আর্থিক খাতের সুশাসন নির্ভর করে সরকারি পলিসির ওপর

বার্ষিক ব্যাংকার্স সম্মেলন ২০১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক খাতে সুশাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর অভাবেই কেলেঙ্কারি ও ঋণখেলাপি বাড়ছে। বর্তমানে সরকারের নীতিমালার আলোকেই অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাই ব্যাংক খাতের সুশাসনের সঙ্গে সরকারের পলিসির সম্পর্ক রয়েছে।
ব্যাংকারদের সম্মেলনে এমন কথা বলেছেন দেশি-বিদেশি ব্যাংকার, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা। ব্যাংকারদের নিয়ে দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকার্স সম্মেলনের [অ্যানুয়াল ব্যাংকার্স কনফারেন্স (এবিসি), ২০১৮] শেষ দিনে গতকাল এমন কথা বলেন তারা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) সম্মেলনটির আয়োজন করে। এতে দেশের পাশাপাশি ভারত ও নেপালের ব্যাংকাররা অংশগ্রহণ করেন।
এতে আরও বলা হয়, জাতীয় সঞ্চয়পত্র চালু করা হয়েছে বিশেষ শ্রেণির জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার জন্য। বর্তমান নীতিমালায় একজন সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারে। এটি সংশোধন করা দরকার। আর বাজার অনুযায়ী সুদহার ঠিক না করা সামষ্টিক অর্থনীতি-সংক্রান্ত নীতিমালার পরিপন্থি সিদ্ধান্ত।
এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের পুরো ব্যাংক খাতের ঋণ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যসেবা, মূলধন পরিচালনা, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও কমপ্লায়েন্স, তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিষয়, ইসলামি ব্যাংকিং ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি ইস্যুতে মোট সাতটি বিষয় নির্ধারণ করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। সম্মেলনে এসব গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করা হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, জাতীয় সঞ্চয়পত্রে এখন কোনো ব্যক্তি নিজে ও সমষ্টিগতভাবে দেড় কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করতে পারে। উচ্চ সুদ হওয়ায় এখানেই সবাই বিনিয়োগ করছে। ফলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারে অর্থের সরবরাহ কমছে। এরই মধ্যে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবসম্মত নয়।
এ-সংক্রান্ত গবেষণাপত্রের কথা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিবলী রুবায়েত ইসলাম বলেন, মুক্তবাজারে সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়া ভুল তত্ত্ব। বাংলাদেশে দেশি, বিদেশি, সরকারি, বেসরকারি ও ইসলামি ব্যাংকিং রয়েছে। একেকটির ব্যবস্থাপনা একেক রকম। কস্ট অব ফান্ড, সিআরআর ও এসএলআর, পরিচালনা ও প্রশাসনিক খরচ আলাদা। এর ওপরে রয়েছে বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ। এভাবে নির্দিষ্ট করে বলে দিলেই সুদহার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এজন্য অধিকাংশ ব্যাংকই তা পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, গত বছরে ব্যাংক খাতে গড় সুদের হার ছিল ৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে যা ছিল দশ দশমিক ২৬ শতাংশ। বর্তমানে এ হার ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। খেলাপি ঋণের এ হার নিয়ে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। এতে সময় লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় উঠে এসেছে, সুদহার নয়-ছয় ঘোষণায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সামষ্টিক অর্থনীতি গাইডলাইন ব্যর্থ হয়েছে। এ-সংক্রান্ত গাইডলাইন অবশ্যই মুদ্রানীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হয়, কিন্তু তা হচ্ছে না।
বিআইবিমএমের অধ্যাপক ইয়াসিন আলী বলেন, ব্যাংক খাতে সমস্যা রয়েছে, আবার কাটিয়ে ওঠাও সম্ভব। সব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। প্রতিটি ইসুতে ব্যাংকগুলোর একটি নিজস্ব গাইডলাইন ও বিজনেস পলিসি নির্ধারণ করা দরকার।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ব্যাংক খাতের ৯ কোটি দুই লাখ হিসাবের মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতি হিসাবের পরিমাণ আট কোটি ১৩ লাখ, যা মোট হিসাবধারীর ৯০ দশমিক ১২ শতাংশ। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক আয়ের জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে কেওয়াইসি ফরম বা গ্রাহক শনাক্তকরণ ফরমকে আরও সহজীকরণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, বর্তমানে সিএসআরের অর্থ ব্যয় হচ্ছে অনুদান হিসেবে। এটিকে আয়বর্ধক খাতে নেওয়া উচিত, যাতে সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও উপার্জন করতে পারে। অনলাইন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার পরিসর ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলেও জানান তিনি।
সম্মেলনে নতুন অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা ব্লক চেইনের বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া ফিনটেক বিষয়ে গবেষণায় বলা হয়, এতে অর্থপাচার বাড়বে। বাংলাদেশের জন্য এখনও এটি প্রযোজ্য নয়। অনেক উন্নত বিশ্ব এটিকে গ্রহণ করেনি। বিশেষ করে বিট কয়েনের দাম দ্রুত ওঠানামা করে।
গতকাল দুটি সেশনে মোট ১৩টি গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করেন ব্যাংকাররা। প্রথম সেশনের সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুুষদের ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবায়েত। প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন বিআইবিমএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমেদ চৌধূরী ও অধ্যাপক মো. ইয়াসিন আলী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, অধ্যাপক ড. প্রশান্ত কুমার ব্যনার্জী ও অধ্যাপক মো. নেহাল আহমেদ প্রমুখ।
দ্বিতীয় সেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. ফয়সাল আহমেদ। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী ও শাহ আহসান হাবীব। সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান।
২০১২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় এ অনুষ্ঠানটি আয়োজন করছে বিআইবিএম। এবারের সপ্তম সম্মেলনে দুই দিনে চারটি সেশনে মোট ২২টি গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের জার্নালে পাঠানোর জন্য বাছাই করা হয়।