আর কোনো শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা কাম্য নয়

রাজধানীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যা করেছে। এ নিয়ে সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অসংখ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। এত প্রতিক্রিয়ার কারণ, অরিত্রীর আত্মহত্যা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। শিক্ষিকার ভর্ৎসনার অপমানের কষ্ট সইতে না পেরে সে আত্মহনন করেছে। শিক্ষকের রূঢ় আচরণের কারণে আর কোনো শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা দেখতে চাই না। অরিত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, পরীক্ষা চলাকালে তার কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া গেছে। অভিযোগ করা হয় অরিত্রী মোবাইল ফোনের সাহায্যে পরীক্ষায় নকল করছিল। পরীক্ষা হলে দায়িত্বরত শিক্ষক স্কুলের অধ্যক্ষের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করেন। শিক্ষার্থীর এ অপরাধের বিষয় অভিভাবককে জানাতে পরদিন অরিত্রীর মা-বাবাকে স্কুলে ডাকা হয়। অরিত্রীর মা-বাবা স্কুলে গিয়ে প্রথমে ভাইস-প্রিন্সিপালের কক্ষে যান। ভাইস প্রিন্সিপাল তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং অপমান করে কক্ষ থেকে বের করে দেন। তিনি পরদিন এসে টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট বা স্কুলের অব্যাহতিপত্র) নিয়ে যেতে বলেন অরিত্রীর মা-বাবাকে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সন্তানের টিসি নেওয়া মা-বাবার জন্য অত্যন্ত কষ্ট ও অপমানের কাজ। বিশেষ করে ভিকারুননিসা স্কুলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে টিসি পাওয়া আরও বেদনাদায়ক। বিষয়টির সুরাহা করতে অরিত্রীর মা-বাবা যান অধ্যক্ষের কক্ষে। সেখানে গিয়েও তারা একই আচরণের শিকার হন। নিজের চোখের সামনে মা-বাবার অপমান সইতে না পেরে অরিত্রী দ্রুত স্কুল থেকে বাসায় চলে যায় এবং নিজ কক্ষে গিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এত বেশি টানা-হেঁচড়া হয়েছে যে, দেশের আর কোনো খাত নিয়ে মনে হয় না এতটা হয়েছে। এই টানা-হেঁচড়া, গবেষণা, বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। শিক্ষার মান এখনও সেই তলানিতেই পড়ে রয়েছে।
শ্রেণিকক্ষে বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণও এখন অভিভাবকসুলভ নয়। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে হরহামেশাই শিক্ষার্থীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, অপমান-অপদস্থ করে। আর অভিভাবকের সঙ্গে এমন আচরণ করেন, যেন অভিভাবকরা শিক্ষকদের অধীনস্ত কর্মচারী। যতœসহকারে পাঠদানের বিষয়টি শিক্ষদের মাথায় এখন আর নেই। শ্রেণিকক্ষ হচ্ছে শিক্ষদের জন্য কোচিংয়ের শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়ার কেন্দ্র। সব শিক্ষকই হয়তো এমন নয়। কিন্তু সব শিক্ষক এমন না হলে ভিকারুননিসার উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ দু’জনই অরিত্রীর মা-বাবার সঙ্গে একই আচরণ করবেন কেন? কেন দু’জনের অন্তত একজনের মধ্যে মানবিক আচরণ প্রকাশ পেল না? সন্তানের সামনে মা-বাবাকে অপমান করা যায় কি নাÑএই বোধটা একজন শিক্ষকের মধ্যে নেই কেন? সর্বক্ষণই আমরা বলছি, আজকের শিশু আগামী কালের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যৎ প্রজš§কে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রধানত দায়িত্ব শিক্ষকদের। কিন্তু সেই শিক্ষকদের মধ্যেই মানবিক গুণাবলির লেশমাত্র নেই।
অরিত্রীর বাবা যে মামলা করেছেন, তা হয়তো এক সময়ে প্রমাণের জটিলতায় খারিজ হয়ে যাবে। কারণ আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ দায়ী কি না, তা প্রমাণ করা কঠিন হবে। অরিত্রীও হারিয়ে যাবে আমাদের স্মৃতি থেকে। আবার একদিন হয়তো ভিকারুননিসা স্কুলের মতো কোনো স্কুলে এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটবে। এমনভাবেই কি চলবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা? শিক্ষাদান বা পরীক্ষা পদ্ধতিতে কি পরিবর্তন আসবে না? আমাদের সন্তানরা কি সনদের পরিবর্তে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পাবে না? শিক্ষকরা কি মানবিকগুণাবলির আঁধারে পরিণত হবেন না? এমনই হাজারো প্রশ্নের সমাধানের জন্য অরিত্রীর আত্মহত্যার প্ররোচনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন।