আরও তথ্য চায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠন

সোহেল  রহমান : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর (বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত) মূলধন পুনর্গঠনে (পুনঃঅর্থায়ন) চলতি অর্থবছরে বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ বণ্টনের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ’। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এ-সংক্রান্ত বৈঠকটি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও একাধিক বৈঠকের প্রয়োজন হতে পারে।

জানা যায়, বৈঠকে মূলধন পুনর্গঠনে ইচ্ছুক রাষ্ট্রায়ত্ত (বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত) ৬টি ব্যাংকের কাছে আরও কিছু তথ্য-উপাত্ত চাওয়া হয়েছে। এগুলো পাওয়ার পর পুনঃঅর্থায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এদিকে মূলধন পুনর্গঠনে অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে গত বছর কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছিল। সেগুলো হচ্ছে- ছাড়কৃত অর্থ ব্যয়ে প্রচলিত সব বিধিবিধান ও অনুশাসনাবলি যথাযথভাবে অনুসরণ করা, বর্ণিত খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে এ অর্থ ব্যয় না করা এবং অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়ী থাকবেন–এ তিন শর্তে ব্যাংকগুলোকে অর্থ দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, বৈঠকে অর্থ বিভাগের শর্তসমূহ পরিপালনের বিষয় ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাছে আরও ৫টি বিষয় জানতে চাওয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- মূলধন পরিস্থিতি উন্নয়নে ব্যাংকগুলোর গৃহীত পদক্ষেপসমূহ, মূলধন পরিস্থিতি উন্নত না হওয়ার কারণ, সেবার মান বৃদ্ধি ও অটোমেশন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ, খেলাপি ঋণ আদায়ে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ এবং ‘ব্যাসেল-৩’ অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মূলধন পুনর্গঠনে বরাদ্দ প্রদানের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বৈঠকে ব্যাংকগুলোর সমস্যার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে এবং আরও কিছু তথ্য-উপাত্ত চাওয়া হয়েছে। সেগুলো পেলে পরবর্তীতে এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকে ৬ হাজার কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ৭ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ৮০০ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে। এর বাইরে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনে সরকারি অংশের ২১ লাখ টাকা এখনও পরিশোধ করেনি সরকার। বৈঠকে এ বিষয়টিও উপস্থাপন করা হয়।

এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পুনঃঅর্থায়ন খাতে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংককে ৫৫০ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংককে ৪৫০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংককে ২৫০ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংককে ২০০ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে ৪০০ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককে ১৪৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ও গ্রামীণ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনে সরকারি অংশের বকেয়া বাবদ ২১ লাখ টাকা প্রদানের একটা খসড়া সুপারিশ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের রয়েছে বলে জানা যায়। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

পৃথক একটি সূত্রমতে, ব্যাংকগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পুনঃঅর্থায়নের পরিমাণ আরও ১ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হতে পারে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউনুসুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত: বিভিন্ন মহলের সমালোচনা সত্ত্বেও ঋণ কেলেঙ্কারিসহ নানা অনিয়মে অভিযুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে প্রতিবছরই পুনঃঅর্থায়ন করছে সরকার। গত চারটি অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পুনঃঅর্থায়ন খাতে প্রায় ১০ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। তবুও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের হিসাব মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পুনঃঅর্থায়নে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে গত চার বছরে সবচেয়ে বেশি পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পেয়েছে বেসিক ব্যাংক। এ ব্যাংকটি পেয়েছে ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। এছাড়া সোনালী ব্যাংককে ৩ হাজার ৫ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংককে ১ হাজার ৮১ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংককে ৮১৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংককে ৩১০ কোটি টাকা, বিশেয়ায়িত  বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে ৭২৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককে ৩১০ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংক (ইউকে)-কে ১৭৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংককে ১২৫ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংককে ১৮৫ কোটি টাকা ও হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনকে ৪০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে।