড হাতে সড়কে নেমেছে। যেখানে তাদের ভাই, বন্ধু বা স্বজন ঘাতক বাহনের চাকায় প্রাণ হারিয়েছে সেই সড়কের দখল নিয়েছে তারা। তাদের দাবি, নিরাপদ সড়ক চাই। এ দাবি তো আমাদের সবার, দীর্ঘদিনের। কিন্তু আমরা এভাবে গর্জে উঠতে পারিনি। ওরা পেরেছে। কারণ একের পর এক অনাচার, ইস্যু আর স্বেচ্ছাচারিতায় আমাদের অনুভূতি যতটা ভোঁতা হয়ে গেছে, ওদের হয়তো তা হয়নি। রাজীবের কাটা হাতের অসহ্য দৃশ্যও যখন আমরা একসময় সয়ে নিয়েছি। তারপরও তো কতগুলো লাশ গুনে ফেললাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠিকই আবার দৈনন্দিন যাপিত জীবনে ফিরে গেছি। কিন্তু ওরা পারেনি। ওরা বন্ধু হত্যার বিচার চায়। সড়কে জীবনের নিরাপত্তা চায়। স্বাধীন দেশে এটা কি খুব বেশি চাওয়া? অথচ দেখতে পাচ্ছি, প্রশ্নাতীতভাবে মৌলিক এ দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমে পুলিশের লাঠির আঘাত পাচ্ছে শিশু-কিশোররা।
আঠারো বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। স্কুল-কলেজপড়–য়া এ শিশুদের শারীরিকভাবে প্রহার না করার জন্য শিক্ষকদের ওপরও নিয়ম জারি করা আছে। সেখানে পুলিশ কীভাবে ওদের পেটায়। আরও ভয়ঙ্কর ও ঘৃণ্য ঘটনাও দেখলাম। পরিবহন শ্রমিকরা চড়াও হয়েছে আন্দোলনকারী তরুণদের ওপর। এ স্পর্ধা কে দেয়? ওরা আমাদের সন্তান। ওরা কোনো অন্যায় করলেও তার জন্য দেশে বিশেষ আইনের ব্যবস্থা আছে। সেখানে সড়কে জীবনের নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলন করায় ওরা মার খাবে কেন? প্রশাসন আর কত নিচে নামবে?
আমরা আর একটি শিশুকেও আঘাত পেতে দেখতে চাই না। প্রশাসন বিশেষত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অনুরোধ তারা যাতে ন্যূনতম সভ্যতার চর্চা করে। অন্তত আন্দোলনরত এই কিশোর-তরুণদের কাছে শিখে নেয় কীভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। যে বয়সের ছেলেমেয়েদের আমরা হামেশাই ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’, ‘অপরিপক্ব’ বলে গাল দিই, তারা কী চমৎকারভাবে একটা আন্দোলন গড়ে তুলেছে তা দেখে অবাক হতে হয়। এরা গাড়ি ভেঙেছে, কিন্তু যাত্রীদের আঘাত করেনি। অ্যাম্বুলেন্স, পঙ্গু, বৃদ্ধ, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের যতেœর সঙ্গে চলার পথ করে দিয়েছে। গাড়ির ভাঙা কাচে যাতে পথচারীর পা না কাটে এজন্য নিজেরা ঝাটা হাতে রাস্তা পরিষ্কার করেছে। আর কোনো আন্দোলনের এমনটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
এ তরুণদের কাছে আমাদের প্রত্যেককেই শিক্ষা নিতে হবে। বুড়িয়ে যাওয়া হতাশ জনগোষ্ঠী, রাজনীতিবিদ, পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশÑসবাই মিলে যা পারেনি, ওরা তা পেরেছে। মন্ত্রীর গাড়িও ঘুরিয়ে দিয়েছে ওরা। সত্য বলতে, আজ সব সড়কেই ধারালো কাচের টুকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ওরাই পারবে ঝাটা দিয়ে ঝেড়ে সব সাফ করতে। এ আন্দোলন সফল হোক। সড়কে ফিরে আসুক স্বস্তি, শৃঙ্খলা।

মেহেরুন্নিসা খান
ধানমন্ডি, ঢাকা