আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এক অনবদ্য সাফল্যগাথা

৯ বছরের সালতামামি : প্রথম পর্ব

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতি তার সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে অমিত সম্ভাবনার এই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সব সম্ভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত করে। নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতির সামনে ‘দিনবদলের সনদ’ তুলে ধরে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে এ দিনবদলের সনদ তথা নির্বাচনী ইশতেহারে কেবল পাঁচ বছরের নয়, আগামী ২০২১ সালে আমরা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চাই তার একটি রূপকল্প তুলে ধরা হয়। দিনবদলের সনদ, ‘রূপকল্প-২০২১’, এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার কর্মসূচির প্রতি জনগণ অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদান করে। ফলে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার বাংলাদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কাজ শুরু করে।

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে অতীতের পুঞ্জীভূত সমস্যা, চরম অব্যবস্থাপনা ও বিশ্বমন্দার পটভূমিতে বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করে। বিগত মেয়াদ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সরকার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নে যে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে তা দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান বিষয়, যেমন-মোট দেশজ আয়, প্রবৃদ্ধি, রফতানি আয়, কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং সামাজিক খাতে দারিদ্র্য নিরসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু নিরাপত্তায় অগ্রগতি এবং খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে সরকারের সাফল্য অভূতপূর্ব।  দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের জাল ছিন্ন করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সামনে রেখে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্পভিত্তিক ‘বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১)’ প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় দুই হাজার মার্কিন ডলারে উন্নীত করা, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) শিল্প খাতের অবদান ৩৭ শতাংশে উন্নীত করা, বেকারত্ব ও অর্ধ-বেকারত্বের হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, মাথাপিছু বিদ্যুতের ব্যবহার ৬০০ কিলো ওয়াট-ঘণ্টায় উন্নীত করা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকে সর্বত্র শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্যগুলো অর্জনের প্রথম ধাপ হিসেবে ইতোমধ্যে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-১৫) বাস্তবায়িত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে এবং ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পরিকল্পনাটি তার বাস্তবায়ন মেয়াদের অর্ধকালে উপনীত হয়েছে।

দেশজ আয় ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে বর্তমান সরকার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি ছিল চার হাজার ৮২৩ দশমিক চার বিলিয়ন টাকা এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সাত হাজার ৫০ দশমিক সাত বিলিয়ন টাকা, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৭৫৮ দশমিক ১৫ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়। এটি ২০০৫-০৬ ভিত্তিবছরের চার গুণেরও বেশি। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণকালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল পাঁচ দশমিক এক শতাংশ, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাত দশমিক ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের ধারাবাহিক উচ্চপ্রবৃদ্ধি একটি বিরল ঘটনা। এর আগে মাথাপিছু জিডিপি দ্বিগুণ হতে ২০ বছর অপেক্ষা করতে হলেও বর্তমানে মাত্র সাত বছরে তা দ্বিগুণ করা সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারস-এর ‘২০৫০ সালের বিশ্ব (ডড়ৎষফ রহ ২০৫০)’ শীর্ষক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন অনুযায়ী আসন্ন বছরগুলোয় যে তিনটি দেশ সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধি-ধারা প্রদর্শন করবে, তার অন্যতম বাংলাদেশ। এ প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতা (পিপিপি) অনুযায়ী পরিমাপকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের মানক্রমে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩১তম, অর্থাৎ ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের ৩১তম বৃহৎ অর্থনীতি। প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বক্রমিক ধারায় ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ উঠে আসবে ২৮তম স্থানে এবং ২০৫০ সালের বাংলাদেশ হবে বিশ্ব অর্থনীতির ২৩তম শীর্ষ কুশীলব।

২০০৫-০৬ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার ৫৮ কোটি টাকা, যা চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, উন্নয়ন খাতে অর্থায়ন, অনুন্নয়ন খাতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ঋণ গ্রহণে ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাসহ উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন বাজেটে সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ছিল মাত্র ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাঁচ গুণ বেড়ে এক লাখ ৫৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি-সংশ্লিষ্ট ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো বিনির্মাণের বিষয়গুলো।

বেসরকারি বিনিয়োগ ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ৭৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা থেকে প্রায় ছয় গুণ বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চার লাখ ৫৬ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণ ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ছিল দশমিক ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুই দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।

২০০৫-০৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট রাজস্ব ও কর রাজস্ব পাঁচ গুণ বেড়েছে। মোট রাজস্ব আয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৪৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুই লাখ ১৮ হাজার ৫০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়, অর্থাৎ রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। এ সময়কালে কর-রাজস্ব ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক লাখ ৯২ হাজার ২৬০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থাপনায় নেওয়া বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার, জনবল বৃদ্ধি, অটোমেশন পদ্ধতি প্রবর্তন প্রভৃতি পদক্ষেপ রাজস্ব আহরণে বিশেষ অবদান রাখে।

২০০৫-০৬ অর্থবছরে রফতানি আয় ছিল ১০ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিন গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে। দেশের ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ফলে উৎপাদনশীলতা ও রফতানি আয় বেড়েছে। সার্বিক জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে শিল্পের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অধিক গুরুত্ব দেওয়া এবং শিল্প খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দেশে মূলত সন্তোষজনক কৃষি উৎপাদন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলসহ পণ্যমূল্য হ্রাস, সামষ্টিক অর্থনীতির দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল পাঁচ দশমিক ৪৪ শতাংশ, যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ছিল সাত দশমিক ১৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার পাঁচ দশমিক ৮৩ শতাংশ; এ সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল সাত দশমিক ১৩ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি মাত্র তিন দশমিক ৮৫ শতাংশ।

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং বাংলাদেশের প্রধানতম শ্রমবাজারের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও সরকারের ঐকান্তিক প্রয়াসের ফলে ২০১০-১১ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর সময়কালে মোট ৪০ লাখ ৩২ হাজার কর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে। এ সময়কালে দেশ ও বিদেশ মিলে প্রায় এক কোটি ৫৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। এত কর্মসংস্থান অতীতে আর কখনও হয়নি। ২০১৭ পঞ্জিকাবর্ষে রেকর্ড ১০ লাখ আট হাজার ৫২৫ বাংলাদেশি কর্মোদ্দেশ্যে বিদেশে গমন করেছে।

২০০৫-০৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয় ছিল মাত্র চার দশমিক আট বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২ দশমিক আট বিলিয়ন ডলার হয়েছে। রেমিট্যান্স আয় প্রায় তিন গুণ (১৬৬ শতাংশ) বেড়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর ছিল ৩৩ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল তিন দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভ বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৯ গুণ।

বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ১০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন।

দারিদ্র্য নিরসন এ সরকারের এক অন্যতম সাফল্য। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে ২২ দশমিক তিন শতাংশে নেমে আসে। দারিদ্র্য হ্রাসে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্জিত গতিশীলতা এবং হতদরিদ্রদের জন্য টেকসই নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা, অতিদরিদ্র ও দুস্থদের জন্য বিনা মূল্যে খাদ্য বিতরণ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য ও টেস্ট রিলিফ, জিআর ছাড়াও সরকার উদ্ভাবিত একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রায়ণ, গৃহায়ন, আদর্শ গ্রাম, গুচ্ছগ্রাম, ঘরে ফেরা প্রভৃতি কর্মসূচির পাশাপাশি ওএমএস, ফেয়ার প্রাইস কার্ড, ভিজিডি, প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতা, বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা, দুস্থ মহিলা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা, চর জীবিকায়ন প্রভৃতি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এছাড়া দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্রঋণ, ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ব্যয় ছিল ১১ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ভাতার পরিমাণ ও আওতা বাড়িয়ে ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং জিডিপির দুই দশমিক ৪৪ শতাংশ।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কর্মোপযোগী পরিবেশ সৃজন, সামাজিক সচেতনতা তৈরি ও নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ, হোস্টেল কাম ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন, তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র পরিচালনা প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। দুস্থ, এতিম ও পথশিশুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধানেও পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন কার্যক্রম। নারীর পাশাপাশি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে সমভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতীয় শিশুনীতি, শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।

সরকারের দারিদ্র্যবান্ধব নীতি ও পরিকল্পিত কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশে খাদ্যাভাব এখন অতীতে পরিণত হয়েছে। সরকার দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুলভ মূল্যে খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে নানামুখী আয়বর্ধক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তুলনামূলকভাবে অতি দারিদ্র্যপীড়িত এলাকাসহ (উত্তরাঞ্চল, উপকূলবর্তী এলাকা ও যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চল ইত্যাদি) সারা দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘অতি-দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিবছর গড়ে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আট লাখ মানুষের ৮০ দিনের কর্মসংস্থান করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোয় দেশের উত্তরাঞ্চলে খাদ্যাভাব বা মঙ্গার পদধ্বনি শোনা যায়নি। চালের মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে (Rice Equivalent Wage) দেখা যায় সাত বছরে প্রকৃত শ্রমিক মজুরি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এক দিনের মজুরি দিয়ে একজন শ্রমিক প্রায় ৯ কেজি চাল কিনতে পারছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এক দিনের মজুরি দিয়ে পাঁচ দশমিক সাত কেজি চাল কেনা যেত। এতে প্রতীয়মান হয়, শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি যথেষ্ট বেড়েছে। এটিও বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমে আসার অন্যতম কারণ। দারিদ্র্য হ্রাসের আরেকটি কারণ হলো গ্রামাঞ্চলে অকৃষি কাজের ব্যাপক বিকাশ। ৮৭ ভাগ কৃষি পরিবারের এখন অকৃষি আয়ের উৎস রয়েছে।

সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন

এই ধারাবাহিকের বাকি পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন…