আসবাব শিল্প

আসবাবশিল্পের উন্নয়নে মেলা

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ১৪তম জাতীয় ফার্নিচার মেলা। এ বিষযে বিস্তারিত জানাচ্ছেন রাহাতুল ইসলাম

‘আমার দেশ আমার আশা, দেশীয় ফার্নিচারে সাজাবো বাসা’এ প্রতিপাদ্য নিয়ে ১৭ অক্টোবর শুরু হয় ১৪তম জাতীয় ফার্নিচার মেলা। রাজধানীর বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেশন সিটিতে পাঁচ দিন ধরে চলে এ মেলা। প্রতি বছরই এ মেলার আয়োজন করা হয়।

মেলায় ফার্নিচার ব্র্যান্ড নাদিয়া, হাতিল, ব্রাদার্স, আক্তার, পারটেক্স, অ্যাথেনাস, জামান, নিউ অ্যান্টিক, রিগ্যালসহ বিভিন্ন কোম্পানি অংশ নেয়। মেলা উপলক্ষে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই পাঁচ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দিয়েছে।

মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড় ছিল। স্টলগুলোয় সর্বনি¤œ দুই হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার আসবাব ছিল। মেলায় স্প্রিংযুক্ত ম্যাট্রেস, কম্বল, বালিশ, কুশনের বিক্রি তুলনামূলক বেশি ছিল।

ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে আসবাবের বিকল্প নেই। নান্দনিক আর আকর্ষণীয়ভাবে ঘর সাজাতে প্রথমে দরকার আসবাব। কথাগুলো জানালেন গৃহকর্ত্রী সিলভি জামান। একই ছাদের নিচে বিভিন্ন ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ায় সব প্রতিষ্ঠানই চেয়েছে অন্যদের তুলনায় পণ্যতালিকায় একটু ভিন্নতা এনে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। এ সুযোগটিই লুফে নিয়েছেন অনেক ক্রেতা। সিলভি জামানও এর ব্যতিক্রম নন। যে কারণে প্রতি বছরই তিনি মেলায় আসেন একটু ব্যতিক্রমী আসবাবের খোঁজে। তাছাড়া মেলায় মূল্যছাড়ের বিশেষ অফারও থাকে, যা বছরের অন্য সময় থাকে না বলা চলে। মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠাগুলোর মধ্যে অ্যাথেনাসের আসবাব তার নজর কেড়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের পণ্যের ডিজাইন আলাদা বলে জানান তিনি। অ্যাথেনাস সম্পর্কে অপর এক গৃহকর্ত্রী নারমিন হকও একই কথা বলেন।

নিউ অ্যান্টিক ফার্নিচারের প্রতিষ্ঠাতা জয়নাল হোসেন জানান, কাজের ফিনিশিং ও মানের দিকে শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের পণ্যে ২০ বছরের গ্যারান্টিও দেওয়া হয়। বেডরুম সেটের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। তাই বেডরুম সেটের প্রতি অতিরিক্ত নজর দিয়ে থাকি। এই সেটের সঙ্গে একটি বেড, একটি আলমারি, একটি ড্রেসিং টেবিল ও একটি সাইট টেবিল রয়েছে। আমরা একটি বেডরুম সেট সর্বনি¤œ দুই লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ চার লাখ টাকায় বিক্রি করি।

ব্রাদার্স ফার্নিচারের সহকারী ম্যানেজার নজরুল ইসলাম জানান, নতুন নকশার পণ্যসামগ্রী উঠিয়েছি আমরা। আমাদের পণ্য ব্যাংকের মাধ্যমে কিস্তিতে কেনার সুযোগ রয়েছে। পাঁচ দিনের এ মেলায় প্রায় ৪৫ লাখ টাকার আসবাব বিক্রি হয়েছে আমাদের। আমরা মূলত পণ্যের গুণগত মানের দিকে নজর বেশি দিয়ে থাকি। তাছাড়া মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার কথা মাথায় রেখেই পণ্যের দাম নির্ধারণ করে থাকি।

ওমেগা ফার্নিচারের কর্ণধার শেখ আবদুুল আউয়াল বলেন, ফার্নিচারশিল্পকে এগিয়ে নিতে আধুনিক ডিজাইনের আসবাব আনা হয়েছে। তবে দেশি ফার্নিচারের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। বেশ কয়েকটি মেলায় আমরা অংশ নিয়েছি। ক্রেতা থেকে ভালো সাড়া পেয়েছি। সব মিলিয়ে বেচাকেনা বেশ ভালো। আশা করি সামনে আরও ভালো সাড়া পাব।

ফার্নিচারশিল্প মালিক সমিতির সভাপতি সেলিম এইচ রহমান বলেন, প্রতি বছরই আমরা ফার্নিচার মেলার আয়োজন করি। বর্তমানে দ্বিতীয়বারের মতো ১৩৫টি স্টল নিয়ে বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটিতে আয়োজন করা হয় এ মেলা। বেচাকেনার চেয়ে আমরা প্রচারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।

অংশ নেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান

হাতিল

অ্যাথেনাস

ব্রাদার্স

আকতার

পারটেক্স

নাদিয়া

নাভানা

রিগ্যাল

ওমেগা

নিউ বেঙ্গল

এলিগ্যান্ট

হাইটেক

অটবি

নিউ ভিশন

জামান

নিউ অ্যান্টিক

শাহানাজ

নিউ জেনারেশন

উড আর্ট

ন্যাশনাল উড অ্যান্ড স্টিল কিং

অংশ নিয়েছিল অ্যাথেনাস ও নিউ বেঙ্গল ফার্নিচার

ঘর সাজানোর অন্যতম প্রধান উপকরণ ফার্নিচার। সব গৃহকর্ত্রী-কর্তাই চান তাদের বাসাটি অন্যদের চেয়ে একটু আলাদাভাবে সাজাতে। এজন্য দরকার একটু ভিন্ন ধরনের ফার্নিচার। সৌখিন লোকেরা তাই ব্যতিক্রমী ফার্নিচার খোঁজেন সব সময়। এসব কথা মাথায় রেখেই অ্যাথেনাস ফার্নিচার তৈরি করেছে ব্যতিক্রমী রং ও ডিজাইনের সব আসবাব। ফার্নিচার জগতে অ্যাথেনাস দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

গৃহিণী দিলশাদ জামান বলেন, অ্যাথেনাস আমার নজর কেড়েছে। অন্য আট-দশটা ফার্নিচার ব্র্যান্ডের তুলনায় এটি ভিন্ন ডিজাইন ও রঙের পণ্যসামগ্রী তৈরি করে। পণ্যের ফিনিশিং খুব সুন্দর। গুণগত মানের দিক থেকেও ভালো।

ব্যবসায়ী রবিন চৌধুরী বলেন, বেশ কিছুদিন আগে অ্যাথেনাস থেকে একটি সোফাসেট ও একটি ডাইনিং টেবিল কিনেছিলাম। এদের তৈরি পণ্যের দাম অন্যদের তুলনায় একটু বেশি হলেও মানে সেরা। হয়তো হাতের কাজ হওয়ায় তারা দাম বেশি রাখে। তবে অবশ্যই অ্যাথেনাসের ডিজাইন ও রঙের প্রশংসা করতে হয়। রুচিশীল ডিজাইন এদের। তাদের তৈরি পণ্যে আভিজাত্যের ছাপ সুস্পষ্ট। এ কারণে প্রথম দর্শনে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। বিশেষ করে আমার গৃহের আসবাবের প্রশংসা করেছেন সব অতিথি।

হোমডেকরের যাবতীয় পণ্য তৈরি করে থাকে অ্যাথেনাস। ডাইনিং, সোফা, আলমিরা, বেডরুম সেট, ডিভান, ডোরসহ সব ধরনের পণ্য পাওয়া যায় এ প্রতিষ্ঠানে। এখানে একটি খাট সর্বনি¤œ এক লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ দু’লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আট চেয়ারের একটি ডাইনিং টেবিল বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও সর্বনি¤œ এক লাখ ৫০ হাজার টাকায়। একটি সোফাসেটের দাম এক লাখ ৪০ হাজার থেকে দু’লাখ ৫০ হাজার টাকা।

অ্যাথেনাসের বনানী শাখার ইনচার্জ তানজিয়া সুলতানা লাবণীর কাছে তাদের পণ্যসামগ্রী সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের ফার্নিচারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সব পণ্যই ভেক্টোরিয়ান। যাকে বলে খোদাই করে তৈরি করা পণ্য। এখানের সব পণ্যই সেগুন কাঠের তৈরি। হোমডেকর থেকে শুরু করে ছোট ছোট শোপিস আইটেমসহ সবকিছুই সেগুন কাঠের। সেগুনের বাইরে অন্য কোনো কাঠ আমরা ব্যবহার করি না। আর একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, আমাদের রঙের ব্যবহার। ব্রোঞ্জ, সিলভার, ডবিøউ এম, এম ওয়ানসহ আরও কিছু কালার রয়েছে অ্যাথেনাসে। এছাড়া গুণগত মানের দিকে শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটি। মানের দিক থেকে কোনো আপস করা হয় না। বলা চলে, প্রতি মাসেই তাদের নতুন কালেকশন থাকে। ক্রেতারা সব সময় চান নতুন কিছু। যে কারণে গ্রাহকের জন্য অ্যাথেনাস সব সময়ই নতুনত্বটাকেই নিয়ে আসার চেষ্টা করে। তবে খোদিত পণ্যসামগ্রী হওয়ায় দামের দিক থেকে অন্যদের তুলনায় একটু বেশি। এবারের অন্তর্জাতিক মেলায়ও অ্যাথেনাস অংশ নিয়েছে।

কাঠ, লোহা ও হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি খাট-পালঙ্ক আগের দিনের রাজা-বাদশাহ্দের শোবার ঘরে দেখা যেত। তাদের আভিজাত্য-প্রতিপত্তির সাক্ষ্য অনেকটা বহন করত অন্দরমহলে ব্যবহৃত খাট-পালঙ্ক। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে বহুল নকশায় তৈরি সেই রাজকীয় আসবাব। খাট-পালঙ্ক শব্দও এখন আর ব্যবহৃত হয় না।

খাট-পালঙ্ক দেখতে হলে আমাদের যেতে হয় এখন জাদুঘরে। বিদেশি শব্দ ‘ফার্নিচার’ই এখন বেশি পরিচিত। তবে পুরোনোর প্রতি মানুষের আগ্রহ আবার ফিরে এসেছে।

ফার্নিচার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ডিজাইনে ফিরিয়ে এনেছে ঐতিহ্য। মধ্যযুগের নকশায় দিয়েছে আধুনিকতার প্রলেপ। ঠিক যে সময় অনেক বড় প্রতিষ্ঠানের সেøাগান হয়েছে ‘স্লিম ইজ স্মার্ট’, ঠিক সে সময় বেশ কয়েকটি দেশি কোম্পানি রাজকীয় ফার্নিচার তৈরি করছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান ‘নিউ বেঙ্গল ফার্নিচার’।

প্রতিষ্ঠানটির বেশিরভাগ পণ্যের ডিজাইনে রয়েছে রাজকীয় ছাপ। দেশের নামকরা ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ ফার্নিচার কোম্পানি পণ্যের ডিজাইনে ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের সমন্বয় ঘটিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের খাট, সোফা, ডাইনিং টেবিল-চেয়ার, ডিনার অগান, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, সেন্ট্রাল টেবিলসহ সব পণ্যই নান্দনিক ডিজাইনে করা। ঠিক যেন পুরোনো আমলের রাজরাজড়াদের ঘর সাজানো খাট-পালঙ্কের সমারোহ। ভারী এ ফার্নিচারগুলোর দামও অনেক চড়া।

মেহগনি, সেগুন, ওক কাঠের তৈরি ফার্নিচার মোটামুটি উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের কথা মাথায় রেখেই বানানো হয়েছে বলে জানালেন নিউ বেঙ্গল ফার্নিচারের কর্ণধার মো. এরশাদ। তিনি বলেন, সলিড কাঠ দিয়ে তৈরি এ ফার্নিচার একবার কিনলে কয়েক যুগ ব্যবহার করতে পারবেন। ব্যবহারে আভিজাত্যও ফুটে উঠবে। আমাদের ভিক্টোরি ডিজাইনের ফার্নিচারগুলোর উৎপাদন ব্যয় অন্যদের চেয়ে বেশি হওয়ায় দামও তুলনামূলক বেশি। ক্রেতারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। প্লেইন শেপ ফার্নিচারের চেয়ে নকশা করা আসবাবের তৈরি খরচে বেশ পার্থক্য রয়েছে। তবে গুণগত মানের দিক থেকে অন্য যে কোনো ব্র্যান্ডের চেয়ে এগিয়ে থাকবে নিউ বেঙ্গল।

এ খাতের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, দেশের আসবাবশিল্প একসময় ক্ষুদ্র থাকলেও বর্তমানে তা বড় শিল্পে রূপ নিয়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানের ফার্নিচারে ভালো অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এ খাত।

নিউ বেঙ্গল ফার্নিচার সম্পর্কে কথা হয় মেলায় আসা গৃহিণী বুশরা জান্নাতের সঙ্গে। তিনি বলেন, নিউ বেঙ্গল ফার্নিচারের ডিজাইন বেশ ভালো লেগেছে আমার। নতুন হলেও সুন্দর ও রুচিশীল সব ফার্নিচার নিয়ে এসেছে তারা।

সর্বশেষ..